চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মায়ের দুধের ‘বিকল্প’ বিপণন বন্ধে ব্যর্থ বিভিন্ন দেশ

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের সতর্কতা

মায়ের বুকের দুধের বিকল্পসমূহের ক্ষতিকর প্রচার বন্ধে প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশ এখনও বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে বাবা-মায়েদের সুরক্ষা দিতে পারছে না বলে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ এবং ইন্টারন্যাশনাল বেবি ফুড অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (আইবিএফএন)।

বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মায়ের দুধের বিকল্পগুলোকে নিরাপদ দাবি করে মিথ্যা প্রচারণা বা আগ্রাসী বিপণন চর্চা থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষার জন্য কঠোর আইনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি কোভিড-১৯ মহামারি তুলে ধরেছে। বুকের দুধ শিশুদের জীবন বাঁচায়, কারণ এতে থাকা অ্যান্টিবডি শিশুদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে এবং শৈশবকালীন অনেক অসুস্থতা থেকে তাদের সুরক্ষা দেয়।

বিজ্ঞাপন

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালেও শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখতে নারীদের উৎসাহিত করছে, এমনকি মায়েরা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ হলে বা নিশ্চিতভাবে সংক্রমিত হলেও।

যদিও গবেষকরা কোভিড-১৯ আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন মায়েদের বুকের দুধের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, তবে এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে বা সন্দেহভাজন মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে শিশুর মাঝে সংক্রমিত হওয়ার সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর যে অসংখ্যা উপকারিতা রয়েছে সেগুলো ভাইরাসের সাথে সম্পর্কিত অসুস্থতার সম্ভাব্য ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে দেয়। তাই শিশুদের প্রক্রিয়াজাত দুধ খাওয়ানো মোটেও নিরাপদ হবে না।

প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা ১৯৪টি দেশের মধ্যে ১৩৬টি দেশে মায়ের বুকের দুধের বিকল্প পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতিমালার সঙ্গে সম্পর্কিত আইনি ব্যবস্থা রয়েছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদের (নীতিমালা) প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। এই নীতিমালার প্রতি মনোযোগ বাড়ছে এবং গত দুই বছরে ৪৪টি দেশ বিপণন বিষয়ক তাদের নিয়মনীতি আরও জোরদার করেছে।

তবে বেশিরভাগ দেশের বিদ্যমান আইনি বিধিনিষেধ সেখানকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে বিপণন বিষয়ক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে যথেষ্ট নয়। মাত্র ৭৯টি দেশে স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে বুকের দুধের বিকল্প পণ্যের প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং মাত্র ৫১টি দেশে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মধ্যে বিনামূল্যে বা সাশ্রয়ী সামগ্রী বিতরণ নিষিদ্ধ করে বিধান জারি রয়েছে।

নবজাতক থেকে শুরু করে ৩৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য বাজারজাত করা ইনস্ট্যান্ট ফর্মুলা, ফলো-আপ ফমুর্লা ও বেড়ে ওঠার দুধসহ বুকের দুধের বিকল্প পণ্য প্রস্তুতকারকদের উদ্যোগে বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্য খাতের পেশাজীবীদের সংগঠনের বৈঠক নিষিদ্ধ করেছে মাত্র ১৯টি দেশ।

ডব্লিউএইচও’র পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ড. ফ্রান্সেস্কো ব্র্যাঙ্কা বলেন, “বুকের দুধের বিকল্প পণ্যের আগ্রাসী বিপণন, বিশেষ করে পুষ্টি ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শের জন্য বাবা-মায়েরা স্বাস্থ্য খাতের যে পেশাজীবীদের ওপর আস্থা রাখেন তাদের মাধ্যমে বিপণন হওয়ায় এটা বিশ্বজুড়ে নবজাতক ও শিশু স্বাস্থ্যের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

“পুষ্টি ও স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য অভিভাবকরা বিশ্বাস করেন এমন স্বাস্থ্য পেশাদারদের মাধ্যমে বিশেষত স্তন্য-দুধের বিকল্পগুলির আগ্রাসী বিপণন বিশ্বব্যাপী নবজাতক এবং শিশুর স্বাস্থ্যের উন্নতির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। বুকের দুধের বিকল্প পণ্যের উৎপাদকদের প্রভাবমুক্ত করে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ার ব্যাপারে বাবা-মায়েদের আস্থা বাড়াতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে শিশুরা তাদের জীবন বাঁচানো সুবিধাসমূহ থেকে বঞ্চিত না হয়।”

ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের পরামর্শ হচ্ছে, শিশুদের ৬ মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খাওয়ানো উচিত নয়, এই সময়ের পরেও অন্যান্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারের পাশাপাশি তাদের বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া উচিত এবং শিশুর ২ বছর বা তার বেশি হওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখা উচিত।

বুকের দুধ খাওয়ানো হুমকির মুখে
যেসব শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো হয় তাদের মৃত্যুর হার বুকের দুধ না খাওয়া শিশুদের তুলনায় ১৪ গুণ কম। তবে, বর্তমানে ০-৬ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ৪১ শতাংশকে শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো হয়, যে হারকে ডব্লিউএইচও’র সদস্য রাষ্ট্রগুলো ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ উন্নীত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বুকের দুধের বিকল্প পণ্যসমূহের অনুপযুক্ত বিপণন অব্যাহতভাবে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ার হার বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং কোভিড-১৯ সংকট হুমকিকে আরও তীব্র করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

পরামর্শ ও দক্ষতার সঙ্গে স্তন্যদানে সহায়তা প্রদানসহ শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে মায়েদের সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো কোভিড-১৯ সংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো সংক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থাগুলোর কারণে কমিউনিটি কাউন্সেলিং এবং মায়েদের সহায়তা সেবা প্রদান অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে, যা বুকের দুধের বিকল্প পণ্য প্রস্তুতকারকদের সামনে সংকটকে পুঁজি করার এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রতি আস্থা কমানোর পথ খুলে দিয়েছে।

ইউনিসেফের পুষ্টি বিষয়ক প্রধান ড.ভিক্টর আগুয়াইয়ো বলেন, “কোভিড-১৯ মহামারির যত বাড়ছে,তা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রমও তত বাড়ানো হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাগুলো তাদের সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে বুকের দুধ খাওয়ানো লাখ লাখ শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে, তবে নতুন মায়েরা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সহায়তা ছাড়া এটা করতে পারবেন না। সর্বত্র প্রতিটি মা ও পরিবার যাতে তাদের শিশুর জন্মের পর থেকেই বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহায়তা পায় তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই প্রচেষ্টা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় জোরদার করতে হবে।

এই নীতিমালার আওতায় বিজ্ঞাপন, স্বাস্থ্যকর্মীদের উপহার প্রদান এবং বিনামূল্যে নমুনা বিতরণসহ বুকের দুধের বিকল্প পণ্যসমূহের সব ধরনের প্রচারণা নিষিদ্ধ। লেবেলে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত কোনো দাবি থাকতে পারবে না এবং নবজাতকের ফর্মুলাকে আদর্শ খাবার হিসেবে তুলে ধরে- এমন কোনো ছবিও থাকতে পারবে না। এর পরিবর্তে লেবেলগুলোতে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোই যে সর্বোত্তম সে বিষয়ক বার্তা এবং শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ানো ঝুঁকি সম্পর্কিত তথ্য থাকতে হবে।’’

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন সরকারগুলোকে জরুরিভাবে এই নীতিমালা বিষয়ক আইন জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। সরকার এবং সুশীল সমাজ সংস্থাগুলোরও জরুরি পরিস্থিতিতে মায়ের দুধের বিকল্প পণ্য প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে অনুদান চাওয়া বা গ্রহণ করা উচিত নয়।

আইবিএফএন-এর গ্লোবাল কাউন্সিলের পাত্তি রুনডাল বলেন, “কোভিড-১৯ সংক্রমণের আতঙ্ক বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্বকে গ্রাস করছে এবং বেশির ভাগ দেশেই জন্মের সময় মা ও শিশুদের আলাদা করা ফেলা হচ্ছে, যা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো এবং তাকে মায়ের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে রাখার বিষয়গুলোকে একেবারে অসম্ভব করে না তুললেও কঠিন করে দিচ্ছে। আর এ সবই হচ্ছে কোনো প্রমাণের ভিত্তি ছাড়াই। এদিকে শিশু খাদ্য প্রস্তুতকারকরা সংক্রমণের ভীতি কাজে লাগিয়ে ফর্মুলার প্রচার ও বিনামূল্যে বিতরণ করছে এবং বিভ্রান্তিমূলক পরামর্শ দিচ্ছে– যেখানে তারা দানকে মানবিক কার্যক্রম এবং নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার বলে দাবি করছে।

নীতিমালার পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ বেশির ভাগ দেশে অপ্রতুল
বুকের দুধের বিকল্পের বিপণনজাতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালার বাস্তবায়নস্ট্যাটাস রিপোর্ট ২০২০ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশে দেশে কোন কোন নীতিমালা আইনে পরিণত করা হয়েছে এবং কোনটি হয়নি সে তথ্যসহ নীতিমালা বাস্তবায়নের অবস্থা সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য উঠে এসেছে।

মায়ের বুকের দুধের বিকল্প পণ্যের হাত থেকে সন্তানসম্ভবা নারী, মা ও তাদের নবজাতকদের সুরক্ষায় স্বাস্থ্যকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ২০২০ সালের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে বুকের দুধের বিকল্প পণ্যের প্রচার নিষিদ্ধ করার জন্য গৃহীত আইনি পদক্ষেপের বিস্তৃত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে।

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো কোভিড১৯
এখনও পর্যন্ত কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছে বা এতে সংক্রমিত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে– এমন কোনো মায়ের বুকের দুধের মধ্যে সক্রিয় কোভিড-১৯ ভাইরাস শনাক্ত করা যায়নি। সুতরাং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে বা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছে অথবা এতে সংক্রমিত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে– এমন মায়েদের বুকের দুধের মাধ্যমেও শিশুদের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয় না বললেই চলে।

কাজেই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছে বা এতে সংক্রমিত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে– এমন নারীরা চাইলে তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে। তাদের উচিত হবে:

সাবান ও পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া অথবা অ্যালকোহল-ভিত্তিক হ্যান্ড রাব (হাত পরিষ্কারক) ব্যবহার করা, বিশেষ করে শিশুকে স্পর্শ করার আগে;

শিশুকে খাওয়ানোর সময়সহ যে কোনোভাবে তার সংস্পর্শে আসার সময় মেডিকেল মাস্ক পরিধান করা;

হাচি বা কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু দিয়ে মুখ ঢেকে নেওয়া। তারপরে তাৎক্ষণিকভাবে টিস্যুটি ঢাকনাযুক্ত ময়লার ঝুড়িতে ফেলা এবং পুনরায় হাত ধোয়া;

বিভিন্ন পৃষ্ঠ স্পর্শ করার পর নিয়মিত সেগুলো জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা।

এমনকি যদি মায়েদের মেডিকেল মাস্ক নাও থাকে সেক্ষেত্রেও তাদের তালিকাভুক্ত সংক্রমণ রোধের অন্য সব পদক্ষেপ অনুসরণ করা উচিত এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া উচিত।