চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মার্কিন নির্বাচন: আত্মিক পরিশুদ্ধতাও জীবনের এক পরম শিক্ষা

জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, বুদ্ধিতে মানুষ সবার থেকে সেরা। প্রতিটি ধর্মেই মানুষের ব্যবহার আর আচরণের কথা পরিস্কারভাবে বলা আছে। কখনো কাউকেই তাচ্ছিল্য বা অবহেলার দৃষ্টিতে দেখা ঠিক নয়। আজ যে আমীর কাল সে ফকির। চিরসত্য কথাগুলি জানা সত্ত্বেও আমরা গিবত বা একজনের কথা অন্যজনের সাথে কথা চালাচালি করে সম্পর্ক নষ্ট করার প্রক্রিয়ায় সদা লিপ্ত। আর এর শাস্তির বিষয়টিও ধর্মে সুস্পষ্ট। জেগে ঘুমালে সেই ঘুম আর ভাঙ্গানো যায় কি?

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০ ঐতিহাসিক বনে গেল। সারা বিশ্বে এমনকি বাংলাদেশেও কফি হাউজ বা চায়ের আড্ডায় একটাই বিষয় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।

বিজ্ঞাপন

আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনিই প্রথম প্রেসিডেন্ট রাজনীতিতে যার কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে লেখাপড়া করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের বিজয় পুরো পৃথিবীকে না হলেও পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অবাক ও বিস্মিত করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। সেই সময়ে ট্রাম্পের বিজয়ে অনেক মানুষের মূল্যবোধে আঘাত এসেছে- এ ধারণাও অসত্য নয়।

ট্রাম্পের কথাবার্তায় রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সৌজন্যতার অভাব স্পষ্ট লক্ষণীয়। মিডিয়ার চোখে তিনি ছিলেন ক্লাউন। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এক রকম খরচের খাতায় ফেলে রেখেছে। তাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য বলে ঘোষণাও দিয়েছে। আরও বলেছে, ট্রাম্পের গত চার বছরে দেশের ভেতরে ও বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রভাবশালী এসব পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী মনে হওয়া স্বাভাবিক, ট্রাম্প সত্যিই ঝুঁকি নিয়ে সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটছেন।

আবার ভালো কাজ যে করেননি তা-ও নয় করোনা মহামারীর আগে মার্কিন অর্থনীতি ছিলো যথেষ্ট চাঙ্গা, বেকারত্ব ছিলো সর্বনিম্ন ৩.৬%, তিনি ৬৭ লক্ষ নতুন চাকরী সৃষ্টি করেছিলেন, জ্বালানি তেলে পরনির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছেন, ডেমোক্র্যাট রাজ্যে ক্রাইম বাড়লেও সামগ্রিকভাবে তিনি অপরাধ ১৫% নামিয়ে এনেছেন। সীমান্ত রক্ষায় সফল ও অবৈধ অনুপ্রবেশ একরকম বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন, আরব-ইসরাইল চুক্তি, তালেবান-আফগান চুক্তি স্বাক্ষরে তার অবদান অসীম। সবচেয়ে বড় কথা তিনি কোন যুদ্ধে জড়াননি। শান্তির পক্ষে তার এই অবদানের জন্যে তিনি দু’বার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছেন, যদিও পাননি। ট্রাম্প যুদ্ধ করেননি, কিন্তু বিশ্বময় যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়িয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন ইতোমধ্যেই নিজেকে একজন সজ্জন ও নরমপন্থী ব্যক্তি হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। ট্রাম্পের উদ্ভট চরিত্রের বিপরীতে বাইডেনের ভদ্রজনোচিত ইমেজ গোটা বিশ্বে তার গ্রহণযোগ্যতাকে এগিয়ে রেখেছে। অভ্যন্তরীণ বর্ণবাদ ও অভিবাসন সমস্যা সমাধান, অর্থনৈতিক পুনঃজাগরণ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে করোনা মহামারী মোকাবেলায় সবার সঙ্গে একযোগে কাজ করা, জলবায়ু পরিবর্তনে সক্রিয় অংশগ্রহণসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে জো বাইডেন সবার কাছে একটি স্বচ্ছ ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছেন।

ফিরে আসি মূল কথায়, শুধু মাত্র ব্যবহার আর আচরণের কারণেই ধনকুবের ট্রাম্প আজ তার নিজের দেশেই নয়, সারা বিশ্ববাসীর কাছে চরম ভ্রষ্ট, মিথ্যুক, বর্ণবাদী, মুসলিম বিদ্বেষী রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে পরিচিত। অভিবাসী নির্ভর রাষ্ট্রটিতে তিনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছেন পুরো শেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ মার্কিন সমাজকে। এত আন্দোলনের পরেও তিনি ভুলে গেছেন ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটার। উগ্র জাতীয়তাবাদের চর্চা বর্তমান সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। স্বচ্ছতা, সততা, জবাবদিহিতাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির সৌন্দর্য।

আত্মবিশ্বাস থাকা ভালো তবে অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আলোর পথে হাঁটার সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এ যাত্রায় তিনি যদি নির্বাচিত হয়েও যান নির্বাচনের এই অভিজ্ঞতা তার কাজে লাগবে। অন্যদিকে নির্বাচিত না হলে জীবনে পাবেন এক চরম শিক্ষা। অহংকার থেকে বেরিয়ে এসে আত্মিক পরিশুদ্ধতায় তিনি নিয়োজিত হবেন, বোধোদয় হবে মননশীলতার। আর এটাই বা কম কিসের?

পরিশেষে ফ্যাসিবাদ ও বর্ণবাদের অবসান ঘটিয়ে সারা বিশ্বে স্বস্তি ফিরে গণতন্ত্র ও মানবতার জয় হবে- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)