চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মার্কিন নির্বাচনে ‘সত্যবাবুর মৃত্যু’ এবং গণমাধ্যমের আত্মউপলব্ধি

গত কয়েক মাসের সব আলোচনা-সমালোচনা, জল্পনা-কল্পনা এবং নাটক ও আবেগঘন নাটকীয়তার পর মার্কিন নির্বাচন শেষ হয়েছে। জনরায়ে হেরে গেছেন বছরের পর বছর নিজেকে হোয়াইট হাউসের জন্য প্রস্তুত করা হোয়াইট হাউসেরই একসময়ের বাসিন্দা, সাবেক ফার্স্ট লেডি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন। তাকে হতাশায় ডুবিয়ে এবং তার সমর্থকদের চোখের জলে ভাসিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে গেছেন কখনো রাজনীতি না করা, কখনো সামরিক বাহিনী কিংবা সরকারি দায়িত্বে না থাকা ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাকে যেমন রাজনীতিতে বহিরাগত হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এটাই স্বাভাবিক, তেমনি তার বিজয়ও সকলকে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে যে গণমাধ্যম নিজেরা এবং অন্যদের জনমত জরিপ প্রকাশ করেছে, প্রতিটি জরিপেই হিলারি ক্লিনটনকে বিজয়ী ঘোষণা করেছে, তারা যখন ফল পুরো উল্টো হতে দেখলো এবং স্বভাবত:ই তা প্রচার এবং প্রকাশ করলো তখন জনগণের এবং একইসঙ্গে নিজেদের কাছে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা-গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মার্কিন গণমাধ্যমে এখন আত্মঅনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আত্মজিজ্ঞাসায় তারা উপলব্ধি করতে পারছে যে মার্কিন গণমাধ্যম থেকে গ্রাম এবং গ্রামীণ মানুষ নির্বাসিত হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের সবকিছুই এখন ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউ ইয়র্ককেন্দ্রিক। তাদের গণমাধ্যমে শহর আছে, সারাবিশ্ব নিয়ে মার্কিন মোড়লগিরির প্রসঙ্গ আছে, বিশ্ব অর্থনীতি আছে, কিন্তু নেই নিজ দেশের গ্রামীণ মানুষ। এ নির্বাচনে তাই ওই মানুষদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, হতাশা-ক্ষোভ কোনকিছুর খোঁজ পড়েনি। তাই মার্কিন প্রধান গণমাধ্যমগুলো বুঝতেই পারেনি যে গ্রামীণ শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা এক ধরনের নীরব বিপ্লব করতে যাচ্ছেন। নির্বাচনকে ঘিরে মার্কিন গণমাধ্যম শুধু কথিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলো প্রধান ইস্যু মনে করেছে, হিস্পানিক এবং আফ্রিকান-আমেরিকানদের ভোটকে অতি মূল্যায়িত করেছে, হিলারি ক্লিনটনের বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানোকে তার সাফল্যের চাবিকাঠি মনে করেছে, কিন্তু বুঝতেই পারেনি যে সাধারণ মানুষের আসল যেসব ইস্যু সেগুলোকে সামনে এনে কিস্তিমাত করতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একইসঙ্গে মূলধারার গণমাধ্যম এটাও মনে করেছে তারা যেমন ‘এজেন্ডা সেট’ করে দেবে মানুষ সেভাবেই ভাববে এবং সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি তাদের গণমাধ্যম থেকে আসল মানুষ হারিয়ে যাওয়ার কারণে এরইমধ্যে ‘ওপিনিয়ন লিডার’ হয়ে গেছে স্থানীয় গণমাধ্যম। অবস্থানগত কারণে আমাদের দেশে বিষয়টা হয়তো অতোটা বিচ্ছিন্ন না, কিন্তু এটাও ঠিক বাংলাদেশের গণমাধ্যম মানেই ঢাকাকেন্দ্রিক, মানুষের মৌলিক অনেক বিষয় অনুপস্থিত, অনেকক্ষেত্রেই এখানে শুধু এক ধরনের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা আছে। মার্কিন প্রধান গণমাধ্যমগুলোর মতো তাই আমাদেরও জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অাশঙ্কা কম নয়। তাই এবারের মার্কিন নির্বাচনে সেখানকার গণমাধ্যমের যে আত্মউপলব্ধি হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের গণমাধ্যম যদি বিষয়টা নিজেদের বোধের মধ্যে নিতে পারে তাহলে সেটা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি কল্যাণকর হবে দেশ এবং দেশের মানুষের জন্য। তা না হলে মার্কিন পণ্ডিতেরা এখন যেমন বলছেন, আজ রাতে তথ্যের মৃত্যু ঘটেছে তেমনি একদিন আমাদেরও বলতে হবে, সত্যবাবু সত্যিই মারা গেছেন।

বিজ্ঞাপন