চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগে মৃত ব্যক্তিদের দাফন কীভাবে হবে?

বিশ্বব্যাপী যুগ যুগ ধরে নানা ধরণের ছোঁয়াচে রোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে আসছে। সম্প্রতি করোনাভাইরাস তেমনিই একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। এই ভাইরাসে মৃত ব্যক্তির দাফন কোন ধর্মমতে কীভাবে হবে? আদৌ হবে কিনা, তা নিয়ে নানা ধরণের মতবিরোধ ও ভুল ধারণা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে।

করোনা আক্রান্ত হয়ে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৬ জন হলেও মৃত ব্যক্তির দাফন নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা শঙ্কা। করোনাতে মৃতদের দাফনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে করবস্থানে ব্যানার পর্যন্ত টানানো হয়েছে! এছাড়া মৃত্যুর পরে ধর্মীয় আচার অনুসারে গোসল বা পাক-পবিত্র করা থেকে শুরু করে দাফন বিষয়টি নিয়ে অনেক সিনিয়র সিটিজেনসহ ধর্মভিরু মানুষজন মারাত্মক মানসিক যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছে। অথচ ইউরোপ-আমেরিকায় এই রোগে মৃত্যুবরণ করা মানুষদের দাফন নিয়ে কোনো ধরণের বিভ্রান্তি নেই। সেখানে হাজার হাজার মৃত্যুর পরে নেই কোনো কুসংস্কারের ছোঁয়া আর উগ্র আচরণ।

বিজ্ঞাপন

আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে যখন ইবোলা ও মারবার্গ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছিল, সেসময়ই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন ধর্মের নিয়ম মেনে নিরাপদে থেকে মৃত ব্যক্তিদের দাফন সর্ম্পকে গাইডলাইন বের করেছে। এছাড়া বিভিন্ন ইসলামী স্কলাররাও ধর্মের বিভিন্ন রেফারেন্সে সেগুলোর প্রায়োগিক দিক সমর্থন করেছেন।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৭ সালে ইবোলার সময়ে ওই গাইডলাইন প্রকাশ করেছে, যা তাদের ওয়েবসাইটে রয়েছে। সেখানে খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের রীতি অনুসারে মৃতদের দাফনের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ১২টি সাধারণ ধাপে সেই দাফন প্রক্রিয়া সহজ গ্রাফিক্সের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে ওই ম্যানুয়ালে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যানুয়ালে দাফনের ১২ ধাপ
ধাপ-১: দাফন ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরির জন্য দল গঠন
ধাপ-২: দাফনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা
ধাপ-৩: মৃত ব্যক্তির বাসায়/হাসপাতালে গিয়ে পরিবেশ দেখে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ
ধাপ-৪: পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) পরিধান করে সার্বিক কর্মকাণ্ড
ধাপ-৫: মরদেহ পবিত্র করতে তায়াম্মুম (dry ablution) করে কাফন পরিয়ে অতিরিক্ত একটি সাদা রঙের ব্যাগে মরদেহ রাখা
ধাপ-৬: মরদেহ জানাযা ও দোয়ার ব্যবস্থা করা।
ধাপ-৭: মরদেহ বাড়িতে নেয়া হলে আশেপাশে স্প্রে করা
ধাপ-৮: সার্বিক কর্মকাণ্ড অংশ নেয়া সবাই পিপিইসহ বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ম মেনে ধ্বংস ও সবাই জীবাণুনাশক ব্যবহার করা।
ধাপ-৯: নির্দিষ্ট যানবাহনে করে মরদেহ দাফনের জন্য কবরস্থানে নেয়া
ধাপ-১০: কাফনের কাপড় ও বহন করা অতিরিক্ত ব্যাগসহ মরদেহ কবরে দাফন করা।
ধাপ-১১: দাফনের পরে স্বাভাবিকভাবে দোয়া-মোনাজাতসহ স্বাভাবিক কর্মসূচি
ধাপ-১২: পুরো প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া মানুষজন হাসপাতাল নয়তো কমিউনিটি অফিসে ফিরে যাওয়া

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপত্তা গাইডলাইনে দাফনের সার্বিক চিত্র
৮ জনের একটি প্রাথমিক দল গঠন করে ওই দাফনের প্রস্তুতি সারতে পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাদের মধ্যে ৫ জনকে পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) পরতে হবে।

আর বাকি ৩ জন সাধারণ পোশাকে থাকতে পারবে। একজন দলনেতা হিসেবে পুরো বিষয়টি অর্গানাইজ ও সুপারভাইজ করবেন, ৪ জন ব্যক্তি মরদেহের সার্বিক বিষয় সম্পন্ন করবেন (পিপিই পরবেন), একজন জীবাণুনাশক স্পেসহ কাজ করবেন (পিপিই পরবেন), একজন যোগাযোগ রক্ষাকারী ব্যক্তি যিনি মৃত ব্যক্তির পরিবার ও সমাজের সবাইকে তথ্য সরবরাহ করবেন এবং একজন ধর্মীয় ব্যক্তি যিনি জানাযা/শেষ দোয়া পাঠ করবেন। মৃত ব্যক্তি নারী হলে, ধর্মীয় রীতি অনুসারে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে দলগঠন করতে হবে।

এরপরে ওইদলে কাজ করা সবার সুরক্ষা ও জীবাণু মুক্ত থাকার জন্য ক্লোরিনযুক্ত (০.০৫%) দ্রবণ ব্যবহার করতে হবে। মরদেহ বাড়িতে নেয়া হলে প্রয়োজনীয় স্থানে পরিমাণমতো স্প্রে করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে, দলনেতা তার দলকে মরদেহ প্রক্রিয়াকরণ থেকে শুরু করে দাফনের পুরো বিষয়টি বুঝাবেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারকেও তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তি বিষয়গুলো বলবেন। মৃতের পরিবারের শেষ কোনো ইচ্ছা (নির্দিষ্ট কোনো কাফনের কাপড়, পবিত্র মাটি, সুগন্ধি) থাকলে সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে মরদেহ পবিত্রকরণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির দেহ খোলা রাখাসহ সবধরণের অনিরাপদ স্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।

গাইডলাইন অনুসারে ও ধর্মের আলোকে পানি ব্যবহার না করে শুধুমাত্র হাত ও মুখে আলতো স্পর্শের মাধ্যমে তায়াম্মুম (dry ablution) করতে হবে (পবিত্র বালু ও পাথর ব্যবহার করে)। যিনি তায়াম্মুম করাবেন তাকে পিপিই (পোশাক, মাস্ক, গ্লাভস ও চশমা) ও জীবাণুনাশক দ্রবণ ব্যবহার করে নিতে হবে। এরপরে কাফনের কাপড় পরিয়ে অতিরিক্ত সাদা আরেকটি বডি-ব্যাগে মরদেহ রাখতে হবে, ৩টি অতিরিক্ত কাপড়ের অংশ দিয়ে মাথার দিকে, পেটের দিকে ও পায়ের দিকে ভালভাবে বাঁধতে হবে।

এরপরে ইমাম ও পরিবারের সদস্য-মুরুব্বীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে জানাযা সম্পন্ন করে দোয়ার পরে মরদেহ দাফনের জন্য নেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কবরস্থানে নিয়ে বডি-ব্যাগ সহকারে শক্ত কাপড়ের মাধ্যমে কবরে শুইয়ে দাফন সম্পন্ন করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মে।

এরপরে পুরো প্রক্রিয়ার অংশ নেয়া সরাসরি ব্যক্তিরা হাসপাতাল ও কমিউনিটি অফিসে ফিরে গিয়ে তাদের পোশাক ধ্বংসসহ ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করবেন।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট

দাফনসহ সার্বিক কাজে রাষ্ট্রের ভূমিকা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই ধাপগুলো আপাতদৃষ্টিতে জটিল মনে হলেও তা আসলে একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেলে খুবই সহজ কাজ। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন এলাকা ভিত্তিতে সেচ্ছাসেবী নয়তো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দল গঠন করে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর অধীনে এই কাজগুলো করা যেতে পারে। এখানে রাষ্ট্রের একটি বিরাট ভূমিকা থাকা উচিত। এই দেশে করোনা ভাইরাসে কারো যদিও মৃত্যুও হয়, সে যেন ধর্মীয় রীতি অনুসারে দাফনের মর্যাদা পায় তা নিশ্চিত করা গেলে মৃত ব্যক্তির পরিবার ও সমাজের সবার আত্মবিশ্বাস বাড়বে। যা করোনা মোকাবেলায় সরকারের কর্মকাণ্ডে জনসম্পৃক্ততা যোগাবে বহুগুণ।

কোনো ধরণের ভাইরাস/ব্যাকটেরিয়া মরদেহে থাকার পরে অবস্থাদৃষ্টে ২ থেকে ৬ ঘন্টা পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে বলে ধরে নেয়া হয়। সে অর্থে মৃত্যু ও দাফনের মধ্যেকার সময়ের পার্থক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাছাড়া মৃত ব্যক্তি যথেস্ট সতর্কতায় কাফনের কাপড় ও বডি-ব্যাগে থাকায় স্বাভাবিক নিয়মে জানাযা অংশ নেয়াদের কোনো ঝুঁকি নেই বললেই চলে। আর করোনা জীবাণু যেহেতু শুধুমাত্র আক্রান্ত ব্যক্তির থুতু-লালা (ড্রপলেট) থেকে সংক্রমিত হয় বলে মৃত ব্যক্তি থেকে সংক্রমণের শঙ্কা তেমন একটা নেই বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকেন। তবে এবিষয়ে যথেষ্ট সাবধান হতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পরেও কিছু মানুষের উগ্র-গোড়া আচরণের কারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাদের প্রতি শুধু একটাই কথা, করোনা সৃষ্ট এই মহামারীতে কে কখন কীভাবে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবেন, তা কেউ বলতে পারে না। তাই সবারই উচিত একটি সুষ্ঠু নিয়ম-পরিবেশের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতিতে সাম্যভাব তৈরি করা এবং আরও মানবিক আচরণ করা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)