চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘মারধর ও ভয় দেখিয়ে আসামির স্বীকারোক্তি আদায়ের সত্যতা মিলেছে’

'মৃত' কিশোরীর জীবিত ফেরা

নারায়ণগঞ্জের এক কিশোরীকে ‘অপহরণ ও হত্যা’র অভিযোগে করা মামলায় আসামিকে মারধর ও ভয় দেখিয়ে পুলিশ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি আদায় করেছে বলে বিচার বিভাগীয় তদন্তে উঠে এসেছে।

যে কিশোরী ‘অপহরণ ও হত্যা’ শিকার হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, ঘটনার ৪৯ দিন পর সে জীবিত ফিরে আসে। তারপর শুরু হয় চাঞ্চল্য। গঠন করা হয় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনটি বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো: মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চে দাখিল করা হয়।

ওই প্রতিবেদন বলা হয়, ‘পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ডে) থাকার সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ সদর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শামীম আল মামুনের বিরুদ্ধে আসামিদের মারধর, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানে বাধ্য করার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।’

এছাড়াও প্রতিবেদনের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আইন অনুসারে আসামিদের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের কোনো অনিয়ম বিচারিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়নি।’

আজকের শুনানির একপর্যায়ে আইনজীবী শিশির মনির ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ১৪৪ ধারায় আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের সময় অনুসরণীয় ছয় দফার একটি সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন করেন।

ছয় দফা সুপারিশ হলো
১. স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার সময় উভয়পক্ষের আইনজীবীর উপস্থিত থাকার সুযোগ দেয়া।

২. স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার পূর্বে আসামিকে তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ দেয়া।

৩. স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার সময় অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করা।

৪. একাধিক আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি একসঙ্গে লিপিবদ্ধ না করা।

৫. সন্দেহ দূরীকরণে আসামি স্বীকারোক্তি টাইপ না করে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক স্বহস্তে লেখা উচিত।

বিজ্ঞাপন

৬. ম্যাজিস্ট্রেট যেন আইনগত সমস্ত পদ্ধতি অনুসরণ করার জন্য যৌক্তিক সময় পান, সে ব্যাপারে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এ বিষয়ে হাইকোর্ট শুনানি শেষ করে আগামী ১৩ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শিশির মনির। আর রাষ্ট্রপক্ষে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী অনুযায়ী গণধর্ষণের পর হত্যার শিকার নারায়ণগঞ্জের কিশোরীর জীবিত ফিরে আসার ঘটনায় হাইকোর্টে একটি রিভিশন আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদ উদ্দিন, মো.জোবায়েদুর রহমান, মো. আশরাফুল ইসলাম, মো. আল রেজা আমির এবং মো.মিসবাহ উদ্দিন।

সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ২৭ আগস্ট আদালত আসামিদের জবানবন্দিসহ এ ঘটনায় করা অপহরণ মামলার সকল নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠাতে নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি নির্দেশ দেন।

সেই সাথে এই মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক অপারেশন) আব্দুল হাইকে মামলার সিডিসহ ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে হাজির হতে বলা হয়। আর একই দিন মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা (উপ-পরিদর্শক) শামীম আল মামুনকে ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

ওই নির্দেশ অনুযায়ী অপহরণ মামলাটির সকল নথি গত ১৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে পাঠান নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়ঢাল ম্যাজিস্ট্রেট। এছাড়া মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক অপারেশন) আব্দুল হাই এইদিন হাইকোর্টে মামলার সিডিসহ হাজির হন।

আর মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা (উপ-পরিদর্শক) শামীম আল মামুন এদিন হাইকোর্টে ঘটনার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন। এরপর গত ২৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী ‘গণধর্ষণের পর হত্যা’র শিকার নারায়ণগঞ্জের কিশোরীর জীবিত ফেরার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।

এর আগে নারায়ণগঞ্জের ওই কিশোরীকে নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত ৪ জুলাই শহরের দেওভোগ এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়ে ওই কিশোরী নিখোঁজ হয়। তাকে না পেয়ে প্রায় মাসখানেক পর ৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা করেন তার বাবা।

ওই মামলায় বলা হয়, আসামি আব্দুল্লাহ তার মেয়েকে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে উত্ত্যক্ত করতেন। এই মামলার পর পুলিশ ওই কিশোরীর মায়ের মুঠোফোনের কল লিস্ট চেক করে অটোরিকশা চালক রকিবের সন্ধান পায়। যে রকিবের নম্বর দিয়ে আব্দুল্লাহ ওই কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।

এক পর্যায়ে পুলিশ অটোরিকশা চালক রকিব (১৯), আব্দুল্লাহ (২২) ও খলিলকে (৩৬) গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মিল্টন হোসেন ও বিচারিক হাকিম আহমেদ হুমায়ুন কবিরের পৃথক আদালতে ওই কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। পরবর্তীকালে এই তিনজনকে কারাগারে নেয়া হয়।

তবে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার ৪৯ দিন পর ওই কিশোরী তার বাড়িতে টাকা চেয়ে ফোন করলে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পরে পুলিশ ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে। এরপর কিশোরীর স্বামী ইকবালকে আটক করা হয়। পরে ইকবাল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানায়, ‘তারা বিয়ে করে বন্দর এলাকায় একটি বাড়িতে বসবাস করছিলেন।’