চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Cable

মামা-ভাগ্নের দেশ

Nagod
Bkash July

সেদিন কথা হচ্ছিল আমার এক ভাগ্নে আতার সাথে। রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে সে খুব ভালোবাসে, তাই কিছু রাজনৈতিক কথা এসেই গেল। আতা বললো, এখন নাকি আগের মতো সে রাজনীতি নিয়ে ভাবে না। তার কথা হলো গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছে কুশরা নদীর ওপর একটা ব্রিজের জন্য; তাই আমরাও স্লোগান দিতাম- অমুক ভাইকে ভোট দিলে কালামপুরে ব্রিজ হবে। এখন সেখানে একাধিক ব্রিজ হয়ে গেছে। নদীর উপর দিয়ে মানুষ এখন হেঁটে হেঁটে পার হয়। আগে মানুষের দাবি ছিল প্রধান সড়ক পাকা করে দিতে হবে। এখন গ্রামের অলিগলিতে পিচ ঢালা পথ। গ্রামের মানুষ আগে প্রধানত দুইটা কাজ করতো, কৃষি আর মাস্টারি। এখন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ ব্যবসায়ী আর শ্রমিক। আগে মানুষ টাকা পয়সা রাখতো আঁচলে কিংবা মাটির ব্যাংকে। এখন সেলফোনের ভেতর সব টাকা পয়সা। আমি তাকে বললাম তোমাদের বাড়িটা বেশ সুন্দর করে বানিয়েছ। দেখলে মনে হয় না গ্রামের কোন বাড়ি। ভাগ্নে বললো, এখন নাকি তাদের বাড়িটাই সব চাইতে ছোট। মানুষ বাড়ি বানিয়ে ছাদে উঠে দেখতে চায় অন্যদের বাড়ি তার বাড়ি থেকে কতটুকু নিচু। বেশি নিচু না হলে আর একটা ফ্লোর উঠিয়ে দেয়।

Reneta June

ত্রিশ বছর হয়ে গেল দেশের বাইরে আছি। এর মধ্যে দু’একবার বাংলাদেশে গিয়েছিলাম বটে। যদিও সেটা আব্বা-আম্মার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে। সারাক্ষণ আব্বা-আম্মার পাশেই থেকেছি বলে খোদ ঢাকা শহরের পরিবর্তনও ভালো করে দেখা হয়নি। যখনই কেউ বলতো– শুনলাম বাংলাদেশে যাচ্ছেন, আমি তাদের বলতাম- বাংলাদেশে না মোহাম্মদপুর যাচ্ছি আব্বা আম্মার সাথে থাকবো।

এই ত্রিশ বছরের মধ্যে ১৯৯১ সালে একবার কক্সবাজার ভ্রমণ ছাড়া তেমন কিছু দেখা হয়নি। বইমেলা থেকে একবার ফেরার পথে ভূতের গলির ভেতর দিয়ে রিকশা এসে যখন গ্রিন রোডে পড়লো তখন কিছু বাড়ি দেখে রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমরা কি ভূতের গলি নর্থ রোড দিয়ে এলাম। তিনি উত্তর দিলেন জী স্যার। তাহলে কিছুক্ষণ আগে যে বাড়িটা দেখে ভেবেছিলাম– এটা মুন্না ভাই খোকন ভাইদের ‘জাহান ভিলা’ সেই ধারণা ঠিক ছিল। মনে হলো রিকশাওয়ালা ভাইকে বলি, একটু ঘুরে গিয়ে গলিটাতে আবার নিয়ে যেতে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল ইউনুস চেয়ারম্যানের অফিস। আমাদের খেলার মাঠ, ডলি জহুরের বাড়ি। আজাদ ভাইদের দোতলা যেখানে পলি নামের মেয়েটি দাঁড়িয়ে থাকতো। নাহ তাকে আর বলা হয়নি, তাই দেখা হয়নি আমার শৈশবের স্মৃতি। তারপর দাঁড়কাকের মতো শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেছি অচেনা শহর। গ্রিন রোডের পপুলার রেস্টুরেন্ট, সিবকো কনফেকশনারি, ক্রিসেন্ট রোডের গলির মুখে পরিবার পরিকল্পনার অফিস এগুলো খুঁজেও পেলাম না। ভেতরটা তখন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। বাইরে অনেক কোলাহল ভেতরটায় নৈঃশব্দের মঞ্চ, যেখানে পরিচিত কেউ নেই।

নতুন শহরের মধ্যে উত্তরা শহরটা সামান্য চিনি কেননা সেখানে আমার ছোট বোন এবং স্ত্রীর বড় ভাই থাকেন। দেশে গেলে তারাই গাড়ি ড্রাইভার দিয়ে সাহায্য করেন। নতুন নতুন অনেক শহরের নাম শুনে এখন অবাক হই। বিদেশি রেস্টুরেন্ট, ফ্যান্টাসি পার্ক, দূরপাল্লা রুটে ভলভো কোম্পানির বাস, অতিথিদের জন্য গ্রামের বনফুল দোকানের মিষ্টি, সাইকেল কুরিয়ার সার্ভিস, বরযাত্রীর দলের জন্য নাচের গ্রুপ ভাড়া করা, ঈদ কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে হেলিকপ্টার বা ছোট প্লেনে করে গ্রামে যাওয়া। ফার্নিচারের দোকান থেকে ফার্নিচার কিনে গ্রামের ঘর সাজানো এসব কথা বিদেশে বসেই শুনি, আর ভাবতে চেষ্টা করি দেশের মানুষ সত্যি ভালো আছে তো?

২১ ফেব্রুয়ারিতে ফোন করেছিলাম অন্য এক ভাগ্নেকে। সময়মতো ফোন ধরতে না পেরে সেই ভাগ্নে বলেছিল ‘মামা আমি সরি আপনার ফোন রিসিভ করতে পারি নাই কেননা আমার ছেলে তখন শহিদ মিনারে ফুল দিচ্ছিল’। আমি বললাম, ওহ তুমি ঢাকায় চলে এসেছ আমিতো মনে করেছিলাম এখনও রহমতপুরে আছো। কামরুল উত্তর দিল, না মামা– আমি এখনো গ্রামে আছি। তবে যে বললে তোমার ছেলে শহীদ মিনারে ফুল দিচ্ছে! কামরুল হেসে হেসে জবাব দিল, মামা আগের সেইদিন আর নাই; এখন সব গ্রামেই শহীদ মিনার আছে।

জানি না কবে আবার ভাগ্নেদের বাংলাদেশ দেখতে পাবো। ১৯৭১ এর এই মার্চ মাসের দিকে ফিরে তাকালে চোখ ভারি হয়ে আসে। সেদিনের প্রতিটি সূর্য কিরণ আমাদের গাঁয়ের উপর দিয়ে খেলা করে গেছে। আকাশ প্রকম্পিত হয়েছে আমাদের স্লোগানে। পিচ ঢালা পথে ছায়া ফেলে আমরা ঘেমে উঠতাম ‘জয় বাংলা’ বলে। ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ নদী তখন আমাদের কণ্ঠনালীতে বসে থাকতো। ‘বিপ্লব’ কথাটির ভেতর ভীষণ পুলক অনুভাব করতাম। ‘সংগ্রাম’ কথাটির সাথে নতুন করে পরিচিত হলাম। আর স্বর্ণ অক্ষরের মতো জ্বলে উঠলো একটি অচেনা শব্দ ‘স্বাধীনতা’। মার্চ মাসের প্রতিটি দিন ক্যালেন্ডারের গায়ে হাইলাইট হয়ে উঠেছিল ১৯৭১ সালে।  সম্ভবত একমাত্র বাংলাদেশের ক্যালেন্ডারের একটি মাস অর্থাৎ মার্চ মাসের মোটামুটি সবগুলো দিন উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। এই মাসকে বলা হয় স্বাধীনতার মাস। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ যেন মার্চ মাসকে ভুলে না যায় সেই আশা করতে চাই। মার্চ এলেই ঢাকার পল্টন ময়দান, রাজারবাগ পুলিশ ব্যারাক, ইপিআর, ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর, এগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এই নামগুলো বোধ হয় আর আগের মতো নেই। হয়তো ইতিহাসে আছে কিংবা আলোচনাতে শোনা যায় কিন্তু বাস্তবে মুছে গেছে। বিবর্তনের পথে না হেঁটে দেশ চলছে পরিবর্তনের পথ দিয়ে, চলুক। দেশের মানুষ যা চায় তাইতো হবে। দেশের মালিক সবাই। কাজেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হবে আজকের নাগরিকদের চিন্তা ভাবনার মতো এটাই স্বাভাবিক। এখন কয়জন মানুষ ছুটির দিনে বারান্দায় বসে শরৎচন্দ্র পড়েন? সন্ধ্যে হলে পা ধুয়ে হারিকেন জ্বালিয়ে পড়তে বসে। মনে পড়ে আম্মা হাতিরপুলের বাসা থেকে কাঁঠালবাগানে এক আত্মীয়ের (আজিম ডাক্তার) বাড়িতে আমাকে পাঠিয়েছিলেন শুধু মাত্র একটা খবর পৌঁছে দিতে। আম্মা বলেছিলেন হিমুর আম্মাকে গিয়ে বলবি আমরা যেতে পারবো না। হাতিরপুলের দারোগা সাহেবের বাড়িতে আমরা তখন ভাড়া থাকতাম। বাসা থেকে বের হয়ে রেল লাইনে গিয়ে উঠলাম। তারপর রেললাইনের লোহার পাত কিংবা মোটামোটা কাঠের উপর এক্কা দোক্কা খেলতে খেলতে গিয়ে পৌঁছেছিলাম হিমুদের বাড়ি। হিমুর মা মানে আমাদের ফাতেমা ফুপু দুপুরে পেট ভরে খাইয়ে তবেই ছেড়েছিলেন। বয়সের কথা মনে নাই তবে সাত আট বছরের হবো হয়তো। শুধু একটি খবর পৌঁছানোর জন্য এক বেলা চলে গিয়েছিল আমার ছেলে বেলায়। এখন খাবার টেবিলে বসে মা ছেলের রুমে ফোন করে বলেন খেতে আসো, তাও সেটা বাংলাদেশে। এই বাংলাদেশ কেন অন্যদের কথায় চলবে।

একদিন দেখা হবে দেশ ও মাটির সাথে। হয়তো তখন আর ভাগ্নে ভাগ্নিদের দেশ থাকবে না, বাংলাদেশ হয়ে যাবে নানু দাদুদের দেশ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

BSH
Bellow Post-Green View