চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মান্টোতে হাহাকার, নন্দিতায় মুগ্ধতা

মান্টো’র জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে মাত্র ১ রূপি নিয়েছেন নওয়াজ: নন্দিতা

সময় তখন দুপুর আড়াইটা। বাংলা একাডেমির ভেতরে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের চারদিকে মানুষের জটলা। সময় যাচ্ছে আর এই মিলনায়তনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে মানুষের ভিড়। তিনটার মধ্যেই চারপাশ পুরোটা লোকে লোকারণ্য। নিজ তাগিদেই সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন লাইন ধরে। মিলনায়তনের প্রবেশদ্বার মুখি লাইনটি দীর্ঘতর হতে থাকলো। যার লেজ গিয়ে ঠেকলো লিটল ম্যাগ চত্ত্বর এলাকায়।

না। চল্লিশের দশকের দাপুটে গল্পকার সাদত হাসান মান্টোর কথা শুনতে কেউ বাংলা একাডেমিতে জড়ো হননি, কিংবা তার অটোগ্রাফ নিতেও নয়! শরীরী মান্টো বেঁচে নেই। তিনি সেই পঞ্চাশের দশকেই দেহ ত্যাগ করেছেন। তার মৃত্যুর প্রায় ষাট বছর পর সিনেমায় মান্টোকে তুলে ধরলেন ভারতীয় অভিনেত্রী ও নির্মাতা নন্দিতা দাস। চলচ্চিত্রে মান্টোর সেই জীবন দেখার সুযোগ পেয়ে ঢাকার দর্শক ছুটে এসেছিলেন বাংলা একাডেমিতে!

বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’। ৮ম বারের মতো সাহিত্যের এই আয়োজনের প্রথম দিনের(৮ নভেম্বর) বিকেলে উপমহাদেশের বিখ্যাত গল্পকার সাদত হাসান মান্টোকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র নিয়ে উপস্থিত ছিলেন বলিউডের অন্যতম মেধাবী অভিনেত্রী ও নির্মাতা নন্দিতা দাস। আর ছবিটি দেখতে এদিন পুরো বাংলা একাডেমিতো ছিলো উপচে পড়া ভিড়!

সিনেমা শুরু হওয়ার কথা সোয়া চারটায়, অথচ দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়ে আছে দুপুর আড়াইটা থেকে। সাড়ে তিনটা নাগাদ গেট খুলে দেয়া হয়। মুহূর্তেই কানায় কানায় পূর্ণতা পায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনটি। নির্ধারিত আসন পূর্ণ হলে অনেককে এসময় মেঝেতে বসে ‘মান্টো’ দেখার জন্য প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। প্রচুর মানুষ মিলনায়তনে প্রবেশ করতে না পেরে সিনেমা না দেখেই ফিরে গেছেন। সিনেমা দেখতে এমন পরিস্থিতি কি দেখেছে ‘ঢাকা লিটফেস্ট’-এর কোনো আসর?

নির্ধারিত সময়ের একটু পরেই ‘মান্টো’ প্রদর্শনী শুরু হয়। কিন্তু তার আগে মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চে আসেন নন্দিতা দাস। তুমুল কড়তালিতে তাকে স্বাগত জানায় ঢাকার দর্শক। পরিষ্কার বাংলায় তিনি বলেন, আমার নামের জন্য সবাই আমাকে বাঙালি মনে করে। কিন্তু আমি বাঙালি নই তবে অল্প অল্প বাংলা বলতে পারি। ‘মান্টো’ দেখতে এতো মানুষের ভিড় দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন এবং ঢাকার দর্শকদের সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘মান্টো’ দেখার পর আপনাদের মতামত শুনতে অপেক্ষা করছি!

Advertisement

শুরু হয় ‘মান্টো’। ঘর ভরতি মানুষ, নির্দিষ্ট আসন ছাড়াও বহু মানুষ মেঝেতে বসে কেউ আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন এক ক্ষ্যাপাটে মান্টোর গল্প। যিনি সত্যকে লিখেছেন, নিরেট বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন তার প্রতিটি গল্পে। মুম্বাইয়ের জীবন, সাহিত্য বাজারে দাপট, প্রিয় বন্ধু বান্ধব ছেড়ে দেশ ভাগ, হিন্দু-মুসলিম রায়ট তাকে টেনে নিয়ে আসে পাকিস্তানের লাহোরে। সেখানে নতুন যাপন, ভিন্ন জনপদে আবার ছুটে চলা। আবার অ্যালকোহলিক জীবন আর গল্পের জীবনে প্রবেশ। কিন্তু এবার তার লেখা গল্পগুলোই শত্রু হয়ে উঠে তার। গল্পে সত্য তুলে ধরার কারণে আদালতে উঠতে হয় তাকে। পাকিস্তানের আদালতে। কিন্তু হার মানেন না মান্টো। নতি স্বীকার করেন না মান্টো।

পর্দার মান্টো এভাবেই আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে রাজ্যের নীরবতা নিয়ে আসে। মান্টোর বহমান জীবনের সাথে মিশে যান দর্শক। দেশভাগ মান্টোর জীবনে যে ক্ষত তৈরি করে সেই ক্ষত’র সাথে বিলীন হন শত শত দর্শক। অন্তত মান্টোর হাহাকার ছুঁয়ে যায় নৈশব্দকেও। কিংবা অনেকে মান্টোর সাথে ঋত্বিক ঘটকের হিসেব মিলাতে চান। মান্টোকে দেখে ঋত্বিকের ক্ষতও স্পর্শ করেন অনেকে।

করুণ গল্পের ভেতর দিয়ে শেষ হয় মান্টো। সিনেমা শেষে তুমুল কড়তালি পড়ে। উচ্ছ্বাস টের পাওয়া যায় ঢাকার দর্শকদের। ফের মঞ্চে আসেন নন্দিতা। কথা বলেন ছবি তৈরি নিয়ে। কলেজ জীবনে মান্টোর গল্প পড়েই ভালো লেগেছিলো, তখন থেকেই মাথায় গেঁথে ছিলো উর্দু ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক সাদত হাসান মান্টোর জীবন! এরপর গত পাঁচ বছর ধরে ছবিটি তৈরির প্ল্যান! গেল কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির প্রথম প্রদর্শনী। সবই বললেন নন্দিতা।

দর্শক সারি থেকেও নন্দিতার দিকে আসতে থাকে মুহূর্মুহূ প্রশ্ন। মান্টোর জন্য কেন নওয়াজকে বেছে নেয়া হলো? সাবলিল উত্তর দেন নন্দিতা। মান্টোর চোখের সাথে নওয়াজের চোখের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি, তাই এই ছবিতে তাকে কাস্টিং। এছাড়া মান্টোর সাহিত্য ও জীবন নিয়ে নওয়াজের বোঝাপড়াও ভালো ছিলো। শুধু কি তাই, এই ছবিটি করতে নওয়াজ তার পারিশ্রমিক হিসেবে মাত্র ১ রূপি নিয়েছেন, এমনটাও অবলীলায় জানিয়েছেন নন্দিতা।

নানা কোণ, নানা অ্যাঙ্গেল থেকে নন্দিতার কাছে প্রশ্ন ছুঁড়তে থাকেন দর্শক। নন্দিতাও অল্প কথায় দক্ষতার সাথে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন অবলীলায়। প্রশ্নোত্তর পর্বটি প্রায় ঘন্টা খানেকের বেশি চলে! হঠাৎ নন্দিতা জানালেন, তাকে এবার উঠতে হবে। তার আট বছরের ছেলে তার জন্য বাইরে অপেক্ষায় আছে! সামনে হয়তো নতুন কোনো জার্নি নিয়ে দেখা হবে! এই বলে বিদায়!