চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য

মানুষ স্বভাবতই কোনো কিছু হারাতে চায় না। দুঃখটাও যেন বুকের ভিতর লালন করে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করে মানুষ। কবি গুরু লিখে গেছেন–
“যেতে নাহি দিব হায়
তবু যেতে দিতে হয়
তবু চলে যায়।”

কালের যাত্রায় অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে দুই হাজার বিশ সাল। কিন্তু এর স্মৃতি স্মৃতি মানুষ বয়ে বেড়াবে আমরণ। এই সালটি মানুষকে কত কিছুই না শিখিয়ে গেল, দিয়ে গেল স্বজন হারানোর বেদনা, রোগ-শোকের তীব্র জ্বালা যন্ত্রণা, আপনজনকে কাছে না পাওয়ার হাহাকার, অভাব-অনটন, অনাচার-অবিচার, নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি, প্রতারণা আর কতই না মানুষের প্রাণে বাঁচার সতর্কতা, আকুতি মিনতি। দুই হাজার বিশ সালের এ সব কিছু আমাদের হ্যাঁ আমাদের সমগ্র পৃথিবীর এই বিশ সাল। যেন এক সমুদ্র গ্লানি ভরা এই বিশ সাল। তবু কেন সালটিকে হারানোর ভয়ে বুকের ভিতরটা চিনচিনিয়ে উঠে! কারণ মানুষ স্মৃতি চারণ করে, কষ্টটাকে নাড়াচাড়া হৃদয়ে এক সজীব শীতলতা অনুভব করে। যা মানুষের আত্মার প্রশান্তি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে বাঙ্গালি জাতি যেভাবে মুক্তির স্বাদ পেতে কাল বিলম্ব না করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল, তেমনিভাবে করোনা ভাইরাসের আক্রমণের কারণে পূর্ব অভিজ্ঞতা আজকের দিনে কাজে এসেছে। বাঙ্গালি চিরকালই বীর বাঙ্গালি। এই মার্চ থেকেই শুরু হলো করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।

এর আগে দুটি মৃত্যুর মনে পরে ৭ মার্চ ২০২০ আমাদের এক আত্মীয় ভাই এ. এস.এম ওবায়দুল্লাহ বার্ধক্য জনিত কারণে পরলোক গমন করেন। তিনি আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরে আসেন ২৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন বলেই হয়তো সৃষ্টিকর্তা তাকে নিজের দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।

উত্তরার অনেক মানুষেই তার নানাভাবে উপকৃত হয়েছেন। এমপি এডভোকেট সাহারা খাতুন আপার সাথে কাজ করেছেন (দুর্ভাগ্যবশত করোনা ভাইরাসের আক্রমণে উত্তরার প্রাণপ্রিয় সাহারা আপাকেও হারিয়েছি আমরা। কোনো এক অনুষ্ঠানে তিনি আমার মাথায় স্পর্শ করে দোয়া করেছেন)। ওবায়দুল্লাহ ভাই বাংলাদেশ রেলওয়েতে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে সততার সাথে কাজ করে অবসর গ্রহণ করেন।উত্তরা ১৪নম্বর সেক্টরে কল্যাণ সমিতির সভাপতি হিসেবে পরপর দু’বার নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। আমার বিকাশ পাঠাগারে স্থান দিয়ে তিনি সহযোগিতা করেছেন। আমি সাহারা আপা এবং ওবায়দুল্লাহ ভাইয়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

বিজ্ঞাপন

৮ মার্চ ২০২০ বিশ্ব নারী দিবস অন্যান্য বছরের মতো বিকাশ পাঠাগারে উদযাপনের সুযোগ হয়ে উঠে নাই। প্রসঙ্গতই ভাগ্নি মীমের (মামাতো বোনের মেয়ে) কথা আসে। সড়কপথে দুর্ঘটনায় বিশ দিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিল সাবিনা রহমান মীম। সন্তান হারানোর বেদনায় মায়ের চোখের পানি শেষ হয় না, অঝোরে কান্না আর থামে না। মানুষ অল্প বয়সে উপন্যাস পড়তে পড়তে কতোই না চোখের পানি ফেলে। অথচ জীবনের এমন বেদনাময় হাহাকার নিয়ে বেঁচে থাকা কতোই না কষ্টকর!

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস আক্রমণের কথা জানা যায় ৮ মার্চ থেকে। প্রথম দিন করোনা করোনা সনাক্ত হয় তিজনের মধ্যে। জানা যায় আক্রান্ত তিনজন অনায়াসে ঘুরে বেড়িয়েছে। ক্রমান্বয়ে করোনার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর (এই বছর আমার পিতা মৌলা নেওয়াজ খান এরও জন্মশত বছর পূর্ণ হলো) জন্মদিন একশত বছর উদযাপনের যে আয়োজনের পরি কল্পনা ছিল তা আর সম্ভব হলো না।  বরং ১৭ মার্চ থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সরকারি নির্দেশ ঘোষণা করা হলো। শুরু হলো করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সতর্কতা। ১ এপ্রিল থেকে দৈনিক পত্রিকা রাখা বাদ দিলাম। সাধারণত জনগণ গৃহবন্দী হয়ে দিন কাটাতে লাগল। তবে ৭১’ এর মুক্তিযুদ্ধের মতো কিছু সংখ্যক মহৎপ্রাণ ব্যক্তি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছেন নার্স, ডাক্তার, পুলিশ,সংবাদ কর্মী আরও অনেকেই। দেশের হাসপাতাল,পত্রিকা অফিস, টিভি চ্যানেলগুলো চব্বিশ ঘণ্টা চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে সেবা দান আর নিরাপত্তা পেয়েছে জনগণ সেই সাথে প্রতি মুহূর্তের সংবাদ জানার সুযোগ ঘটেছে।

ডায়েরীর পাতায় ১১ মে ২০২০ তারিখে লেখা আছে হুবহু–
‘‘নভেল করোনা (কভিড১৯) দুই মাস অতিবাহিত হতে চলেছে। আজ আক্রান্ত-১০৩৪ জন, মোট আক্রান্ত ১৫৬৯১ জন, মৃত্যু ১১ জন, মোট মৃত্যু ২৩৯ জন, সুস্থ ২৫২, মোট সুস্থ ২৯০২ জন। এই দুই মাসের বিবরণ থেকে ধারণা করা যায় মানুষ কতটা খামখেয়ালি আর কতটা বেপরোয়া। তা না হলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিস্থিতি এমন হতো না। প্রয়োজন ছিল প্রত্যকেরই নিজ নিজ দায়িত্বে সতর্ক থাকা। কিছু কিছু লোকজন সতর্ক তো ছিলোই না বরং অহেতুক ঘরে বাইরে দৌড়াদৌড়ি আর ঘরের ভিতর কুটুর কুটুর কলহ বিবাদ। আরও কিছু সংখ্যক লোকজন নানান রকমের গুজব রটিয়ে অনাসৃষ্ট বাঁধিয়েছে। আবার অনেকেই নিজেকে শুদ্ধ পরিশুদ্ধ করে ধর্ম কর্মে মনোনিবেশ করেছেন।সর্বোপরি মানুষ করোনার বিরুদ্ধে টিকে থাকায় অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। করোনা ভাইরাস আক্রমণের বিরুদ্ধে বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো ভ্যাকসিন তৈরির গবেষণা করে চলেছে।

একদিন কলেরা, বসন্ত, টাইফয়েড,যক্ষ্মার মতো ছোঁয়াচে রোগের জীবাণু নির্মূল হয়েছে, তেমনিভাবে করোনাভাইরাসের জীবাণুও সেই ভাবেই থাকবে না পৃথিবীতে। প্রার্থনা করি মহান সৃষ্টিকর্তা যেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল মানুষকে শান্তি এবং নিরাপত্তা দান করেন। কারণ করোনা মহামারিতে আমরা অনেক তাজা প্রাণ, অনেক বরেণ্য ব্যক্তি, শিল্পী সাহিত্যিক অনেক গুণীজন হারিয়েছি। আমরা আর একটি তাজা প্রাণও হারাতে চাই না। আমরা বাঁচতে চাই এক হয়ে সেই সুরে গান গেয়ে—-
মানুষ মানুষের জন্য
জীবন জীবনের জন্য।’’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন