চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘মানুষের মৌলিক দাবির কিছু কিছু বাস্তবায়ন করতে পারি নাই’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী শেখ আবদুল আজিজ।  ১৯২৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ থানার টালিগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।  মরহুম হাজী শেখ হাফিজ উদ্দিনের ছেলে ভাষা সংগ্রামী শেখ আবদুল আজিজ।

আওয়ামী লীগের জন্ম থেকে এ সংগঠনের সদস্য শেখ আবদুল আজিজ।  এই ভাষা সংগ্রামী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভার ৭ সদস্যের একজন। তাজউদ্দিনের মন্ত্রিসভায় যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে আরো ৫ জন সদস্য বাড়িয়ে মন্ত্রিসভা ১২ জনের করেন।  তখন তাকে দেয়া হয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।  ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।  ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সাড়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন শেখ আবদুল আজিজ। রাজনীতিই তার পেশা ও নেশা।  বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন।

Reneta June

২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভাষা সংগ্রামী শেখ আবদুল আজিজের সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন তারিকুল ইসলাম মাসুম

বিজ্ঞাপন

শেখ আব্দুল আজিজ: আমরা তো ইগর্নোড।  ইতিহাসের সাক্ষী, চলে গেলাম, সাক্ষী তো আর কেউ থাকল না।  দেখলাম কত লোকরে যে সৈনিক সাজাইছেন আপনারা! আমার তাতে হিংসা নেই।  সারা দেশের লোকরাই সৈনিক, কিন্তু আমরা তো ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছি! আমি তথ্যমন্ত্রী ছিলাম বাংলাদেশের, অনেক অভিজ্ঞতার সাক্ষী। অবাক লাগে! এত শত শত বছর পরে, এখন মৌলবাদী হিন্দুরা বলে যে, তাজমহল ভারতের… ও তাজমহল ভেঙে ফেলতে হবে।  পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের, এই আশ্চর্য যেহেতু মুসলমানরা করেছে।  আমি সাম্প্রদায়িকতার কথা বলতেছি না।  এটা মৌলবাদী হিন্দুরা করেছে, বলতেছে।
তা. ই. মাসুম: স্যার, আপনার ব্যক্তিগত বিষয় একটু জানতে চাই। লেখাপড়া কোথায় করেছেন?
শেখ আবদুল আজিজ: লেখাপড়া করেছি খুলনাতে।  খুলনাকে কেন্দ্রবিন্দু করে আন্দোলন শুরু করেছি।  খুলনার মাটিতে আমার সমস্ত দেহ জড়িত।  আমার দেশ হলো বাংলাদেশ, আমার জেলা হলো আগের বৃহত্তর খুলনা বর্তমান বাগেরহাট। আমরা বাংলাদেশ ভিত্তি করে কাজ শুরু করেছি, ঐটাই বলি।  জেলা বা ঠিকানা যা বলেন, আমার দেশটা হলো বাংলাদেশ।

আমি খুলনা থেকে ঢাকায় আসি ১৯৬৯ সালে গণ আন্দোলনের সময়।
ভাষা আন্দোলনের সময় আমি ঢাকায় ছিলাম।  আমার এমএ পাশ হয়েছে ১৯৫১ সালে।  ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় আমি ল’ ক্লাসের ছাত্র।

তা. ই. মাসুম: ফেব্রুয়ারির আন্দোলনে আপনাদের অংশগ্রহণ নিয়ে একটু বলবেন?
শেখ আবদুল আজিজ: আমি বলেছি, আমার কিন্তু’ ৫১ সালে এমএ পাশ হয়ে গেছে।  ’৫২ সালে আমি ল’ পড়ি।  কথায় বলে, ‘সন্যাসী ছাড়ে তো বস্তায় ছাড়ে না’।  আমি ’৫২ সালে ছাত্র।  তখনো ল’ ছাত্র।  শুনুন, ২১শে ফেব্রুয়ারি শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস।  তখন আরকি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ, এটা মেইনলি নামে সর্বদলীয়, এটা সর্বদলীয় ছিলই না। কিন্তু একটা নাম দেয়া লাগে।
সবার দৃষ্টি আকর্ষিত করার জন্য।  প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের ডমিনেন্ট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই।
তা. ই. মাসুম: তখন তো আওয়ামী মুসলিম লীগ।
শেখ আবদুল আজিজ: আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বেই এটা গঠন হয়। নবাবপুর অফিস, আওয়ামী লীগের অফিসে বসে কমিটি গঠন করা হয়।  এবং এই রাষ্ট্রভাষা বাংলা সর্বদলীয় কমিটি, সবাইকে, সবাইতো আওয়ামী মুসলিম লীগ না? ভাষার ব্যাপারে অরাজনৈতিক লোকও যাতে জয়েন করে তার জন্য এটাকে সর্বদলীয় রূপ দেওয়া হয়।  নাম দেওয়া হলো সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কিমিটি।
যদিও কোনো সর্বদলীয় ছিল না।  ছিল, কংগ্রেস ছিল হিন্দুদের দ্বারা, তো কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ ভয়তে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে নামতো না।  যে, সাম্প্রদায়িক রূপ দিয়ে তাদের ভিক্টিমাইজ করবে মুসলিম লীগ সরকার।  তো এইভাবে, সর্বদলীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন মাওলানা ভাসানী। উনি কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট।

উনি কিন্তু, এটা প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বেই ভাষা আন্দোলনটা হয়েছে।  শামসুল হক সাহেব আওয়ামী মুসলিম লীগের সেক্রেটারি।  নাম শুনতে পারেন, টাঙ্গাইলের।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: প্রথম সেক্রেটারি, উনিও ছিলেন এই সর্বদলীয় কমিটিতে। বুঝলেন না?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তো এভাবে, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট থেকে নূরুল হুদা, বেঁচে আছে। তারে তো ব্ল্যাক আউট করে দিয়েছে আপনাদের ইয়ে, সে এখনো বেঁছে আছে। নূরুল হুদা ঐ টিপাড়া বাড়ি। এখন তো কুমিল্লা হয়েছে। তখন জেলার নাম ছিল টিপাড়া, ত্রিপুরা। এ ছিল, তারপর নওগাঁর ডাক্তার মুকুল মেডিকেল কলেজের ছাত্র।  ও ছাত্র ইউনিয়ন করতো নওগাঁ’র। তারপরে আমাদের ছাত্রলীগের মতিন, পাবনার মতিন।
চোর মতিন না।  ছাত্রলীগের মতিন, দুই মতিন আছে।  যারে ভাষা মতিন বলেন আপনারা (ভাষা মতিন, চোর মতিন না)।  খালেক নেওয়াজ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সেক্রেটারি, সম্পাদক খালেক নেওয়াজ।  বুঝলেন? এই খালেক নেওয়াজ কিন্তু ছাত্র অবস্থায় ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে…
তা. ই. মাসুম: নূরুল আমিনকে হারাইছিলেন।
শেখ আবদুল আজিজ: নূরুল আমিনকে (পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী) হারাইছিল। তো ঐ খালেক নেওয়াজ আর আমি একসাথে ইকবাল হলে থাকতাম একটা জোড়া খাটে।  ইকবাল হল, মুসলিম হল থেকে আমাদের বের করে দিল।  আন্দোলন করি। দু’বছরের বেশি কেউ থাকতে পারবে না।  ঐ ময়মনসিংহের খালেক নেওয়াজ খান। তারপরে বরিশালের কাজী গোলাম মাহবুব, ও ছাত্রলীগ করে। পরে অন্য দল করেছে, বিএনপি করতো।  সব ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ।  আমি তখন আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ দুই দলেরই সদস্য।  কারণ আামার এমএ পাশ হয়ে গেছে।  তো এভাবে নাম বললে কত বলা হয়।  তারপরে আপনার এই ভাষা কমিটিতে অ্যাডাল্ট যারা।  বয়স্ক যারা।  তাদের ভেতরে অবদান যাদের তারা হচ্ছেন, রংপুরের খয়রাত হোসেন, মন্ত্রী ছিলেন, প্রাক্তন মন্ত্রী।
তা. ই. মাসুম: উনি তো নাই?
শেখ আবদুল আজিজ: না উনি নাই। উনি আওয়ামী লীগের উনি ভাষা আন্দোলনে জেল খেটেছেন।  তারপর আপনার এই খাজা দেওয়ানের আনোয়ারা খাতুন।
এসব কথা এরা জানবে কোথা থেকে? ভাষা সৈনিক যাদের আপনারা, বলে বেড়ান তারা? আনোয়ারা খাতুন খাজা দেওয়ানের।  আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাতো সে। ভাষা আন্দোলনে গ্রেপ্তার হইছে সে।  এমএ, এলএলবি মুসলমানদের ভিতরে প্রথম। তারপরে খয়রাত হোসেন, নাম বলেছি।  মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ। নাম শুনেছেন তার?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তিনি জেল খেটেছেন, এই ভাষা আন্দোলনের জন্য গ্রেপ্তার হয়েছেন।  তারপরে খান সাহেব ওসমান আলী সাহেব নারায়ণগঞ্জের জোহা’র বাপ। উনিও জেল খেটেছেন, এরা কিন্তু ছাত্র না।  আর হিন্দুদের মধ্যে কংগ্রেসের ধীরেন.. ধীরেন…
তা. ই. মাসুম: ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত?
শেখ আবদুল আজিজ: ধীরেন দত্ত, রাজকুমার চক্রবর্তী এরা সব জেল খেটেছে। তারা আন্দোলন করেন নাই, কিন্তু পাইকারিভাবে তাদের জেলে দিয়েছে।  আমি তখন, প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে।  আমি মুসলিম হলে ছিলাম।  ২ বছরেরর মধ্যে এমএ পাশ না করলে বা না পারলে মুসলিম হলে থাকতে দিবে না।  আমি, খালেক নেওয়াজ খাঁন দুই জনই মুসলিম হলে থাকতাম।  তো আমরা ২ বছরের ভিতর এমএ পাশ করতে পারি নাই।  কারণ, আন্দোলন করি তো? পরীক্ষা দেই না, তখন আমাদের বের করে দিল মুসলিম হল থেকে।

তখন আমরা ইকবাল হলে, ঐ ইসের ঘর, বেড়ার ঘর মুলি বাঁশের ঘর।  ঐ ইকবাল হলে আমরা আশ্রয় নেই।  ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময়।  যখন দবিরুল ইসলাম প্রেসিডেন্ট ছিল ছাত্রলীগের, ও তখন বাইরে না, ও তখন জেলে। ভাষা আন্দোলনের সময়।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: বাড়ি দিনাজপুর।  দিনাজপুরের দবিরুল ইসলাম ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট ছিল।  আর খালেক নেওয়াজ খান ছিল সেক্রেটারি, সম্পাদক।  সে মইরা গেছে, মইরা গেল, তার কথা আপনাদের খোঁজ করে বলা উচিৎ, ময়মনসিংহের। আমি, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হলো, হওয়ার পরে ঐ গুলি হলো, গুলি হওয়ার পরে খালেক নেওয়াজ আর আমি একসাথে একটা জয়েন্ট খাট, দুই জনে মিলে একখান চওড়া খাট বানাইছি, সেখানে একসাথে দু’জনে শুই।  আমি বললাম যে, চলো পলান দেই আজকে।  খালেক নেওয়াজকে বললাম।  ও কয় যে তুই যা, আমি ছাড়ব না। আমি হল ছাড়ব না।  ঐ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে গুলি হইল একুশে ফেব্রুয়ারি। রাত্তিরের কথা।  আমি চলে গেলাম লালবাগে।  ও থাকল, গ্রেপ্তার হয়ে গেল। বুঝলেন?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তো, আমি এড়ালাম, গ্রেপ্তার এড়ালাম, তখন ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট দবিরুল ইসলাম, দিনাজপুরের, সে তো জেলে।  তখন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ছিল পিরোজপুরের শামসুল হক চৌধুরী।  তার ডাক নাম হইল টেনু চৌধুরী, আপনি লিখে রাখেন, চিনবে।  ভাষা আন্দোলনে আমরা, হলো কী ২১শে ফেব্রুয়ারি আমতলার ঐখান দিয়া মিছিল আরম্ভ হইল।  আমি আমতলার মিছিলে ছিলাম না।  ছিলাম না মানে, আমার কথা ছিল কার্জন হলের দিক থেকে লোক-ছাত্রদের নিয়ে, কার্জন হল তো দেখেছেন?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: ঐখান থেকে এসে ইউনিভার্সিটির কর্নারে একটা ইলেকট্রিক পয়েন্ট দেখেছেন? ইউনিভার্সিটি খেলার মাঠ? খেলার মাঠ ওখানে একটা ইলেকট্রিক পয়েন্ট আছে না কোনায়? দেখেন নাই?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তো, আমি ইতিমধ্যে আমাদের সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, নবাবপুরে আওয়ামী মুসলিম লীগের অফিসে সিদ্ধান্ত হইছে, যদি ১৪৪ ধারা জারি করে সরকার, জারি মানে জারি করা হয়ে গেছে। কুড়ি ফেব্রুয়ারি জারি করা হয়ে গেছে কিন্তু। বুঝছেন নি?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তো, তখন বলা হল যে, ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না।  আমি বললাম, কাজী গোলাম মাহবুব বলল, শামসুল হক সাহেব আমাদের, এটা সর্বদলীয় কমিটি তো? আওয়ামী মুসলিম লীগের সেক্রেটারি টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাহেব বললেন, যে, না।  মাওলানা (আব্দুল হামিদ খার ভাসানী) সাহেব সেদিন ছিলেন না।  মাওলানা ভাসানী সেদিন মফস্বলে ছিলেন।  ২২ তারিখে ঢাকায় হাজির হন।

ওনরা বলে যে, না হবে না।  ভাঙা হবে না।  তো মেজরিটি, ৪ জন বাদে মেজরিটি বলল যে, ভাঙা হবে না।  ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে না।  তদানুসরে ঐ আমতলা থেকে মিটিং হলো।  মিটিং এ মতিনও ছিল, পাবনার মতিন।  যারে ভাষা মতিন বলেন।
খালেক নেওয়াজ ছিল।  বুঝলেন? আমি যাচ্ছি, এর ভিতরেই মিছিল বের হয়ে গেছে, মেয়েদের সামনে দিয়ে।  বুঝলেন না?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: আমি শুনলাম ওখানে, আমি যাওয়ার আগেই বের হয়ে গেছে, কেউ বলেছে ভাঙব না ১৪৪ ধারা, কেউ বলেছেন ১৪৪ ধারা ভাঙব।
লাস্টে সিদ্ধান্ত হলো মেয়েদের সামনে দিয়ে, মেয়ে তো কত? সীমাবদ্ধ আঙুলে গোনা।  এদের সামনে দিয়ে আমরা যাব, ১৪৪ ধারা তো জারি হয়ে গেছে।  ৫ বা ৫ এর অধিক লোক বের হতে পারবে না।  এই হলো ১৪৪ ধারা।  কথা হলো ৫, তাহলে ৪ জন করে সমানে দিয়ে, তো মেয়েদের সামনে দেয়া হলো।  অল্পসংখ্যক মেয়ে দেওয়া হলো, দিয়ে আমরা ঐ যে ইলেকট্রিক ট্রান্সমিটার যেটাকে বলে, ঐ পয়েন্টটা এখনো আছে দেখবেন।  ঐখানে আসার সাথে সাথেই, এর ভিতরে গুলি হইছে মিছিলে। আচ্ছা, তো আমি তো আর সামনে নাই।  মেয়েরা কয়জন সামনে।  মেয়েরা অল্প, দৌঁড় দিছে।  আর মিছিলও ভাঙিয়া গেছে।  তো আমরা আমি ঐখান থেকে মাঠের ভিতর ঢুকেছি।  বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠ।  ঢুকছি, ঢুকার পরে, আমি বলতেছি দৌঁড়াইও না। এটা হলো পটকা ফুটাইছে।  তো, আমার বিশ্বাস হয় নাই, বিশ্বাস করতে পারি নাই যে, ছাত্রদের গুলি করতে পারে।

শব্দ হওয়ার পরে এর ভিতরে দেখি যে, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুল্লাহ আল বাকী, দিনাজপুরের।  তিনটার সময় তিনি, ঐ পটকায় কিন্তু কোন মানুষ মরে নাই।  ওটা পটকা ছিল না, ওটা গুলি।  তিনটার সময় ইমিডিয়েট, ইমিডিয়েট এর বাংলাটা কি দাঁড়ায়?
তা. ই. মাসুম: এর পরপরই।
শেখ আবদুল আজিজ: এর পরপরই দেখি যে একটা গাড়ি আসলো।  আর জগন্নাথ হলের দিক দিয়ে যে রাস্তা, আর ইউনিভার্সিটির দিকে যে রাস্তা, সেটা চার রাস্তার মুখ হইল না?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: ঐখানে কংগ্রেসের পোশাক পরা, মাওলানা বাকী সাহেব। তো উনি কংগ্রেস করতেন এককালে।  খুব কড়া কংগ্রেস।  কিন্তু মুসলিম লীগের সভাপতি হইছেন ইস্ট পাকিস্তানের।  কিন্তু কংগ্রেসী খদ্দরের পোশাক উনি ছাড়েন নাই।  ঐ কংগ্রেসের টুপি, কংগ্রেসের পাঞ্জাবী খদ্দরের।

তখন পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশন চলছিল ঐ জগন্নাথ হলে।  তখন পর্যন্ত অ্যাসেম্বলি হল হয় নাই এখানে।  জগন্নাথ হল যেটা, হিন্দু ছাত্রদের যে হল, তাতে যে অ্যাসেম্বলি হল সেইটাকে বানাইছে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশন হল।
তো ঐ দিকে বাকী সাহেব যাচ্ছেন গাড়ি নিয়ে, সেশনে তখন ৩টা বাজে।  তখন উনি যে যাচ্ছেন।  আমাদের কথা নাই যে হিংসাত্মক কার্য।  কে জানি যাইয়া বাকী সাহেবের গাড়ির পাম ছাইড়া দিছে।  বুঝলেন?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: এই পশু পুলিশ, পশু মুসলিম লীগ সরকার, পাম ছাড়ার বদলে, তাতে যারা ছাড়ছে তাদেরকে গুলি করল! এই সামান্য অপরাধে গুলি কোথায় করল? তাদের দিকে না করে, করল চৌমাথার উল্টোদিকে মেডিকেলে যে গেটটা? ঐখানে মেডিকেলের ব্যারাক ছিল।  মুলি বাঁশের ব্যারাক।  ঐ ব্যারাকের ভিতরে সমস্ত ছাত্ররা-পাবলিক সব জমা হইছে।

ব্যারাকের ঘর ছিল ৪ ফুট ইটের গাঁথুনি, তার উপরে মুলি বাঁশের বেড়া, তার উপরে আবার মুলি বাঁশের চাল।  বুঝেছেন? ঐখানে আমরা দাঁড়ানো।  ঐ মিছিলে যোগ দিব।  যেই পাম ছেড়েছে, তখনই গুলি করেছে।  রাস্তায় গুলি না করে, গুলি করেছে ঐ যে ব্যারাকে তার দিয়ে ঘেরা।

আর ঐ ব্যারাকের ৩ ফুট উঁচু যে ওয়াল, ওখানে লোক দাঁড়ানো রয়েছে, সেখানে গুলি করেছে।  ঐ ওয়াল ফুটো হয়ে ভিতরে গুলি ঢুকেছে।  সেই সময় অন্তত ২ জন কি ৩ জন, এই গুলি শুনে আমি, আমার ধারণা পটকা ফুটাইছে।  আমি দিছি দৌঁড়!
সেখানে গুলি করেছে।  আর সেই গুলি ওয়াল ভেদ করে চলে গেছে।  এবং ঐ গুলিতে ২ জন লোক মারা গেছে।  একজনের এই মাধার ঘিলু-মুণ্ডু সেপারেট হয়ে গেছে।  এবং তার ঘিলু-টিলু একেবারে রাস্তায় ছড়াইয়া পড়েছে। পরে জানলাম তাদের পরিচয়।

আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ তখন এমএলএ।  এই ঘটনা শুনার সাথে সাথে তিনি অধিবেশন থেকে বেরিয়ে আসলেন গুলির ওখানে।  ওখানে একটা বটগাছ ছিল। তখন আমরা মাইক বন্ধ করলাম।  তিনি (আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ) মাইকে বক্তৃতা শুরু করলেন।  এই ঘটনার প্রতিবাদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, রাজকুমার চক্রবর্তী, মন্ডল ধর এরা সব ওয়াক আউট করলেন।

খান সাহের ওসমান আলী, খয়রাত হোসেন ওয়াক আউট করলেন।  পরে আমরা মাইকে বক্তৃতা শুরু করলাম।  খালেক নেওয়াজ, আমি।  কাজী গোলাম মাহবুবের কোন সন্ধান পেলাম না।  পরে চলে গেলাম হলে।  আমি হল থেকে চলে গেলাম লালবাগ।  এইভাবে আমি গ্রেপ্তার এড়ালাম।  খালেক নেওয়াজ অ্যারেস্ট হলো। আরো পাইকারীভাবে অনেক ছাত্র অ্যারেস্ট করল।  ঐদিন করল, তারপরে ২২শে ফেব্রুয়ারি করল।  ২২শে ফেব্রুয়ারি আবার মিছিল হলো।  পুরনো ঢাকা থেকে সারা ঢাকায় আগুন জললো।

ঐদিন হাইকোর্টের সামনে হক সাহেব (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক) হাইকোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেল, সান্তনা বক্তৃতা দিলেন।  মিছিলে ছিলেন না উনি। এর ভিতরে অনেকে গ্রেপ্তার হয়, গোলাম মাহবুবব গ্রেপ্তার, শামসুল হক চৌধুরী গ্রেপ্তার হলো।

পরের দিন সব জায়গায় স্ক্যটার্ড।  ইঞ্জনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের নেতা কুমিল্লার নূরুল হুদা সহ আমরা চিলেকোঠায় মাইক বসালাম। নেপথ্যে বক্তৃতা করতাম এ সরকারের পতনের দাবি করে।  তখন সলিমুল্লাহ হলে প্যারালাল গভর্নমেন্ট হলো।
২৩ তারিখ সব পতন শুরু হয়।  ২৩ তারিখ আমরা যেখানে শহীদ মিনার, ওখানে শহীদ মিনার করলাম।

ইট বালি সিমেন্ট ছিল।  ওস্তাগার এনে বানানো হলো।  সেটা ফুলে ফুলে ভরে গেল। ফুলের মিনার হলো।  সমস্ত নর-নারী সবাই এল শহীদ মিনারে।  ২৪ তারিখ সন্ধ্যার পর ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলের আড়ালে যতদূর মনে হয় ২৪ তারিখ রাতে।  আমি দাঁড়ানো ছিলাম, সন্ধ্যার পরে ইপিআর ক্রেন দিয়ে শহীদ মিনারটা আস্ত উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল।  তখন প্লেন থেকে মুসলিম লীগ লিফলেট বিতরণ করল।  এই ধ্বংসাত্মক কাজ করছে এই রাষ্ট্রভাষার নাম দিয়া পাকিস্তান ধ্বংস করার জন্য। একটা ষড়যন্ত্র করেছে এই আন্দোলনের মাধ্যমে এবং ভারতের উস্কানিতে।  প্লেন দিয়ে দিয়ে লিফলেট ছড়াতে লাগল, সারা ঢাকাসহ সব পূর্ব বাংলায়।  বুঝেছেন?
তা. ই. মাসুম: জ্বি। শেখ আবদুল আজিজ: তারপরে, আমরা তো এখন আটকে গেছি। তো এখন আমি আর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি শামসুল হক চৌধুরীসহ সভাপতি, আর সভাপতি দবিরুল ইসলাম তো জেলে।  এই দুই জনে, আমি তো সরে দাঁড়াইছি সেও সড়ে দাঁড়াইছে।  তো, আমরা লালবাগে রাত্রে এক বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। নিয়ে আমরা এই ঢাকা থেকে বুঝলেন?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: চকবাজারের ওখানে গিয়ে একটা নৌকায় উঠলাম।  তাও একটু গভীর রাত্রে।  নৌকায় উঠে আমরা নারায়ণগঞ্জে গেলাম।  আমার বাড়ি খুলনা। আর শামসুল হক চৌধুরীর বাড়ি পিরোজপুর।  দুই জনে এক পথে যাত্রা করব বাড়ি। নারায়ণগঞ্জ যাইয়া এই নৌকা বাদ দিয়া আরেকটা নৌকা ধরলাম।  টাবুরে নৌকা। এই নৌকা দামুদ্যা যায়।  দামুদ্যা নাম শুনেছেন?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: এটা বোধ হয় মাদারীপুরের ভিতর হবে।  এই দামুদ্যা যাই। দামুদ্যা যাইয়া, ওইখানে আমরা ভোর রাত্রে যাইয়া পৌঁছাই নৌকায়।  যাইয়া দেখি যে বদনায় ভরে রসগোল্লা বিক্রি করে।  এক এক বদনা রসগোল্লা তিন টাকা-চার টাকা বিক্রি করে।  তো, আমরা এক বদনা কিনলাম চার টাকায়।  খেয়ে ওখান থেকে, দামুদ্যার থেকে আমরা গোয়েন্দার চোখ এড়াইয়া স্টিমারে উঠলাম, গেলাম মাদারীপুর।

তো দুই জন মিল কইরা লঞ্চে উঠে মাদারীপুরের জলির পাড়, ঐখানে নামলাম। ওখানে নেমে দেখি সবখানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই মিছিল মিটিং চলছে।  যাইয়া ওখানে নেমে ঐ মিছিলে নেতৃত্ব দিলাম।  শামসুল হক বলে না, আমি আর পারব না।  আমার ঐ ভাইজির বাসায়, টোল দারোগা ছিল আমার ভাইজি জামাই।  জলির পাড়।  এখন সে স্টেশন উঠে গেছে।  ওখান থেকে ঐ করে।  তারপরে ঐখান থেকে একটা টেলিগ্রাম করলাম বাড়িতে, তো বিধবা মা।  মা আমি বেঁচে আছি।

তখন বঙ্গবন্ধু জেলে, তাকে ছেড়ে দিছে, বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিছে।  মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় আসলেন।  শামসুল হক ওখান থেকে টুঙ্গীপাড়ায় গিয়ে যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছে।  আমি আর দেখা করলাম না।  এরপরে ৩-৪ দিন পরে যাইয়া খুলনায় আন্দোলন করি।  মিছিল করি, মিটিং করি।  বলি অনেক মারা গেছে, তখন তো বয়স কম, তো আন্দাজে আন্দাজে বলি।  এখন তো হিসাব করে কথা বলি? এই অনেক লোক মারা গেছে, কত? আমি কি বলছি তা? এরপরে তো আস্তে আস্তে আন্দোলনটা স্তিমিত হয়ে যায়।  পাকিস্তানের প্রথম ৭-৮ বছর পুলিশ রাজ ছিল।  ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত।
তা. ই. মাসুম: স্যার, যে চেতনা নিয়ে একটা স্বাধীন দেশ বা একটা স্বার্বভৌম রাষ্ট্র অথবা একটা মাতৃভাষার দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন তার কী বাস্তবায়ন হয়েছে?
শেখ আবদুল আজিজ: না, হয় নাই। হয় নাই।
তা. ই. মাসুম: কী কী হয় নাই?
শেখ আবদুল আজিজ: দেখুন এক কথায় বললে, উই আর গিল্টি।  উই আর পলিটিশিয়ান্স, আই অ্যাম অলস ওয়ান অব দেম।  আই ওয়াজ অলস ইন পাওয়ার। আমি মন্ত্রী ছিলাম, স্বাধীন বাংলা (মন্ত্রীসভার) প্রথম মন্ত্রী কিন্তু আমি।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: আমরা ভুলেই গেলাম ক্ষমতা পেয়ে।  ১৯৭১ সালে আমি ডিসেম্বর মাসে মন্ত্রী হই।  বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানে আটকা।  তাজউদ্দিন তখন প্রধানমন্ত্রী।  এই ইতিহাসটা মনে আছে?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তার কেবিনেট, ছোট্ট কেবিনেটের আমি ছিলাম যোগাযোগ মন্ত্রী।  বঙ্গবন্ধু ফিরে আসলেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তিনি এসে কেবিনেট রি-শাফল করলেন। তাতেও আমি মন্ত্রী।  তাতে আমি কৃষিমন্ত্রী।  তা, আমি যতক্ষণ দেখেছি যে, আমরা আমাদের মন্ত্রিসভা এই ভাল কাজ কিছু কিছু করেছি।  আমরা কিন্তু মৌলিক যে সমস্ত দাবি নিয়ে দেশের মানুষ আন্দোলন করেছে, সেই কিছু কিছু কাজ বাস্তবায়িত করতে পারি নাই।  যেমন, রাষ্ট্রভাষা বাংলা এটা হয়েছে।  সেটা আমরা কার্যকর করেছি। এটা করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার, একটা কথা ঠিক, দেখুন, একটা ইচ্ছা লাগে।  ইচ্ছা, একটা প্রচেষ্টা নিয়া আপনি চলার পথে ব্যর্থ হন, সে ব্যর্থতা এক ধরনের ব্যর্থতা।  কোন প্রচেষ্টা না করা আরেক ধরনের ব্যর্থতা।  আপনি আমার বাড়িতে যাত্রা করেছেন, পৌঁছার জন্য, কিন্তু পথে বাঁধা পেয়ে আসতে পারেন নাই, সে এক ধরনের ব্যর্থতা।  আপনি প্রচেষ্টা করেছেন, আর মোটেই যাত্রা করলেন না, সেটা আরেক ধরনের ব্যর্থতা।  বুঝেছেন?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: তো, এখন আপনি বলেন, আমার পাল্টা প্রশ্ন, কোন পয়েন্টে ব্যর্থতা হয়েছে আমাদের বলেন? আমাদের রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর।
তা. ই. মাসুম: এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের মধ্যে যে মানুষ, তাদের মধ্যে এখনো ঐক্য হয় নাই।  আবার এই মানুষগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয় নাই।  আবার আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ একটা পরিচিতি পেয়েছে, কিন্তু সে পরিচিতি কাজে লাগিয়ে যে নিজেদেরকে ধনে-সম্পদে, মান-সম্মানে সেইভাবে উপস্থাপন করবে বিশ্বের কাছে সেটা আমরা পারি নাই।  তবে আপনাকে আমি একটা কথা বলি।  রাজনীতি তো করা হয় মানুষের, দেশের উন্নতির জন্য, নাকি?
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: আমাদের যে এত বছর দেশ স্বাধীন হয়েছে।  আমরা ভাঙলাম পাকিস্তান।  করলাম যে, পাকিস্তান হলে আমরা নিজেদের মতো অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হবো।  স্বনির্ভর হবো।  একটা উন্নত, সমৃদ্ধশালী দেশে উন্নীত হবো।  এই তো মূল কথা? মানুষের সার্বিক, আর্থিক চেহারার পরিবর্তন হবে। কিন্তু আমরা যে দলই ক্ষমতায় আসুক তার ভিতরে আওয়ামী লীগ হচ্ছে স্বাধীনতার দল।  সংগ্রামী দল এবং স্বাধীনতার নেতৃত্বের দল।  তার দায়িত্ব অনেক বেশি।
একটা থাকে, একটা প্রচেষ্টা, এই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত করার জন্য কোনো অবকাঠামো আজ পর্যন্ত, অন্য কেউ বাদ দিন, আমরা করি নাই।  কী করে দেশ সার্বিকভাবে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হয় তার একটা পরিকল্পনা, একটা কাঠামো আমরা করতে পারি নাই।  একটা কাঠামো দিলে সেই কাঠামোর ভিতর দিয়ে দেশ এগিয়ে যায়।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: আপনি যদি, আমার বাড়িতে এসেছেন, আসার পথ যদি ভুল করেন তাহলে তো আপনি গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারবেন না।  আপনি পথই ঠিক না কইরা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ান।  এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ান পথ ঠিক না কইরা। তাহলে তো আপনি আমার বাড়িতে আসতে পারবেন না।  এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলা স্বাধীন।  তো, এই এক সাগর রক্তের বিনিময়, কিসের জন্য হইছে? মন্ত্রী বানানোর জন্য হইছে? গাড়িতে ফ্ল্যাগ উঠে, ফ্ল্যাগ উড়িয়ে যাওয়ার জন্য হইছে?

মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য।  হাসি তো বোগলে কাতুকুতু দিয়ে উঠালে হয় না? অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করে হাসি ফোঁটাতে হবে।  হাসি ফোঁটাতে গেলে মানুষের বোগলে কাতুকুতু দিয়ে হাসি ফোঁটানো যায় না।  মূল সমস্যা সমাধান করে হাসি ফোটাতে হয়।  সে সমস্যা হচ্ছে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ।  সমস্ত শ্রেণীর মানুষ, জাতি-মানুষ, খেতে পায় পড়তে পায়, কাজ পায়, শিক্ষা পায়, সংস্কৃতি বিকাশের সুযোগ পায়, সার্বিকভাবে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা যায় তখনই উন্নত হয়।
তা. ই. মাসুম: এটা কীভাবে করা যায়? শেখ আবদুল আজিজ: করা যায়, পরিকল্পনা নিতে হবে? আপনার কোরিয়া দুই ভাগে বিভক্ত হইছে।  দুই কোরিয়াইতো শক্তিশালী।  তারা আজকে অ্যাটমিক অ্যানার্জী, নিউক্লিয়ার ক্ষমতায় ক্ষমতাশীন।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: খাদ্য ক্ষমতা মিটিয়ে এখন নিউক্লিয়ার ক্ষমতাবান।  আর আমরা খাদ্য সমস্যাই সমাধান করতে পারলাম না।  ৩৬ বছর দেশ স্বাধীন হলো।
যদি না পার, আমরা যদি না পারি? যারা পারে, যারা স্বাধীন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করছে দেশ, তাদের কাছ থেকে শিখ না? তাদের কাছ থেকে তো আমরা শিখতে পারি? যেসব দেশ উন্নত, সমৃদ্ধশালী হয়েছে।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে আমরা শিখতে পারি। এতে কোন দোষের নাই কিছু।
তা. ই. মাসুম: জ্বি।
শেখ আবদুল আজিজ: টেকনোলজি, ঝাঁপাইয়া পড়তে হবে। বিভিন্ন সেক্টরে কাজ ভাগ ভাগ দিয়ে। ত্রু টিপূর্ণ পরিকল্পনা দিয়ে তো দেশ উন্নত হবে না। একটা কথাই বললাম, কী করে এখন কুড়ি লাখ টন, আমি তখন মন্ত্রী, ১৯৭১ সালে ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তখন কুড়ি লাখ টন খাদ্যের অভাব। এখনো কুড়ি লাখ টন খাদ্যের শর্টেজ। কী হয়েছে? ত্রু টি কোথায়?

যুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কাঁকর ভরা চাউল খেতে পারি নাই। আমার স্ত্রীর চাউলের কাঁকর বাছতে বাছতে চোখের থেকে পানি বের হইত। চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এত কাঁকর! ভারতের অংশ পশ্চিমবঙ্গ এখন বাঁশমতির মতো চাউল ঘরে ঘরে খায়। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

চলবে…