চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মানব সভ্যতাকে ‘জিনিয়াস’ দেবার জন্য ধন্যবাদ

প্রিয় ওয়েব:

একটা ভাল বড় ওয়েব সিরিজ দেখার দিনগুলো কেমন যেন অন্যরকম লাগে। মনে হয় জীবন কী সুন্দর- তাই না? বর্তমানে সেরকম একটা অসাধারণ ওয়েব/টিভি সিরিজ দেখছি। করোনার এই ভীষণ টেনশনের দিনে ঐ ওয়েব দেখার সময়টুকু সব ভুলে যাই। তাই কম কম করে দেখি- যত বেশি দিন ধরে দেখা যায়। প্রথম সিজনে প্রায় ঘন্টাখানেকের ১০টা অ্যাপিসোড- প্রায় ১০ ঘণ্টা। তাতেও মন ভরেনা।

সিরিজ প্রেমীরা জানবেন তাদের সবচেয়ে প্রিয় সিরিজ দেখার সময়টা যদি সারাটা জীবন হতো তাহলে – সে জীবন স্বর্গের জীবন হতো। যাদের ফিজিক্স, চিত্রকলা আর সংগীত নিয়ে আগ্রহ আছে তাদের কাছে এই ওয়েব সিরিজ বিশাল একটা ট্রিট- মধু । শুধু মধু নয়- তাদের মনে হবে- তারা যেন তাদের স্বপ্নের দিনগুলোতে চলে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

সিরিজের প্রথম অ্যাপিসোডটি বানিয়েছেন রন হাওয়ার্ড…

বিজ্ঞাপন

সিরিজটার নাম ‘জিনিয়াস’। পৃথিবীর সেরা জিনিয়াসদের বায়োগ্রাফিকাল সিরিজ। আমাদের শতকের সেরা জিনিয়াস কে? সবাই এক কথায় যার নাম বলবেন- তাকে নিয়েই প্রথম সিজনটা। হুম অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। প্রথম সিজনটা আইনস্টাইনের জীবন নিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টার একটা অসাধারণ সিনেমা। আলোড়ন তোলা খুব প্রেস্টিজিয়াস এই সিরিজটি বানিয়েছেন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক টেলিভিশন। যা ২০০৭ সালে প্রকাশিত ওয়ালটার ইসাকসনের লেখা আইনস্টাইনের জীবনীগ্রন্থ ‘আইনস্টাইন: হিজ লাইফ এন্ড ইউনিভার্স’ অবলম্বনে নির্মিত।

সিরিজের প্রথম অ্যাপিসোডটি কে বানিয়েছেন জানেন- রন হাওয়ার্ড! কোন রন হাওয়ার্ড বুঝতে পারছেন তো? Apollo 13, A Beautiful Mind, Cinderella Man, The Da Vinci Code, Frost/Nixon, Angels & Demons, The Dilemma, In the Heart of the Sea এর ডিরেক্টর। সিরিজটির ক্রিয়েটর কেনেথ বিলার। পারসেপশন বা লিজেন্ড এর মত টিভি সিরিজ বানিয়েছেন আগে কিন্তু ‘জিনিয়াস’ তাকে পরিচিত করিয়েছে পুরো বিশ্বে। ব্রায়ান গ্রেজার, জেফ কুনি, স্যাম সকলোর প্রডিউসাররা আছেন এই সিরিজের সাথে।

সিরিজটা দেখে প্রথমে একটা ধাক্কা খাবেন যারা আইনস্টাইনকে দেবতা মনে করেন। আইনস্টাইনের ব্যক্তিজীবন আপনাদের শ্রদ্ধার ফুল শুকিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এই সিরিজটা মনে করিয়ে দেয় পৃথিবী দেবতারা পাল্টায় না, আমাদের মত ভাল-মন্দে ভরা –কমতি থাকা -ব্যর্থ মানুষরাই বদলায়। আঘাত খেতে খেতে- ভুল করতে করতে- ঠিক করে ফেলা মানুষরাই বদলায়। আইনস্টাইন কেন- যে কোন কিংবদন্তীকে মানুষ গাল গল্প আর মুগ্ধতার সিঁড়িতে করে আকাশে তুলে ফেলে- মানব থেকে দেবতা বানিয়ে ফেলে। তাঁদের আকাশ থেকে নামিয়ে যতটা তার সত্যিকার স্ট্রাগলটা দেখব- কষ্টটা দেখব- মানুষের কাছাকাছি আনব- ততটাই মানুষের লাভ। মানুষ ভাবতে শিখবে- যারা পেরেছিল পৃথিবী বদলাতে, তারাও আমাদের মত মানুষই ছিল- অতি মানব নয়। আমরা – এই সাধারণ রাই অসাধারণ হয়ে উঠে নিজের কাজ দিয়ে। আইনস্টাইনের ব্যক্তিজীবন যেমন আছে- তার ভীষণ মেধা প্রকাশের কোন কমতি নেই এখানে। এই দুইয়ের মিলমিশটাই এই সিজনটার বিউটি, এইসথেটিকস।

পদার্থবিদ্যা বিশেষ করে কোয়ান্টাম থিউরি নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের কাছে ‘জিনিয়াস’-এর প্রথম সিজন যেন স্বপ্নের পৃথিবীতে হাঁটার মত। সে অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়। এখানে তাদের সামনে হেঁটে বেড়াবে তাদের স্বপ্নের মানুষেরা। মেলিভা মারিচ, ফ্রিৎজ হেবার, ফিলিপ লেনার্দ, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক (কোয়ান্টা-র সেই ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক) , নীলস বোর, পিয়েরে কুরি, মাদাম কুরি মত বিজ্ঞানীরা। সে অভিজ্ঞতা বিজ্ঞান ভালবাসা মানুষদের কাছে সত্যি অবর্ণনীয়। এদের সবাই ১৮৯০ থেকে ১৯৩০ অব্দি পৃথিবী কাঁপিয়ে ছিল, বেশির ভাগই নোবেল পেয়েছিল আইনস্টাইনের আগে।

আইনস্টাইন চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছেন জেফরি রুশ…

আর সিরিজের নির্মাণ নিয়ে একটা কথাই বলবো, ‘জাস্ট – অসাধারণ’। ভীষণ ঠিকঠাক। এই সিরিজ আপনাদের ১৮৯০ থেকে ১৯৩০ এর সেই সময়টায় নিয়ে যাবে। আর্ট ডিজাইন, লোকেশন, কস্টিউম, অ্যাকটিং স্টাইল সব মিলিয়ে আপনি হারিয়ে যাবেন বিজ্ঞানের সেই স্বর্ণ সময়ে। ভিজ্যুয়াল আর অভিনয় মিলিয়ে মেক বিলিভের চূড়ান্ত হবে।

জেফরি রুশ আইনস্টাইন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি সেই সেই অল্প কিছু অভিনয় শিল্পী যার ঝুলিতে আছে ট্রিপল ক্রাউন অব অ্যাক্টিং। মানে টিভির এমি অ্যাওয়ার্ড, মঞ্চের টনি অ্যাওয়ার্ডস আর সিনেমা একাডেমি অ্যাওয়ার্ড- তিনটাই আছে। এছাড়া বাফটা , গোল্ডেন গ্লোব, অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অ্যাওয়ার্ড – সব পেয়েছেন তিনি। তার অভিনয় নিয়ে আর কী বলবো- জেফরিকে বলা হয় অস্ট্রেলিয়ার ফাইনেস্ট অভিনেতা।

জেনি ফ্লাইন ও সামান্থা…

ম্যালিভা চরিত্রে পৃথিবীর অন্যতম সেরা অভিনয়টা করেছেন মঞ্চের ডাক সাইটে অভিনেত্রী সামান্থা কোলি- আর আমার কাছে বিস্ময়কর লেগেছে আইনস্টাইনের তরুণ চরিত্রে জনি ফ্লাইনকে। মূলত গায়ক জনি ফ্লাইন- কী অসাধারণ ভাবে আইনস্টাইন হয়ে উঠেছেন! কী অসাধারণ চরিত্রায়ণ। আর হ্যাঁ, থিমটা কম্পোজ করেছেন হ্যান্স জিমার।

শুরু করে ফেলুন জিনিয়াস এর প্রথম সিজন দেখা। ২য় সিজন পাবলো পিকাসোকে নিয়ে। সেখানে পাবলো পিকাসোর চরিত্রে অভিনয় করেছে অ্যান্তানিও বানদারেস। সেও এক আলাদা অভিজ্ঞতা। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলকে ধন্যবাদ মানব সভ্যতাকে জিনিয়াস দেবার জন্য।

লেখক: চলচ্চিত্র নির্মাতা