চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাতৃদুগ্ধ: মা ও সন্তানের সম্পর্কের বন্ধন

আজ শনিবার থেকে শুরু হলো বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ (১-৭ আগস্ট)। বিশ্বের ১৭০টি দেশে এক যোগে মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হয়। বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ সপ্তাহ পালনে বিশেষ উদ্যোগ এবং বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হয়েছে মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘কাজের মাঝে শিশু করবে মায়ের দুধ পান, সবাই মিলে সবখানে করি সমাধান’।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের দুধ নবজাতকের জন্য আদর্শ পুষ্টিকর খাবার। এতে সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ অনেক কমে যায়। মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটে পরিপূর্ণভাবে।

এতে মায়েদের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমে। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে জাতি উপকৃত হয়। মাতৃদুগ্ধ পানের মধ্য দিয়ে সন্তান ও মায়ের মধ্যে তৈরি হয় এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।

গবেষণায় আরো দেখা গেছে, জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হলে নবজাতক মৃত্যুর হার ২২ শতাংশ কমানো সম্ভব। শুধু মায়ের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে বছরে ৩৭ হাজার নবজাতকের জীবন রক্ষা পায়।

একটি জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৪৩ শতাংশ নবজাতক জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ পায়। অথচ জন্মের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার নবজাতক বছরে মারা যায়। এ ছাড়া প্রতিবছর জন্মের পর প্রথম ২৮ দিনে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার নবজাতক মারা যায়।

এই ভয়াবহ চিত্র দেখলেই বোঝা যায়, জন্মের পরপর শিশুকে মায়ের দুধ দেওয়া কতটা জরুরি।

মায়ের দুধের খাদ্য উপাদানে বিশেষ ফ্যাটি এসিড আছে, যা শিশুর বুদ্ধিদীপ্ততা ও চোখের তীক্ষ্ণতা বা জ্যোতি বাড়ায়। মায়ের দুধে প্রায় ১০০ উপাদান রয়েছে, যার প্রতিটি উপাদানই শিশুর জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। সন্তান জন্মদানের পর হলুদাভ ঘন যে দুধ বের হয়, একে শালদুধ বা কোলাস্ট্রাম বলে। পরিমাণ কম হলেও, এটি নবজাতকের জন্য যথেষ্ট। শালদুধে অনেক বেশি রোগপ্রতিরোধক উপাদান ও শ্বেতকণিকা থাকে। এ উপাদান শিশুকে বিভিন্ন রোগ-জীবাণু থেকে রক্ষা করে।

সর্বশেষে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস-২০০৭) এ বলা হয়েছে, মাত্র ৪৩ শতাংশ নবজাতককে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে দুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে ৯২ শতাংশ শিশু শালদুধ পায়। ওই জরিপে বলা হয়, ছয় মাসের কম বয়সী ৪৩ শতাংশ শিশু শুধু বুকের দুধ পান করে। একই বয়সের এক শতাংশ শিশুকে একেবারেই বুকের দুধ দেয়া হয় না।

অন্যদিকে ৫৬ শতাংশ শিশুকে অন্যান্য খাবারের পাশাপশি বুকের দুধ দেওয়া হয়। ৪ থেকে ৫ মাসে গিয়ে মাত্র ২৩ শতাংশ শিশু শুধু বুকের দুধ পান করছে।

শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের সভাপতি এবং ইন্সস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান বলেন, শিশুকে ৬ মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এর ফলে মা এবং শিশু, উভয়েরই স্বাস্থ্য ভাল থাকবে। এছাড়া মা এবং শিশু মৃত্যুহার কমানো আমাদের দেশের পক্ষে সম্ভব হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বিশ্বে মায়ের দুধ পানের ধারাটি অনেক কমে গেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ-২০১৫ পালনের প্রস্তুতি বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি।

১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মায়ের দুধ পানের হার ছিল ৪৩ শতাংশ। ২০১১ সালে এ হার ৬৪ শতাংশ হলেও ২০১৪ সালে এ হার ৯ শতাংশ কমে ৫৫ শতাংশে এসে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞাপন

জাহিদ মালেক আরো বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীরা সন্তানদের যাতে ঠিকমতো বুকের দুধ খাওয়ানোর সুযোগ পায় এ জন্য সচেতনতা তৈরিতে ২০১০ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশে প্রতিবছর এ দিবস পালন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকারি পর্যায়ে ৬ মাস বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পায় সংশ্লিষ্টরা। তবে তা বেসরকারি পর্যায়ে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত।

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি নারী কাজ করে গার্মেন্টসে। এসব কারখানায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিতে হবে।

এবারের মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে সাতটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো, মায়ের দুধ খাওয়ানোর সুব্যবস্থা, কাজের মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য বিরতি, চাকরির সুরক্ষা ও বৈষম্যহীনতা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, মাতৃত্বকালীন আর্থিক সহায়তা, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং কারা এ সুযোগ পাবে তা নির্ধারণ করা।

মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য বিক্রয় ও বিপণন নিয়ে দেশে আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন ঘটছে না। এর সুযোগে রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দোকানপাটে বিক্রি হচ্ছে মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গুঁড়ো দুধ ও ফর্মুলা ফুড হিসেবে পরিচিত খাবার।

জন্মের পর থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধই শিশুর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ খাবার হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় পুষ্টিগুণ সে পেয়ে থাকে মায়ের দুধ থেকেই। ফলে শিশুর সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করতে জন্মের পর থেকেই সে যাতে শুধু মায়ের দুধ গ্রহণ করে, তা নিশ্চিতে উদ্যোগ রয়েছে সারা বিশ্বেই। বাংলাদেশেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন থাকলেও আইনটির বিষয়ে জানা নেই অধিকাংশ মানুষেরই।

আইন সম্পর্কে না জেনেই দোকানে বিকল্প গুঁড়ো দুধ ও ফর্মুলাগুলো বিক্রি করছেন সাধারণ দোকানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুপার শপগুলো। এমনকি শিশুর মা-বাবাসহ অভিভাবকরাও সচেতন নন শিশু খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে। তারাও মায়ের দুধের চেয়ে এসব বিকল্প খাদ্যের উপর নির্ভর করছেন এবং এগুলোকেই শ্রেয় মনে করে কিনছেন অহরহ।

সারা বিশ্বে শিশুদের সুষম পুষ্টি নিশ্চিত করতে ১৯৮১ সালে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে, যা ‘ইন্টারন্যাশনাল কোড অব মার্কেটিং অব ব্রেস্টমিল্ক সাবস্টিটিউটস’ নামে পরিচিত। এরপর ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশে ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য (বিপণনের নীতিমালা) আইন’ করা হয়। ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর এ আইনটি সংশোধন করা হয়।

তবে সংশোধিত আইনের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত ১৯৮৪ সালের আইনটি রহিত করা হয়েছে এই আইনেই। ফলে বর্তমানে দেশে বিকল্প শিশুখাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কোনো আইনেরই কার্যকারিতা নেই বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ।

প্রসঙ্গত, ১৯৮৪ ও ২০১৩ সালের উভয় আইনেই মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য ভোক্তাদের সামনে প্রদর্শনের শাস্তি হিসেবে আইনে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে রাজধানী ঢাকার সুপার শপগুলো থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন উপজেলা পর্যন্ত বিভিন্ন দোকানে অবাধেই বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাতৃদুগ্ধ বিকল্প খাদ্য ও দুধ। এ ধরনের পণ্য বিশেষভাবে প্রদর্শনের জন্য দোকানের মালিকপক্ষের সঙ্গে উৎপাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের চুক্তির কথাও জানা যায়।

মায়ের দুধ খাওয়ানো অবশ্যই একটি অপরিহার্য জরুরী উদ্যোগ। এতে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। ব্যক্তি ও পরিবারের সঙ্গে রাষ্ট্রকেও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। কর্মক্ষেত্রেও গড়ে তুলতে হবে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপযোগী পরিবেশ।

ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, চাকরিজীবী, গৃহিণী- প্রত্যেক মা তাঁদের সন্তানকে বুকের দুধ দিতে আগ্রহী ও সচেতন হবেন- এটাই হোক ‘বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস’-এর প্রধান লক্ষ্য।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View