চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাঘের শীতে জানালা খুলে আজও কান পেতে রই

চৌদ্দ-পনেরো বছর আগের কথা। মাঘের তীব্র শীতের রাতে কুয়াশা কেটে কেটে বাড়ি ফিরছি। মিরপুর চৌদ্দ নম্বর হয়ে পুলপাড় দিয়ে ইব্রাহীমপুর রোডে ঢুকবো বলে। কিন্তু মানুষের ভিড় ঠেলে একটু এগিয়ে গিয়ে আর যেতে পারছিলাম না। রাত তখন ১১টা পেরিয়ে গেছে। অসময়ের উটকো ঝামেলায় প্রচণ্ড মেজাজ বিগড়ে গেলো। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় যেখানে শীতের রাত, সেখানে এতো মানুষ কোথা থেকে এলো এই রহস্য উৎঘাটনে দু’একজনকে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম, কচুক্ষেত বাজার দোকান সমিতির শীতকালীন আয়োজন হিসেবে লোকসংগীত শিল্পী মমতাজ বেগমের গান গাওয়ার কথা ছিল। তবে কি এক জটিলতায় তিনি তখনো আসতে পারেননি। কেউ কেউ বলছেন, তিনি আসবেন না। কেউ আবার, যদি তিনি আসেন-এই আশায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিও নিচ্ছেন না।

শেষ পর্যন্ত আমিও একটা ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে যতদূর দৃষ্টি যায়, দেখলাম কেবল জনসমুদ্র। যদিও সেদিন আর মমতাজ বেগম আসেননি কচুক্ষেতে, কিংবা তার আসার খবরটাই হয়তো ছিল গুজব। তবে এই ঘটনার বছর পাঁচেক আগে মিরপুর স্টেডিয়ামে মনা নামের এক কিশোরের ছুরিকাঘাতে মৃত্যুর পর ওপেন ইয়ার কনসার্ট বন্ধ হয়েছে রাজধানী ঢাকায়। অবশ্য পুরো নব্বই দশক জুড়ে আইয়ুব বাচ্চু, জেমস আর হাসানের কনসার্ট ছিল রমরমা। আরো ছিল মাইলস, ওয়ারফেইজ, ফিডব্যাক, সোলস্-এর মতো ব্যান্ড।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে কোনো কনসার্টে আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান থাকা মানে তরুণ সমাজের পাগল পাগল অবস্থা। কিংবদন্তী এই শিল্পীদের ওপেন এয়ার কনসার্ট ঘিরে গোটা শীতেই চলতো উৎসব। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পাড়ায় মহল্লায় প্রায় প্রতিদিনই রাতেই থাকতো কনসার্ট। এমন আয়োজন ছিল উঠতি ব্যান্ডগুলোর নিজেদেরকে তৈরি করে নেয়ার একটা বড় সুযোগও। পাশাপাশি তা ছিল দর্শক-শ্রোতাদের টানা শীতকালীন বিনোদন।

বিজ্ঞাপন

মধ্যবিত্ত অার পাড়া-মহল্লায় যে শুধু কনসার্টই হতো, তা নয়। একই সাথে বসতো আধুনিক কিংবা বাউল গানের আসর। জারি ও পালা গান। প্রতিটি পাড়ায় যেমন ছিল বিশাল বিশাল মাঠ, ঠিক তেমনি বসতো গানের আসরও। শীতের রাতে শুধু কি গান? যাত্রা কিংবা ওয়াজ মাহফিলও ছিল নিয়মিত। ছেলেবেলায় শুনেছিলাম শীতের রাতে খুব নাকি জমতো যাত্রাপালা। ছিটেফোঁটা সৌভাগ্যও হয়েছিল তা দেখার। আমাদের সময়ে এসেছিল পাশ্চাত্য ঢঙে ব্যান্ড মিউজিক।

সব দিন যে গানের মেলায় যোগ দিতে পারতাম তা নয়। তবে রাতে শোবার পর প্রতিদিনই কান পেতে রাখতাম। শীতের শুনশান রাতে বহুদূর থেকে ভেসে আসতো সুর। প্রায় সারারাতই চলতো কোথাও না কোথাও গান। আমি লেপমুড়ি দিয়ে আধোঘুমে গান শুনেই কাটিয়ে দিতাম রজনী। সেই দিনগুলো কোথায়?  আজ সেই মাঠগুলোতে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন। আকাশছোঁয়া ওসব অট্টালিকায় ভারি কাঁচটানা বাতায়ন। শব্দ, শৈতপ্রবাহ কিংবা সুর… কারোই সাধ্য নেই বিনা অনুমতিতে সেখানে প্রবেশের।

এখন এক রিমোটেই শত চ্যানেলে হাজারো গীত, সাথে ফ্রিতে নৃত্য। গান এখন হেডফোনের তার হয়ে খুব গোপনে মস্তিষ্কে আমোদ তৈরি করছে। কড়তালিরা সব হাত গুটিয়ে রিমোটের বাটন পরিবর্তনে ব্যস্ত। আর আমি মাঘের শীতে জানালা খুলে কান পেতে রই আজও। দুরে কোথাও, দূরে কোথাও কি বাজছে চেনা কোনো গানের সুর? মাঘের শেষে কেউ কি রাত করে বাড়ি ফিরছেন পুরোনো কোনো গান নতুন সুরে গাইতে গাইতে …..

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View