চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মহামারীতেও মসজিদে জমায়েত?

আবুধাবির শারজাহর একটি মসজিদে গত ১৭ মার্চ ফজরের আজানের শেষ অংশে মুয়াজ্জিন আরো একটি লাইন যোগ করেন, “সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম”। ইংরেজিতে ‘প্রে এট হোম’, বাংলায় ‘বাড়িতে নামাজ পড়ুন’। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সকল মসজিদে ওই দিন থেকে আজান হচ্ছে উল্লেখিত সংযুক্তিসহ।

দেশটির ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকারী জেনারেল অথরিটি অফ ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড এন্ডোমেন্টস (জিএআইএএ) এর বরাত দিয়ে খালিজ টাইমস জানিয়েছে, এখন আজান হচ্ছে কেবল নামাজের সময়টা জানানোর জন্য। সারাদেশের সকল মসজিদের দরজা বন্ধ থাকবে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

আজানে সামান্য পরিবর্তন বা সংযুক্তির ইতিহাস ইসলাম ধর্মে একেবারে নতুন নয়। বোখারি ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) একবার প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে ফজরের আজানের শেষ লাইনে যুক্ত করে দিয়েছিলেন ‘সাল্লু ফি হালিকুম’। অর্থ হচ্ছে, যার যার অবস্থানে থেকে নামাজ পড়ুন। সেদিন এই সাহাবার মনে হয়েছিল, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় মসজিদে যাতায়াত কারো কারো জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীকালে তিনি হযরত মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (স.) এর কাছ থেকে এর অনুমোদনও নিয়েছিলেন। আরেক সাহাবা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) একইভাবে তায়েফে তার মুয়াজ্জিনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ‘হাইয়া আলাসসালাহ’ অর্থ্যাৎ নামাজের জন্য আসুন এর স্থলে তিনি যেন নিজের ঘরে নামাজ পড়ুন শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করেন। যারা ইসলাম ধর্মের বিধানাবলির ন্যুনতম চর্চা করেন; তাদের এই ইতিহাস অজানা থাকার কথা নয়।

বিশ্বব্যাপি করোনাভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় নিষিদ্ধ করেছে। এমনকি এবছর পবিত্র হজ্ব বাতিলের চিন্তাও করছে সৌদি আরব। সেটা জানতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। গণজমায়েত থেকে বিভিন্ন দেশে কোভিড- ১৯ ছড়িয়ে পড়ার পরই অদৃশ্য এই মানব বিধ্বংসী ভাইরাসের ঝুকিতে থাকা অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোও এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীর জানা হয়ে গেছে সংবাদ মাধ্যমের সৌজন্যে।

ইসলামি চিন্তাবিদরা জানেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি বা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে জামাতে নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকা ইসলামে অনুমোদিত। কোভিড-১৯ ভাইরাসটির সংক্রমণ মানুষ থেকে মানুষে হয়। আর ইসলাম একজনের কারণে অন্যের ক্ষতিসাধন অনুমোদন করে না। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘লা জারারা ওয়ালা জিরারা’। এমন কিছু করা যাবে না; যাতে অন্যের ক্ষতি হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামের এই বিধান উপেক্ষা করে আত্মঘাতী এবং মানব বিধ্বংসী গণজমায়েত কি ন্যায়সংগত?

যেসব দেশে ব্যাপক হারে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে তার মধ্যে ইতালি এবং কোরিয়ায় উপাসনালয় থেকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের প্রমাণ আছে। ইরান, ভারত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় মসজিদ থেকে সংক্রমিত হয়েছেন অনেক অনেক মানুষ। ঢাকার মিরপুরের টোলারবাগ মসজিদ থেকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের খবরও বেরিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া করোনার ঝুঁকিতে থাকা প্রায় সব দেশই মসজিদ, মন্দির, গীর্জাসহ উপাসনালয়ে গণজমায়েত নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ কেবল ব্যতিক্রম, কেন?

বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাস সংক্রমণের মুখে গত ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। লক ডাউন না করে ছুটি ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক আছে। আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি বাড়ানোর কথাও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সাথে চলছে অঘোষিত লকডাউন। সরকারী- বেসরকারী অফিস, আদালত, কল-কারখানা, বিপনিবিতান, পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল- রেস্তোরাঁ বন্ধ। থেমে গেছে অর্থনীতির সকল চালিকা শক্তি। নিম্ন আয়ের দরিদ্র মানুষগুলো বেকার। দিন কাটাচ্ছে খেয়ে না খেয়ে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। বন্ধ রয়েছে উৎপাদনমুখি শিল্প। বিপর্যস্ত অবস্থায় অর্থনীতি। সরকার ও জনগণের সকল ত্যাগই জীবন বাঁচাতে, শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখতে যাতে করোনার আগ্রাসি ছোবল প্রতিরোধ করা যায়। কিন্তু গণজমায়েতের অন্যতম আরেক উপলক্ষ্য মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া এই প্রতিরোধ যুদ্ধে এখন অন্যতম অন্তরায়। এ বাধা দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়। সরকার সিদ্ধান্তহীন। ফলে অন্যান্য সকল পদক্ষেপকে ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’র মত কি লাগছে না?

বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশন জনগণকে বাসায় সুন্নত নামাজ শেষ করে কেবল ফরজ নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়ার অনুরোধ করেছে অনেকটা ‘জলে নামবো তবুও বেনি ভেজাবো না’ এর মতন। অনেকেই বলছেন, হাস্যকর সিদ্ধান্ত এটি। এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও এমন তথ্যের স্বপক্ষে প্রমাণ মিলেনি যে দীর্ঘ সময়ের গণজমায়েতে কোভিড- ১৯ ছড়ায় আর সময়ের গণজমায়েতে ছড়ায় না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, মানুষের সংস্পর্শে ছড়ায়। তাই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাটাই জরুরী। নামাজের জামাতে গায়ে গা লাগানো হয়, মিলানো হয় হাঁটুতে হাঁটু। এমন সংস্পর্শ করোনা ভাইরাস ছড়াতে খুবই সহায়ক সেটাতো প্রমাণিত সত্য। প্রশ্ন জাগে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং সরকার জামাতের জন্য মসজিদে যাতায়াত কিছুদিনের জন্য স্থগিত করতে ভয় পাচ্ছে? জনগণের জীবন বাঁচাতে অপরিহার্য় কাজটি করতে কাকে ভয় পাচ্ছে? কিসের ভয় এবং কেন? সরকার সংশ্লিষ্টরা কি ভাবছেন, সারাদেশে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হলে আলেম সমাজ নিজেরাই ভয় পাবে? ফতোয়া দেবে মসজিদে না যাওয়ার জন্য?

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো: আব্দুল্লাহ কিছুদিন আগে সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, বিষয়টি বাংলাদেশে বেশি স্পর্শকাতর হওয়ায় বয়স্ক এবং অসুস্থদের মসজিদে না যাওয়ার অনুরোধ করে কৌশলে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আর গত শুক্রবার জুম্মার নামাজে ব্যাপক জনসমাগমের পর তিনি বিবিসিকে বলেছেন, “জামাতে নামাজ বন্ধ রাখার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। আমরা একটা সিদ্ধান্তের একেবারে কাছাকাছি এসে গেছি। সকলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এবিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।”

প্রায় এক সপ্তাহ, প্রচণ্ড জরুরী এই সিদ্ধান্তের কোন খবর এখনো প্রকাশ পায়নি। মন্ত্রীর বক্তব্যে ধরে নেয়া যায় রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয় ভেবে আওয়ামী লীগ সরকার কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না! তারা আলেম সমাজের কাছ থেকে ঐক্যবদ্ধ একটা সিদ্ধান্ত চায়। ভিন্ন ভিন্ন মত ও পথে বিভক্ত আলেম সমাজ মানুষের জীবন বাঁচাতে এবার ঐক্যবদ্ধ হবেন, আশা করা যায় কি? ইতোমধ্যে কোনো কোনো আলেম ওলামা মসজিদে নামাজ বন্ধ হলে জিহাদের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন।

সময় দ্রুত যাচ্ছে। সামনের দিনগুলো কতটা ভয়াবহ হবে কারো জানা নেই। বিদেশ থেকে আসা, ছুটিতে গাদাগাদি করে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া লাখ লাখ মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশ মানেননি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে সারাদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সামাজিকতা করছেন, যাচ্ছেন মসজিদে। তাদের কত শতাংশ আক্রান্ত বা তারা কত মানুষকে ইতিমধ্যে সংক্রমিত করেছেন তাও অজানা রয়ে গেছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে লাখ লাখ মানুষ কল করেছেন আইইডিসিআরের হটলাইনে। টেস্টের জন্য নমুনা দিতে পারা ভাগ্যবান মানুষের সংখ্যা হাতগোনা কয়েকজন। তবুও সাধারণ সর্দি-জ্বরে মৃত্যুর খবর আসছে দেশজুড়ে প্রতিদিন । এই অবস্থায় নামাজের জামাতে দাঁড়ানো কে করোনায় সংক্রমিত আর কে সংক্রমিত নন তা কেবল সৃস্টিকর্তাই জানবেন। আক্রান্ত হওয়ার বেশ কিছুদিন পর উপসর্গ দেখা যায়। তার আগে সংক্রমিত ব্যক্তিটি না জেনে কোভিড- ১৯ এর সংক্রামক হয়ে যান বলে ভয়টা বেশী। সে দিকটি বিবেচনায় নিয়ে আগামী ১৫ দিন বাংলাদেশের জন্য খুবই ঝুকিপূর্ণ মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিত্সকরা।

সংশ্লিষ্টদের জানা আছে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা খাতের সক্ষমতা আর অক্ষমতা কতটুকু। সরকারের অজানা নেই তাদের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যকার সমন্বয়হীনতা ও নির্ভুল পরিকল্পনার অভাবের খবরও। এ অবস্থায় প্রতিরোধই প্রকমাত্র পথ। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের প্রধান শর্ত গণজমায়েত বন্ধ করা সেটি যেখানেই হোক। লক ডাউনের সময়ে বড় ধরনের গণজমায়েতের একমাত্র উপলক্ষ্য এখন আছে মসজিদে, আগামী শুক্রবারে। তার আগেই মসজিদের দরজা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ভীষণ জরুরী। এক্ষেত্রে যত দেরি হচ্ছে, তত বেশী মূল্য দেয়ার আশংকা বাড়ছে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)