চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মহামারীকালে কানাডায় যাপিত জীবন

পৃথিবীব্যাপি মহামারীর আঁচে ভীত সন্ত্রস্ত বিশ্বের প্রতিটি দেশের সরকার এবং জনগণ করোনাভাইরাসের আহ্লাদিত আগ্রাসনে মৃত্যুর ডামাডোলে মানুষ হারিয়ে ফেলেছে নিজস্ব গতির ছন্দ, কেবলমাত্র অনুশাসনের ছন্দানুবর্তীতে গৃহবন্দী জীবনযাপন। অপেক্ষায় মানুষ; কবে মুক্তি মিলবে অদৃশ্য এক ভাইরাসের আগ্রাসন থেকে, কখন অনুবীক্ষণ যন্ত্র এর হার মানা দেখবে, কবে এর প্রতিষেধক তৈরি করতে সফল হবে মানুষ।

দেশ হিসাবে কানাডাও এর ব্যতিক্রম না। প্রাণপণে সরকার প্রধানরা সমস্যা প্রতিহত করায় ব্যস্ত, প্রতিদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াচ্ছে বার্তা নিয়ে, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীসভার কেউ বাদ থাকছেন না। সমস্যা এমন একটি বিষয়, কান টানলে কেবল মাথাই নয় পুরো শরীরে ঝাঁকুনির লাগায়। প্রতিটি প্রদেশের প্রিমিয়ার বক্তব্য রাখছেপ্রতিদিন, আপডেট করছে হাসপাতালগুলোর বর্তমান অবস্থা, সরকারি আর্থিক সহায়তা, সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং জনসাধারণের প্রতি ঘরে থাকার আকুল আহ্বান। তারপরেও কিছু কথা থেকেই যায়, সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে জেনে নিচ্ছে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে কেন সময় লাগছে, উত্তর দিচ্ছে সরকার প্রধানরা। যেমন; যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে যারা এখনো যেসব ট্রাক ড্রাইভাররা প্রয়োজনীয় দ্রব্যের আনা নেওয়া করছে, অধিকাংশ স্থান (রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড স্টোরস, বিপনিবিতান) তাদের ওয়াশরুম ব্যবহারে সমস্যা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই এর উত্তর দিয়েছে, গৃহহীনদের থাকার জায়গা নির্দিষ্টকরণ কবে থেকে শুরু হবে এবং নিরাপদ দূরত্ব রাখতে হবে সেই বিষয়ে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সরকার প্রধানরাই কি কি সুবিধা, অসুবিধা, ঘাটতি, পর্যাপ্ততা আছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সেগুলোও তুলে ধরছে। তৎপর সকলেই, ঘরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে বিরোধী দলগুলোও, সমাজকর্মীরাও মাএ নেমেছে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে। দেশে প্রদেশে জরুরী অবস্থা যখন জারি হয়েছে তখন দায়িত্ব সকলের। ডেপুটি পিএম ক্রিস্টিয়া ফ্রীল্যাণ্ড কানাডার এ্যাবঅরিজিন্যাল কমিউনিটিকে সাহায্য করার জন্যে কিউবান চিকিৎসকদেরকে আহ্বানের জন্যে পিএমকে অনুরোধ জানিয়েছে। কোন সামর্থ্যই যেন এখন যথেষ্ট নয়।

বিজ্ঞাপন

আজ পর্যন্ত কানাডায় করোনাভাইরাসে সনাক্ত রুগীর সংখ্যা ৭,৪৭৪ জন, প্রাণত্যাগ করেছেন ৯২ জন, যা কিনা মোট আক্রান্তের ৮%, সুস্থ হয়েছেন ১,১১৪ জন। এখনো পর্যন্ত চিকিৎসাধীন আছে ৬,২৬৮জন। দেশের নতুন তৈরি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মধ্য বয়সী বেশিমাত্রায় আক্রান্ত হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখানো মোট আক্রান্তদের মধ্যে, ২০-২৯ বয়স্ক ১২%, ৩০ থেকে ৩৯ বয়স্ক ১৭%, ৫০-৫৯ বয়স্ক ২০%, ৬০-৬৯ বয়স্ক ১৬%, ৭০-৭৯ বয়স্ক ৯%, ৮০-উর্ধ্বে বয়স্ক ৫%। কানাডার চিফ পাবলিক হেলথ অফিসার ডাঃ থেরেসা ট্যাম জানিয়েছেন যে এই পরিসংখ্যানের এক চতুর্থাংশের চরিত্র বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে বয়স, লিঙ্গ, বসবাসের অবস্থান, জীবনযাত্রা, পেশার ভিত্তিতে। ডা. ট্যাম প্রকাশিত ডেমোগ্রাফিকসটি দেওয়া হলো।

জনগণের সুবিধার্থে চালু হয়েছে ফোন এবং অনলাইন এসেসমেন্ট প্রক্রিয়া। পাবলিক হেল্থের নম্বরে ফোন করলে কর্তব্যরত নার্সের সাথে শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলাপ করা যায়, নিশ্চিত হওয়া কেউ আক্রান্ত কিনা, পরবর্তী দায়িত্ব সম্পর্কে নার্স জানিয়ে দেয়। অনলাইন এসেসমেন্টে জানা যায় কোন উপসর্গগুলো করোনাভাইরাসের আর সেগুলো সাধারণ ফ্লু থেকে কি করে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যাবে। কারণ, শীতপ্রধান দেশ হিসাবে কানাডায় এখন বসন্ত এবং ফ্লু কাল। এখনো বাইরে যথেষ্ট ঠাণ্ডার প্রকোপ। জরুরী ভিত্তিতে এসেসমেন্ট সেন্টার খোলা হয়েছে বিভিন্ন বড় শহরগুলোতে। এইভাবে জনসাধারণের জীবননাশের ভীতিও প্রশমিত হচ্ছে। তবুও থেমে নেই ভাইরাসের প্রকোপ, মৃত্যু আবার অন্যদিকে সুস্থ হওয়ার জয়যাত্রা।

বিজ্ঞাপন

টরন্টোর নর্থ ইয়োর্ক নামের বড় একটি হাসপাতালের কাছাকাছি বাস করার কারণে একমাত্র এ্যাম্বুলেন্স ছাড়া আর কোন যানবাহনের শব্দ আবাসিক এলাকা থেকে পাই না। বিচ্ছিন্নভাবে উড়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে কয়েকটি প্লেন, এরা নিয়ে আসতে চলেছে বিভিন্নদেশে কানাডার আটকে পড়া বাসিন্দাদেরকে। সরকার জানিয়েছে ওরা ফিরে এলে যেন আরো সাবধানতা অবলম্বন করে জনগণ, ওরাও যাবে বাধ্যতামূলক চৌদ্দ দিনের কোয়ারিন্টাইনে।

হেল্থ প্রফেশনালস আর বয়স্কদের জন্যে অনলাইন বাজার এবং খাবার সার্ভিস চালু হয়েছে। আমি কোন দলেই পড়ি না, ঘর থেকে কাজ করছি, সরকার ঘোষিত ৭৫% এমপ্লয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্স নিতে হচ্ছে না। দুই সপ্তাহে একবার বাজারে যাচ্ছি, প্রতিটি জিনিস জীবানুনাশক দিয়ে পরিস্কার করেও সেগুলো গার্বেজে ফেলে দিচ্ছি। কাপড় ফেলে দিচ্ছি ওয়াশারে আর আমি লম্বা সময়ের শাওয়ারে চলে যাচ্ছি। সরকারের নিয়মানুযায়ী কেউ মাস্ক ব্যবহার করছে না, যদি না কেউ কানাডার বাইরের কোন দেশ থেকে দুসপ্তাহের মধ্যে ফিরেছে, কোন করোভাইরাস রুগীর সংস্পর্শে এসেছে অথবা রোগের কোন লক্ষণ তার শরীরে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া মাস্কের ব্যবহার বরং বিপদ্দজনক।

সঠিক মাস্ক সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা সেটা দেখা প্রয়োজন। তাছাড়া মাস্ক জীবানুমুক্ত না করলে মাস্ক ভাইরাসের বাহক হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী হেল্থ কানাডা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি দ্রব্য আর ঘর জীবানুমুক্ত করার এক যজ্ঞে নেমেছি এযাবত। তবুও মানুষ হিসাবে সকল সুস্থ মানুষের কর্তব্যের আওতায় পড়ে। আশেপাশের বয়স্কদেরকে জিজ্ঞাসা করে যায় কিছু লাগবে কিনা। জানালা দিয়ে যোগাযোগ রাখি, অনলাইনেও থাকি। প্রবাসী জীবনের ব্যস্ততা যে কত মধুর তা এবার অনুভব করছি। কাজের অতিরিক্ততা নিয়ে আর কখনো অনুযোগ করবো না, ঘরে বন্দী থাকা এক সাজা। তবুও দূরত্ব রেখে হাঁটতে যাই অল্প সময়ের জন্যে ঘরের উঠোনে।

সরকার প্রধানদের সাথে সাথে কানাডার প্রতিটি জনগণের হেল্থ সার্ভিসের প্রতিটি কর্মীকে ধন্যবাদ জানানো উচিৎ কারণ কানাডায়ও ওরা পর্যাপ্ত পিপিই ছাড়া চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছে। আমিও ফ্রন্ট লাইন সমাজকর্মী, বিভিন্নভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ করে চলেছি, কাউন্সেলর হিসাবে কিছু বাড়তি দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, মাঝরাতেও অনেক কল আসছে, তবুও মনেহয় এটাও সামান্য, মানুষের প্রয়োজন অনেক। এই বিপদের সাথে যুদ্ধ শেষ হলে আমরা যুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধাবস্থার মুখোমুখি হবো মানসিক, শারীরিক, আর্থিক এবং সামাজিকভাবে। তার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি সব পেশার মানুষের রাখতে হবে।

সুস্থ থাকুক আমাদের পৃথিবী মা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)