চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মহাকালের মহানায়িকা সুচিত্রার জন্মদিন

অনলাইন ডেস্ক : দুই বাংলার প্রখ্যাত অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের জন্মদিন আজ। ১৯৩১ সালের বাংলাদেশের পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার হেমসাগর লেনে করুণাময় দাশগুপ্ত আর ইন্দিরা দাশগুপ্তের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় ফুটফুটে মেয়ে রমা দাশগুপ্ত।  পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় কন্যা সন্তান হলেও রমার জন্মে খুশিতে  পুরো এলাকার মানুষকে মিষ্টিমুখ করিয়েছিলেন  স্কুল শিক্ষক করুণাময় ।

রমার  শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে  পাবনায়। শিক্ষানুরাগী পরিবারের মেয়ে রমা পাবনার মহাখালী পাঠশালার পাঠ শেষ করে পা দেন পাবনা গার্লস স্কুলে, দশম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানেই।

এরপর ১৯৪৭ এর কথা  দেশভাগ আর দাঙ্গার শিকার হয়ে  রমার পরিবার পাড়ি জমায় কলকাতায়। ওই বছরেই কলকাতায় থিতু হওয়া ঢাকার আরেক হিন্দু পরিবারের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় রমার। নামের শেষে স্বামীর উপাধি যোগ করে তিনি হয়ে যান রমা সেন।

বিয়ের পর দিবানাথের মামা বিমল রায় খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা। ভাগ্নেবধূ রমাকে তিনিই নিয়ে আসেন রূপালী পর্দায়। রতœ চিনতে তিনি কোনো ভুল করেননি, তার প্রমাণ পরের ২৫ বছর ভারতবর্ষের মানুষ পেয়েছে। শ্বশুরের আগ্রহ আর স্বামীর উৎসাহে রূপালী জগতে নাম লেখান রমা হয়ে যান সুচিত্রা সেন।

Advertisement

সুচিত্রা সেনের চলচ্চিত্রে শুরুটা ১৯৫২ সালে শেষ কোথায়’ ছবিটি যদিও চলচ্চিত্রটি আলোর মুখ  দেখেনি। পরের বছর উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটিবদ্ধ চলচ্চিত্র  সাড়ে চুয়াত্তর’ সুপারহিট।

১৯৫৫ সালে বিমল রায়ের পরিচালনায় হিন্দি  দেবদাস’ ছবিতে দীলিপ কুমারের বিপরীতে অভিনয়ের সুযোগ পান সুচিত্রা। পার্বতী’ চরিত্রে তার অভিনয়ে বিমোহিত হয় দর্শক। এ ছবি তাঁকে এনে দিয়েছিল  জাতীয় পুরস্কার।

এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সুচিত্রাকে। একে একে অভিনয় করেন শাপমোচন, সাগরিকা, পথে হলো দেরি, দীপ জ্বেলে যাই, সবার উপরে, সাত পাকে বাঁধা, দত্তা, গৃহদাহ, রাজলক্ষ্মী-শ্রীকান্তর মতো সুপারহিট সব ছবি। ক্যারিয়ারে এসে হিন্দি চলচ্চিত্র আঁধিতে রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান সুচিত্রা। ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৬৩ সালে মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভালে’সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান সুচিত্রা। ভারতীয় কোনো অভিনেত্রীর জন্য সেটিই ছিল বড় মাপের প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তিনি ১৯৭২ সালে  ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কার পেয়েছিলেন। এপর ২০১২ সালে পান পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ পুরস্কার বঙ্গবিভূষণ পেয়েছেন সুচিত্রা। দুই যুগের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে ৬০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন  তিনি।

হঠাৎ করেই বাংলা সুপারহিট নায়িকা ঠিক কোন অভিমানে ১৯৭৮ থেকে ২০১৪-প্রায় তিনটি যুগে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিলেন। সুচিত্রা নিজেকে আড়াল করে  রাখা হয়তো অজানাই থেকে যাবে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা অগণিত ভক্তদের। এ নিয়ে জল্পনা যতোই হোক অভিনয় জীবনের পুরোটা সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা মানুষটি ছিলেন তার নিজের এবং পরের দুটি প্রজন্মের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু নিজের পারিবারিক ও অন্তরালের জীবন নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা শুধু তিনি নন  তাঁর মেয়ে চিত্রনায়িকা মুনমুন সেন, তার দুই নাতনি নায়িকা রিয়া ও রাইমা সেনও কখনো মুখ খোলেননি এ ব্যাপারে। একান্ত ব্যক্তিগত চিকিৎসক, হাসপাতালের নার্স, পত্রিকার সাংবাদিক কেউ তার অন্তরালে থাকা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি কখনো। শ্বাসযন্ত্রের অবস্থার অবনতি হলে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর কলকাতার বেসরকারি হাসপাতাল বেলভিউ’এ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল মহানায়িকাকে।  

শরীরের অবনতি ঘটলে ১৭ জানুয়ারি (২০১৪)  শুক্রবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে  সব আশার আলো নিভিয়ে  চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মহাকালের মহানায়িকা  সুচিত্রা।  আর সেই সঙ্গে ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের এক  সোনালী যুগের অবসান ঘটে। তবে তার অভিনয় তাকে বাঁচিয়ে রাখবে প্রজন্মেও পর প্রজন্মের কাছে। সুচিত্রা তুমি যেখানে থাকো ভালো থাকো। শুভ জন্মদিন সুচিত্রা’।