চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মনোনয়ন বঞ্চিতদের সমর্থকরা কাকে ভোট দেবে?

দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিতদের সমর্থকরা মানব বন্ধন, সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে চলেছে। বিক্ষোভ হচ্ছে নেত্রকোনায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে, শেরপুরের নকলা নালিতাবাড়ি সহ বাংলাদেশের অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায়৷ নেত্রকোনার কলমাকান্দা দূর্গাপুর আসনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভকারীরা বলছে বহিরাগত ব্যক্তির মনোনয়ন মানিনা।এখানে দলীয় মনোনয়ন না পেয়েও পরিবর্তিত মনোনয়ন প্রাপ্তির আশায় মনোনয়ন দাখিল করেছেন আরও দুজন আওয়ামী লীগ নেতা।
একজন সাবেক এমপি ও ছাত্রনেতা মোশতাক আহমেদ রুহী ও অপরজন এরশাদ উদ্দীন মিন্টু। নেত্রকোনা-৪ মোহনগঞ্জ, মদন,খালিয়াজুরি আসনেও মনোনয়ন বঞ্চিত সাবেক ছাত্রনেতা নব্বইয়ের গণআন্দোলনের রূপকার শফি আহমেদের অনুসারীরা মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে চলেছে৷
২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় ওয়ান ইলেভেনের মাইনাস টু রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। তারপর ওয়ান ইলেভেনের পরে দলীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি এলেও তিনি মূল্যায়িত না হয়ে মনোনয়ন বঞ্চিত হলেন।
তিনি তখন অনেকের মত বিদ্রোহী প্রার্থী না হয়ে আশায় বুক বেঁধে রইলেন পরের বারে মূল্যায়িত হবেন বলে। এলো ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন৷ শফি আহমেদ সেবারেও মনোনয়ন বঞ্চিত হলেন। কিন্তু তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে  দাঁড়ালেন না দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। আর তখন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গেলেন নবম সংসদের নির্বাচিত এমপি রেবেকা মমিন। এবার এলো একাদশ সংসদ নির্বাচন শফী আহমেদের আশা ছিল এবার তিনি মনোনয়ন পাবেন৷ কিন্তু না এবারও পেলেন না। অথচ জনমত জরিপে তিনিই এগিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।  তবে এসব জরিপ কেন করা হল কী উদ্দেশ্যে করা হল? এলাকার জনসাধারন শফি আহমেদের বারবার এই মনোনয়ন বঞ্চনার রহস্য উদঘাটন করতে পারছেনা। তাদের প্রশ্ন,কী সে রহস্য?
মেহেরপুর-১  (গাংনী) আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আবার মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তিকেই নৌকা প্রতীক বহাল রাখার দাবিতেও মিছিল করেছে একদল।৩০ নভেম্বর সন্ধ্যায় পৌর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। গাংনী থানা রোডে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সমুখ হতে শুরু করে মিছিলটি গাংনী শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
মিছিলে অংশ নেওয়া নেতা কর্মীরা বলেন, মনোনয়ন প্রাপ্ত সাহিদুজ্জামান খোকন গাংনী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও দলীয় কোন কাজে সম্পৃক্ত হন নাই৷ তিনি একজন জনবিচ্ছিন্ন নেতা। তাকে নৌকার প্রার্থীতা দেওয়া হলে এ আসনে নৌকার ভরাডুবি হতে বাধ্য৷

Advertisement

এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারাও তাকে যুদ্ধাপরাধীর সন্তান দাবি করে বিক্ষোভ করে চলেছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সাহিদুল ইসলাম খোকনের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতেও অনশনও করে চলেছে।এই দাবিতে গণঅনশনও করেছে একদল। মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গাংনী শহর৷ তারা জয় বাংলা,জয় বঙ্গবন্ধু বলে শ্লোগানে শ্লোগানে বলছে, রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়। তারা এ মনোনয়ন প্রদানকে অন্যায় বলছে। তারা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল খালেককে মনোনয়ন প্রদানের দাবি জানাচ্ছে।
এক্ষেত্রে এই আসনে ১৪ দলীয় জোটের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী ও বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমানে ১৪ দলীয় জোটের শরীক সংগঠন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য নূর আহমেদ বকুল। তিনি ক্লিন ইমেজের পরিচ্ছন্ন, যোগ্য ও জনবান্ধব রাজনৈতিক হিসাবে এলাকায় খুবই জনপ্রিয়৷ তাকে মনোনয়ন দিলে নৌকার বিজয় হবে ও গ্রুপিংয়ের অবসান হবে বলে এলাকাবাসীর ধারণা। কারণ আব্দুল খালেককে মনোনয়ন দিলে সাহিদুল ইসলাম খোকনের অনুসারীরা বিরোধিতা করবে।
কিন্তু সবার মনেই প্রশ্ন, মনোনয়ন বদল হবে কি? বিরোধের অবসান হবে কি? এই বিরোধের নিস্পত্তি না হলে এ আসনে বিএনপি জামাত জোটের জেতার সম্ভাবনা প্রবল।                                            মনোনয়ন নিয়ে দেশ জুড়ে চলছে বিক্ষোভ, কান্না। কাঁদছেন প্রার্থীরা। কাঁদছেন তাদের অনুসারীরা। আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, বদিউজ্জামান বাদশা, ও খালেদের অনুসারীদের কান্না সংবাদপত্রের হেডলাইন হয়েছে। মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগের  নেতা গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ এলাকায় গেলে কর্মী-সমর্থকদের ঢল নামে। তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার সমর্থকেরা। এ সময় তিনি নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাকে জড়িয়ে ধরে মহাসড়কেই শুরু হয় কান্নার মাতম।
কান্নার মিছিলে মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জের দক্ষিণ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়৷ নেতাকর্মীদের সাথে কাঁদতে কাঁদতে উপজেলা পরিষদের সামনে যান আবুল কালাম আজাদ। এ সময় নেতাকর্মীরা কালাম ভাই হারেনি, গোবিন্দগঞ্জের মাটি কালাম ভাইয়ের ঘাঁটি, কালাম ভাই আছেন, কালাম ভাই থাকবেন’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আবুল কালাম আজাদ বলেন ‘তার জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। তারপরও নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন।’তার কথা সত্য হলে জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে মনোনয়ন দেয়া হলনা? কেন একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিদ্রোহীতে রূপান্তর করা হলো? মনোনয়ন বঞ্চিত  আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক তার আসন থেকে মনোনয়ন পাওয়া সাদেক খানকে দেয়া এক সম্বর্ধনায় অংশ নিয়েও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
একই অবস্থা সৃষ্টি হয় শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত কৃষক লীগের সাবেক সহসভাপতি বদিউজ্জামান বাদশার আসন ও  শরীয়তপুর-২ আসনে৷  সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা মীর মোশারফ হোসেনকে ঘিরেও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সর্ব স্তরের নেতাকর্মীরা।  ঢাকা  হতে  বেলকুচিতে ফেরার পথে কয়েক শত নেতাকর্মী মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা করে তাকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান৷ সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে মীর মোশারফ হোসেন দলের কান্ডারি হবেন এমনটাই আশা ছিল সংসদীয় এলাকার সর্বস্তরের মানুষের। তবে হঠাৎ করেই এ আশা নিরাশায় পরিনত করে তরুন শিল্পপতি আব্দুল মোমিন মন্ডল নৌকার মনোনয়ন পেয়ে যান৷ মোশারফ হোসেনের রাজনৈতিক যোগ্যতা ও জনমত হেরে গেল অর্থশালী শিল্পপতির কাছে৷এক্ষেত্রে বিভিন্ন জরিপকারী কর্তৃপক্ষের কি বক্তব্য হতে পারে? 
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও মহাজোটেও মনোনয়নকে ঘিরে ক্ষোভের কথা শোনা যাচ্ছে৷ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪ দলের শরিক দলগুলোকে ১৫টি আসন দিলেও এবার দিয়েছে ১৩টি আসন। এ নিয়ে আদর্শিক ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যেও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। ওয়ার্কার্স পার্টির ক্ষোভ তারা মাশরাফির জন্য একটি আসন ছাড় দিল জোটের দিক বিবেচনা করে৷ কিন্তু জোট সম্ভাবনা, জনমত ও সুযোগ থাকা স্বত্তেও মেহেরপুর গাংনীর নূর আহমেদ বকুল কে মনোনয়ন দেয়নি৷ অন্যদিকে আওয়ামী লীগ এবার মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টিকে ৪০টির বেশি আসন ছাড়তে নারাজ। কিন্তু এতে অখুশি জাপা৷  ২ শ’এর মতো আসনে তারা প্রার্থী দিয়ে রেখেছে।
এখনো চলছে দর-কষাকষি। জোট-মহাজোটের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও মিছিল করছে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অনুসারীরা।সম্প্রতি ফটিক ছড়িতে তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজ ভান্ডারীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ৷তারা শরীক দলের মনোনয়ন প্রাপ্তিকে সমর্থন করতে পারছেনা৷ তাদের দাবি আওয়ামী লীগের এবিএম পিয়ারুল ইসলামকে মনোনয়ন দিতে হবে৷ তারা শেখ হাসিনার নামেও আওয়ামী লীগের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে আবার শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত মানছেনা৷
রাজনৈতিক প্রয়োজনে যে জোট শরীকদের কিছু আসন ছাড় দেয়া প্রয়োজন এ চিন্তাকে কোন গুরুত্বই দিচ্ছেনা তারা৷বৃহৎ স্বার্থকে কেন এড়িয়ে যাচ্ছে সবাই? মনোনয়নের আগে গোয়েন্দা জরিপ,তৃণমূল জরিপ,বিশেষ জরিপ ও জনমত জরিপ কত কিছুইনা শোনা গেল৷ এসব জরিপের কি আদৌ কোন মূল্যায়ন হয়েছে কোথাও? হলে মনোনয়নকে ঘিরে কেন এত ক্ষোভের আগুন? কেন কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মানছেনা তৃণমূল ও তৃণমূলের দাবি কে মানছেনা কেন্দ্র? ৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই আওয়ামী লীগকে আসন বণ্টনের সমস্যার সমাধান করতে হবে৷ আন্দোলনের মাধ্যমে অনেক জায়গায় বদলও হচ্ছে৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো জরিপ কেন উপেক্ষিত হল? কেন বিতর্কিত ও গণ বিচ্ছিন্ন এমপিদের বহাল রাখা হল? আগামী ৯ ডিসেম্বরের আগেই নির্বাচন কমিশনকে মনোনয়নের তালিকা চূড়ান্ত করে জানাতে হবে, যাতে তারা সে অনুযায়ী প্রতীক বরাদ্ধ দিতে পারে।  তবে এবার সিদ্ধান্তের বাইরে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কোন সুযোগ নেই।  কেন্দ্র থেকে বলার পরে অনেকেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতেও শুরু করেছে৷ তাই দলের মনোনয়ন বঞ্চিতদের অসন্তোষ খুব শিগগিরই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করছেন অনেকে।কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী হয়ে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়লে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি আরও বলেন, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগে নিশ্চিত করে বলা যাবে না, কে বিদ্রোহী প্রার্থী। তবে কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী হলে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোথাও কোথাও বিদ্রোহটা ন্যায় সঙ্গত হচ্ছে কিনা? যেসব জায়গায় পরিবর্তন হল সেসব জায়গার বিদ্রোহকে অবশ্যই ন্যায় সঙ্গত ও ন্যায্য মনে করেছে মনোনয়ন প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ,তাই নয় কি?আরও আরও  জায়গায় ন্যায় সঙ্গত বিদ্রোহের দ্রুত মূল্যায়ন হবে কি?এক্ষেত্রে বহিস্কার মানে শুধু মনোনয়ন প্রার্থীর এক ব্যক্তি নয়।
তার সাথে জড়িয়ে আছে তার অনুসারীরাও। একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে বিদ্রোহী বলে দূরে ঠেলে দিলে নির্বাচনে কি এর প্রভাব পড়বেনা? সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা তা ভাববেন কি?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)