চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মঞ্চনাটক আন্দোলনে রামেন্দু মজুমদারের অবদান অবিস্মরণীয়

খুব মনে পড়ে নিউইয়র্ক বইমেলার এক স্মৃতি। ২০১৭ সাল। মেলার উদ্বোধক নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। এক পরোপকারী, আত্মত্যাগী, সাংগঠনিক, মানবিক ব্যক্তিত্ব তিনি। নাট্যজগতে সকলের প্রিয় রামেন্দুদা বা দাদা। আমরা বইমেলা শেষে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে হাডসন নদীতে এক নৌভ্রমণে গেলাম। চমৎকার আয়োজন। দোতলার ছাদের ডেকে নিউইয়র্কের ঝকমকে রোদের খেলা। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আসন আলো করে বসেছেন। আমরা তাকে ঘিরে বসেছি। বিয়ার পান করছি। আর কৌতুকময় আড্ডা। নিচে বসে আছেন রামেন্দু। নদীর দিকে তাকিয়ে আছেন উদাস দৃষ্টিতে। পাশে নাট্যকর্মী বাবুল বিশ্বাস। দাদার প্রিয় শিষ্য শিরীন বকুল। আমি এসে যোগ দিলাম দাদার সাথে। দাদা তার জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন। বাবুল বিশ্বাস তাকে ম্যাসেজ করে দিচ্ছিলেন। আমিও দাদার হাত দুটো নিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাসাজ দিতে লাগলাম। হাডসন নদীতে তখন শীতল বাতাস। দূরে… হাত তোলা সেই ভাস্কর্য।

রামেন্দুদার সঙ্গে একদিন টাইমস্কোয়ারে দেখা হলো। আমি আর মাযহার ছিলাম। টাইমস্কোয়ারে লক্ষ লক্ষ পর্যটকের ভিড়। সেইখানে আমরা দাদার সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। মাযহার বলল, দাদার সঙ্গে ছবি তুলে রাখি একটা। দাদার সাথে ছিলেন তার ছোটবোন। উনি নিউইয়র্কেই বসবাস করেন। রামেন্দু মজুমদার বহুমাত্রিক চরিত্র। বেতার টেলিভিশনের খ্যাতিমান সংবাদ পাঠক। নাট্যশিল্পী। মঞ্চেও অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। দাদা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের সম্পাদনা করেছেন। দাদার বিস্ময়কর সাফল্য হচ্ছে ‘থিয়েটার’ সম্পাদনা। থিয়েটার নাট্যদলের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের মঞ্চনাটক আন্দোলনে দাদার অবিস্মরণীয় অবদান। থিয়েটার নাট্যদলের মুখপাত্র হিসাবে থিয়েটারের যাত্রা শুরু।

প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে নাটক বিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আছে কিনা জানি না। থিয়েটারের রচনাসমূহের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের নাট্য চর্চার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। ‘থিয়েটার’ পত্রিকায় বাংলাদেশের সকল খ্যাতিমান লেখকেরাই লিখেছেন। থিয়েটার পত্রিকা এখন ইতিহাস। ঢাকা- কলকাতার বিজ্ঞসমাজ থিয়েটার নিয়ে গবেষণা করেছেন। দুএকটা অভিসন্দর্ভ প্রকাশিত হয়েছে। রামেন্দু মজুমদার অসম্ভব সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তি। তার একক কৃতিত্বে থিয়েটারের অগ্রযাত্রা। মোহাম্মদ জাকারিয়া, মমতাজউদ্দীন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, ফেরদৌসী মজুমদার, আফরোজা বানু, খায়রুল আলম সবুজ, শিরীন বকুল, তৌকির আহমেদ পর্যন্ত যে মিছিল সবই রামেন্দু মজুমদার এর সাফল্য। থিয়েটার স্কুল প্রতিষ্ঠাও তার অন্যতম সুকৃতি। থিয়েটার স্কুল থেকে সার্টিফিকেটধারী কত যে নাট্য শিক্ষার্থী পাশ করেছেন তার সংখ্যাও নেহাত কম নয়।

তার সহধর্মিনী বিখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ফেরদৌসী মজুমদার। মঞ্চ ও টেলিভিশনের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। আশি ও নব্বই দশকে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। বিখ্যাত লেখক শহিদ মুনীর চৌধুরীর যোগ্য ভগ্নি। তিনিও ইতিহাস। একমাত্র কন্যা ত্রপা মজুমদার। মেধাবী ব্যক্তি। একদা ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন কিছুদিন। এখন নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। তিনিও অভিনেত্রী।

বিজ্ঞাপন

রামেন্দু দা’ প্রথম জীবনে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। ইংরেজির শিক্ষক। তার ছাত্রের সংখ্যাও কম নয়। প্রবীণ ব্যক্তিরা যখন রামেন্দুদার পা ছুঁয়ে সালাম করতেন এবং স্যার সম্বোধন করতেন তখন অবাক হতাম। দাদা হেঁকে বলেন ও আমার ক্লাসরুমের ছাত্র। দাদার একটা বই আমার খুব প্রিয় ছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। দাদাই প্রথম এই ধরনের বই সম্পাদনা করেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশের নাটক’ সম্পাদিত গ্রন্থটিও অসাধারণ। সৈয়দ শামসুল হক, মমতাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, সেলিম আল দীন, মামুনুর রশিদ- এই পঞ্চ নাট্যকারের সেরা পাঁচটি নাটকের সংকলন।

সত্তর ঊর্ধ্ব রামেন্দু দা সুঠাম দেহের অধিকারী। শক্ত সমর্থ দেহ গঠন। ঋজু ও দৃঢ়। এখনও তিনি খাঁড়াভাবে হাঁটেন। পাঞ্জাবি পায়জামা তার পোশাক। শীতকালে দামি পশমি চাদর পরেন। পায়ে স্যান্ডেল। খুব সাধারণ চালচলন।

নোয়াখালিতে প্রায় জমিদার পরিবারে তার জন্ম। পৈতৃক সম্পত্তি সব দরিদ্র আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন। নিজে কোনো কিছু গ্রহণ করেননি। রামেন্দু দা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মিশতে পারেন। সকলেই তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। মুজিব আদর্শের সৈনিক তিনি। যখন বঙ্গবন্ধু নিষিদ্ধ ছিল তখনও রামেন্দু মজুমদাররা সক্রিয় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বিষয়ে কোনো আপোষ নাই। যে জীবন তিনি স্বেচ্ছায় বরণ করেছেন সমগ্র জীবন সেভাবেই বহন করে চলেছেন। এমন ব্যক্তিত্বের কোনো বিকল্প নাই।

রামেন্দু দা’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার ভিত্তিক একটা অনুষ্ঠান করতেন। সেখানে আমাকে একবার ডাক দিলেন। আমার সাক্ষাৎকার নেবেন দাদা। তবে এসবক্ষেত্রে আমি পালিয়ে যাই। কিন্তু দাদার আহবান উপেক্ষা করতে পারলাম না। এতো বড় সম্মান দিচ্ছেন দাদা। আমি রাজি। দাদা আমার শিশুসাহিত্য বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। আমি খুব দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিলাম। অনুষ্ঠান শেষে দাদা বললেন, আমীরুলের সুদৃঢ় বক্তব্য। ভালো হলো অনুষ্ঠানটা। যাহোক এই যে, ভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করি আমি। বয়সে তার চেয়ে অনেক ছোট। কিন্তু যথাযোগ্য সম্মান দিতে তার কার্পণ্য নাই। তাদের জেনারেশনে এমন আচরণ খুব কমব্যক্তির কাছেই পাওয়া যায়। দাদাকে অনেক শ্রদ্ধা করি। দাদাকে দেখলেই ছুটে যাই। বর্ণাঢ্য ও গৌরবদীপ্ত জীবন দাদার। দাদা, আপনার কাছে পুরো জাতির সাংস্কৃতিক ঋণের কোনো শেষ নেই।

বিজ্ঞাপন