চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মঈনুল আহসান সাবের: সেরা কথাসাহিত্যিক

স্কুল জীবনে আমরা যারা কিছুটা অকালপক্ক ছিলাম তাদের খুব প্রিয় পত্রিকা ছিল বিচিত্রা। বাংলাদেশকে পাওয়া যেতো এই পত্রিকায়। কিছুটা প্রাপ্তবয়স্ক ধরনের পত্রিকা। কখনও সিরিয়াস। কখনও সাংস্কৃতিক। কখনও মুক্তচিন্তার কাগজ। আমাদের চিন্তাধারা গড়ে ওঠে এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে। কত ধরনের প্রচ্ছদকাহিনী যে এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তার হিসাব নেই। এই প্রচ্ছদকাহিনীগুলো যদি সঠিকভাবে গবেষণা হতো তবে বাংলাদেশের বিবর্তন স্পষ্ট হতো আমাদের কাছে।

যাহোক একটা প্রচ্ছদ কাহিনীর সূত্র ধরে এই লেখার অবতারণা। প্রচ্ছদ রচিত হয়েছিল কবি আহসান হাবীবকে নিয়ে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি। বিভিন্ন দৈনিকে সাহিত্য পাতার সম্পাদনা করে বিখ্যাত তিনি। কবি আহসান হাবীব বাঙালি মুসলমান সমাজের বিকশমান ব্যক্তিত্ব। সেই প্রচ্ছদকাহিনীতে কবি আহসান হাবীবকে নানা আলোয় নানা রঙে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই লেখায় আহসান হাবীবের পারিবারিক ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে অভিনেত্রী কেয়া চৌধুরী এবং মঈনুল আহসান সাবের এর ছবি ছাপা হয়েছিল। সাবের তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। কবি পিতার গর্বিত সন্তান। সেই সংখ্যায় সাবের ভাইয়ের একটা প্রাসঙ্গিক গল্প ছাপা হয়েছিল। মঈনুল আহসান সাবেরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। কবি পরিবারের সঙ্গে সাবের ভাইয়ের ছবি। মনে আছে দুই ভাই এক বোন। মা বাবার পেছনে সলজ্জ দাঁড়িয়ে আছেন। সাবের ভাই, কেয়া চৌধুরী, তার ছোট ভাই। বলাবাহুল্য সাবের ভাইয়ের আম্মাও লেখক। তারও কিছু শিশুসাহিত্য বিষয়ক গল্প আছে।

বিজ্ঞাপন

মঈনুল আহসান সাবের ধীরে ধীরে নিজেকে নির্মাণ করেছেন। খুব সিরিয়াসধর্মী লেখা। যা লেখেন তাই নতুন ধারার সৃষ্টি করে। সবসময় প্রথাবিরোধী সাহিত্যচর্চা করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

জনপ্রিয় ধারার সাহিত্য রচনার মোহে তিনি কখনো অবগাহন করেননি। এমন এককালে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন যখন বাংলাদেশে বাণিজ্যিক সাহিত্য গড়ে উঠেছে। তার সমসাময়িক সবাই প্রায় জনপ্রিয়তার দৌড়ে খ্যাতিমান ও কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছেন। প্রকাশকদেরও সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশ করে অর্থ উপার্জনের পথ সুগম হয়ে গেছে। তারা নানা ধরনের বই প্রকাশ করে, বাংলাদেশের বইয়ের বড় একটা বাজার তৈরি হলো। সেই উন্নয়নমুখী প্রকাশনা শিল্পের সূচনাপর্বের লেখক মঈনুল আহসান সাবের, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন এর সূর্যালোকে সাবের ভাই স্বতন্ত্র পথ খুঁজে নিলেন। তথাকথিত জনপ্রিয় লেখক নন তিনি। কিন্তু বিকাশমান মধ্যবিত্ত সমাজের মনোজগতের জটিল টানাপোড়েন তিনি গল্পচ্ছলে সহজভাবে উপস্থাপন করেন। সাবের ভাই খুব অসাধারণভাবে চরিত্র নির্মাণ করেন। গভীর মনস্তত্ব তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তার লেখার আলাদা ভক্তকূল আছে।

সাবের ভাই আমাদের সমাজের একজন নির্বিকার দর্শক, ভাঁড়দের ভাড়ামি তিনি প্রত্যক্ষ করেন। ভাঁড়দের নানা কীর্তি কাহিনীর ভেতর মহলের মর্ম তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তুলে আনেন। সত্যি বলতে কি সাবের ভাইয়ের মতো এমন শক্তিমান কথাসাহিত্যিক বাংলা ভাষাতেই বিরল। বাংলা ভাষায় লেখেন বলেই আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সাবের ভাইদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় না। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, বিশ্বসাহিত্যের সাম্প্রতিক সাহিত্য চর্চার ধারাতেও সাবের ভাইদের অবদান খুব শক্ত। ব্যক্তি হিসেবেও সাবের ভাই অন্যরকম মানুষ। নিরিবিলি ছিমছাম থাকতে পছন্দ করেন। ভিড়ের ভেতর থাকেন। আড্ডার মধ্যমণি তিনি। কিন্তু অত্যন্ত মৃদুভাষী। সবার কথা মন দিয়ে শুনবেন। মৃদু মৃদু হাসবেন। কখন তীব্রশ্লেষে কোনো ফোঁড়ন কাটেন।
পরিমিত আহার গ্রহণ করবেন। ক্ষীনতনু, ছিপছিপে একহারা গড়ন। হাতের লেখা খুব সুন্দর। বন্ধুদের জন্য উদার হস্ত। তার লেখক বন্ধুর সংখ্যাও প্রচুর। ভালো লাগলে বুকে টেনে নিতে দ্বিধা করেন না। ছোট বড় নির্বিশেষে যে কেউ সাবের ভাইয়ের বন্ধুত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

আমরা তার অনুজ। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আন্তরিকতার টানে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। সাবের ভাই আমাদের ছোটজ্ঞান করেননি। কোনো পার্টিতে পানাহারের উন্মত্ততায় লাগামছাড়া বেফাঁস কথাবার্তাও তিনি সহজভাবে গ্রহণ করেন। কখনো উচ্চকণ্ঠে তাকে কথা বলতে শুনিনি। সাবের ভাই যে কোনো মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। অকারণ তর্ক পছন্দ করেন না। প্রত্যেক লেখক সম্পর্কে তার নিজস্ব মতামত আছে। অহংকারী, উদ্যত গর্বিত ও আত্মম্ভরী লেখক শিল্পীদের তিনি এড়িয়ে চলেন।

সাবের ভাইয়ের চোখে মুখে সবসময় পরিহাসপ্রিয়তা লক্ষ্যণীয়। মৃদুস্বরে হাসি উপহার দেন। সাবের ভাই ভ্রমণ ও আড্ডায় একক ও অদ্বিতীয়।

খুব রুচিশিদ্ধ মানুষ। প্রেমিক হৃদয় তার। উন্নত সোমরসে আসক্ত। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দুর্লভ এক মিশ্রণ তিনি।

সাবের ভাইয়ের ছোটগল্প ও উপন্যাস নিয়ে কোনো বিশ্লেষণ করা হলো না এই স্মৃতিঘেঁষা রচনায়। বইয়ের নামও উদ্ধৃত করা হলো না। সাবের ভাই খুব সৌখিন মানুষ। অনেক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন দীর্ঘদিন। বিচিত্রায় ছিলেন দীর্ঘদিন। বিচিত্রায় থাকাকালীন বইমেলা নিয়ে প্রচ্ছদকাহিনী পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে লিখেছিলাম। এই দায়িত্ব সাবের ভাই দিয়েছিলেন। তখন বিচিত্রা সম্পাদক বিখ্যাত শাহাদত চৌধুরী।
পরে সাবের ভাই সৃজনশীল প্রকাশনায় যুক্ত হন। তার প্রকাশনীর নাম ‘দিব্যপ্রকাশ’।

শত শত বই প্রকাশ করেছেন। ক্যাটালগের দিকে তাকালে বোঝা যাবে সাবের ভাইয়ের পঠন পাঠনের বিস্তৃত পৃথিবীর কথা। তিনি ফিকশন লেখেন। কিন্তু জ্ঞানরাজ্যে নন ফিকশনের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সাবের ভাই তার পঠিত প্রিয় বইগুলো পুনঃমুদ্রিত করেছেন। ব্যবসায়িক সাফল্য হবে কিনা পূর্বাপর তা বিবেচনা করেননি। বই প্রকাশ করেছেন ভালোবেসে। বর্তমান কালের পাঠকদের জন্য দিব্যপ্রকাশের এই উদ্যোগ। একজীবনে সাবের ভাইয়ের কর্মসাফল্য অনেক। অর্থনৈতিক সাফল্য হয়তো শিল্পপতিদের মতো নয়। কিন্তু সৃজনী সাহিত্যে সাবের ভাই যে অক্ষয় অবদান রেখেছেন আমাদের কালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য সেটি।