চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নাইমুল আবরার: মৃত্যু, কিংবা কর্পোরেট দাসত্ব

রাজধানীর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর করুণ মৃত্যু হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সহযোগী এক মাসিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আয়োজনের এক কনসার্টে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া ওই শিক্ষার্থীর নাম নাইমুল আবরার রাহাত। আর প্রথম আলোর সাময়িকী কিশোর আলোর ‘কি আনন্দ’ শিরোনামের সে অনুষ্ঠান ছিল গত শুক্রবার।

নাইমুল আবরারের মৃত্যুর পর এই ঘটনার জন্যে দায়ী করা হচ্ছে কিশোর আলোকে, আরেকটু বাড়িয়ে বললে প্রথম আলোকে। আবরারের বিক্ষুব্ধ সহপাঠীদের অভিযোগ কিশোর আলো কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তাদের অভিযোগ সময়মত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে এমন করুণ পরিণতি হতো না তার। তারা এই অভিযোগের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর কাছে থাকা হাসপাতালে না নিয়ে কর্তৃপক্ষ আবরারকে চার-পাঁচ কিলোমিটার দূরের এক হাসপাতালে নিয়ে গেছে। দূরত্বজনিত এই কারণে সময়মত চিকিৎসার সময়মত ব্যবস্থা হয়নি। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেনি কিশোর আলো কর্তৃপক্ষ, এমনই অভিযোগ। এছাড়াও অভিযোগ আছে স্বেচ্ছাসেবকদের বিরুদ্ধে, তারাও ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করেনি।

বিক্ষুব্ধ সহপাঠীদের এই অভিযোগের বিপরীতে কিশোর আলো কর্তৃপক্ষ শুরুতে শোকপ্রকাশ করেছে। আবরারের পরিবারের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে; এতখানিই। এই শোকপ্রকাশ ও পাশে থাকার অঙ্গীকার মূল্যহীন হয়ে যাবে যদি আবরার নিয়ে তাদের কোনধরনের অবহেলা থেকে থাকে। কারণ একটা মানুষের জীবনের মূল্য কখনই শোকপ্রকাশ আর পাশে থাকার অঙ্গীকারের সমান হয়না। এমনটা ভাবাও অপরাধ।

কিশোর আলো কর্তৃপক্ষ আবরারের বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যদি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে তবে তাদেরকে অন্তত চিকিৎসাজনিত অবহেলার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া যাবে। তবে এটা তদন্ত ও প্রমাণসাপেক্ষ। তদন্তের আগে এখানে চূড়ান্ত মন্তব্য সমীচীন নয়। যদিও এখানে ফেসবুক-ট্রায়ালের মোড়কে প্রাথমিক যে দোষারোপের সংস্কৃতি চলে আসছে তাতে করে এখন পর্যন্ত প্রথম আলো ও কিশোর আলোকেই দায়ী করা হচ্ছে।

কয়েকশ’ মিটার দূরত্বের সরকারি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চাইতে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের ‘আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে’ নিয়ে যাওয়ার যে অভিযোগ ওঠেছে কিশোর আলো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এনিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। কর্পোরেট চুক্তি অনুযায়ী ওই হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং ওই বেসরকারি হাসপাতালের প্রচারণা হবে বলে একজন মুমূর্ষু রোগীকে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মরতে হলো! কিশোর আলো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ওই হাসপাতালের ব্যবসায়ীক কিংবা অনুষ্ঠানের বিষয়ে চুক্তি-সমঝোতা থাকতে পারে, তবে একজন মুমূর্ষু ব্যক্তির জন্যে এধরনের কোন চুক্তি-সমঝোতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে কেন? এখানে সবার আগে দরকার ছিল মানবিক দৃষ্টি ও বিবেচনা, কিন্তু সহপাঠীদের অভিযোগ সত্য হলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ীক চুক্তিকে। এটা চরম অন্যায়। আর এটা যদি প্রমাণ হয় তবে এটাকে অপরাধের অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করে বিচারের মুখোমুখি করা যায় কি না এনিয়ে বিজ্ঞজনের মতামত ও আইনি বিশ্লেষণ এবং পদক্ষেপ জরুরি।

নাইমুল আবরার রাহাতের মৃত্যুর এই ঘটনা কিশোর আলো কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকে নির্দেশ করে। একজনের মৃত্যুতে এই কনসার্টের আপাত সমাপ্তি ঘটেছে বটে তবে ওখানে হাজারও লোক যে অনিরাপদ ছিল তা বলাই বাহুল্য। কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাজনিত অব্যবস্থাপনা এখানে আলোচনার দাবি রাখে। কেন জেনারেটর বা বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র এভাবে খোলা জায়গায় রাখা হবে? হাজার লোকের সমাগম যেখানে প্রত্যাশিত সেখানে এই বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে দেখার দরকার ছিল।

এছাড়া সবচেয়ে দৃষ্টিকটু ব্যাপার ঠেকছে কিশোরদের একটা অনুষ্ঠানে একজন কিশোরের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পরেও কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছে সূচি অনুযায়ী। বিকালে আবরারের মৃত্যু হলেও সন্ধ্যা অবধি অনুষ্ঠান চলেছে একটানা। এখানে কর্তৃপক্ষ একজন মানুষের জীবনের মূল্যের চাইতে কর্পোরেট স্বার্থরক্ষার দিকে মনোযোগী ছিল বলেই প্রমাণ হচ্ছে। লক্ষ্য ছিল কর্পোরেট স্পন্সরদের চাহিদামাফিক সকল পক্ষের সম্ভব সর্বোচ্চ প্রচারণা। আর এতে প্রাণের দামের চাইতে বেশি হয়ে গেছে কর্পোরেট চাওয়া, কর্পোরেট চরিত্র। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত।

বিজ্ঞাপন

এমন না যে নাইমুল আবরার নামে কিশোরের মৃত্যু সবার অলক্ষ্যে হয়েছে। এই ঘটনার অনেক প্রত্যক্ষদর্শীও ছিল। বিভিন্ন মাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীদের যে বক্তব্য তাতে প্রমাণ হয় তারা বিষয়টি জানত। প্রথম আলো পত্রিকা যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেখানেও দেখা গেছে তারা তাৎক্ষণিক ‘বিশেষজ্ঞ’ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিল। তারা এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শব্দকে পেশাগত ডিগ্রি উল্লেখে আলাদাভাবেই লিখেছে ‘এফসিপিএস’ ডাক্তার। এতে করে বোঝাই যায় নাইমুল আবরারের এই দুর্ঘটনার বিষয়টি শুরু থেকেই তারা জানত। তবু তারা অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছে; বলা যায়- একটা লাশের ওপর দিয়েই অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছে। এটা চূড়ান্ত রকমের অমানবিক এক কাজ। এটা কিশোর আলো পত্রিকা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা নিশ্চিতভাবেই। এই দায়িত্বহীনতা আলোচনার দাবি রাখে। কলেজ কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার বিপরীতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা করছি। পাশাপাশি পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেরও।

নাইমুল আবরারের মৃত্যুর পর তার পরিবারের পক্ষ থেকে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না থাকার প্রেক্ষাপটে পুলিশ ময়না তদন্ত ছাড়াই পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছে। দাফনও হয়ে গেছে তার। এমন অবস্থায় পরিবার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না আনলেও পুলিশের নীরব থাকা ঠিক হবে না। অস্বাভাবিক যেকোনো ঘটনার পুলিশ রিপোর্ট হয়ে থাকে, এই ঘটনায়ও এর ব্যত্যয় না হলেও অন্য অনেক সাধারণ ঘটনার সঙ্গে একে মিলিয়ে ফেলা উচিত হবে না। কারণ এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা একটা বড় প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনাকে সামনে নিয়ে এসেছে, বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে ওঠে এসেছে অবহেলাজনিত নানা দিকও। এই মৃত্যু সকল পর্যায়ে আলোচনার অনুষঙ্গ হয়েছে। তাই একে গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।

কিশোর আলো সাময়িকীর মূল প্রতিষ্ঠান দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা হওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথম আলোর বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধে নেমেছেন। এটা ব্যক্তি-সমষ্টির জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রায়-শত্রুতার প্রকাশ। এই ঘটনার পর অনেককে দেখছি প্রথম আলো বর্জনের ডাকও দিতে। অপরাধ প্রমাণের আগে এখানে অপরাধী প্রথম আলো। এটা কি ঠিক হচ্ছে? বলি- ঠিক হচ্ছে না। কারণ নাইমুল আবরারের মৃত্যুর পর কেউ যখন প্রথম প্রহরেই খবরাখবর না নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বর্জনের ডাক দিয়ে বসে তখন এখানে অতীত শত্রুতার প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। এতে করে লাভ হয় না কারও। উলটো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নাইমুল আবরারের পরিবার। তাদের মধ্যে বিচার পাওয়ার ক্ষীণ আশা থাকলেও একটা শ্রেণির মানুষের অতীত শত্রুতার ঝাল মেটানোর উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণায় একটা পরিবারের আশা শেষ হয়ে যায়। এখানেও তাই হচ্ছে বলে ধারনা করি।

নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় কিশোর আলো সাময়িকী কর্তৃপক্ষ কোনোভাবে দায়ী থাকলে তাদের শাস্তি দাবি করি। অনুষ্ঠান পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বে অবহেলাসহ সম্ভব কোনো কিছুতে তারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে শাস্তি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের দাবি জানাব। তবে এখানে বর্জন কিংবা নিষিদ্ধের দাবি অপ্রাসঙ্গিক বিধায় এমন দাবিতে সমর্থন করতে পারিনা।

নাইমুল আবরার রাহাতের মৃত্যুতে শোকাহত। আনন্দ আয়োজনে কেউ যেন আর কখনও বিষাদ-পাখি হয়ে আকাশে না মেশে সে কামনাই করি!

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: