চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভূঞাপুর পাইলট বালিকা স্কুলে রশিদ ছাড়াই বাড়তি ফি আদায়

টাঙ্গাইলে ভূঞাপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন। দুর্নীতি বন্ধে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন অভিভাবক ও সচেতনরা।

করোনার মহামারির বন্ধের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিনা রশিদে নির্ধারিত বোর্ড ফি এর অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে। এর আগে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হলে তদন্ত কমিটি গঠন করে উপজেলা প্রশাসন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অনুসন্ধানে উঠে আসে অনিয়মের নানা চিত্র।

সম্প্রতি এক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর বোর্ড নির্ধারিত ফি ৪০০ টাকার স্থলে বিনা রশিদে এক হাজার টাকা নিয়েও ফরম ফিলাপ না করায় আলোচনায় আসে বিদ্যালয়টি। দেখা যায়, এই বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীদের দেয়া হয়নি রশিদ। তবে নেয়া হয়েছে অতিরিক্ত টাকা। পরে তদন্তে নামে উপজেলা প্রশাসন।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই বিদ্যালয়ের নিয়মিত এসএসসি পরীক্ষার্থী ২৬০ জন শিক্ষার্থী ফরম ফিলাপের জন্য অতিরিক্ত এক লাখ ৮ হাজার ১২০ টাকা আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ফরম ফিলাপের জন্য বোর্ড নির্ধারিত ফি (সার্টিফিকেট ও মার্কসীটসহ) ১ হাজার ৯৭০ টাকা। সেখানে ৭৪ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা করে। শুধু বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হয়ছে ২৪ হাজার ৪২০ টাকা।

মানবিক বিভাগে ফরম ফিলাপের জন্য বোর্ড নির্ধারিত ফি (সার্টিফিকেট ও মার্কসীটসহ) ১ হাজার ৮৫০ টাকা। সেখানে ১২৮ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা করে। শুধু মানবিক বিভাগ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হয়ছে ৫৭ হাজার ৬০০ টাকা।

বাণিজ্যিক বিভাগে ফরম ফিলাপের জন্য বোর্ড নির্ধারিত ফি (সার্টিফিকেট ও মার্কসীটসহ) ১ হাজার ৮৫০ টাকা। সেখানে ৫৮ জন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা করে। বাণিজ্যিক বিভাগ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হয়ছে ২৬ হাজার ৯০০ টাকা।

এছাড়াও এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য ৩৫ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বোর্ড ফি ৪০০ টাকার পরিবর্তে এক হাজার টাকা এবং তাদের নতুন ভর্তি ফি হিসেবে এক হাজার টাকা করে নেয় হয়েছে। এতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত এক হাজার ৬০০ টাকা করে মোট ৫৬ হাজার টাকা ও কোন বিষয়ে পাশ করেনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অযোগ্য এমন চার শিক্ষার্থীর ২৫ হাজার টাকা আদায় করে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

অষ্টম শ্রেণীর ২০৫ জন শিক্ষার্থীর ৬০ টাকা রেজিষ্ট্রেশনের পরিবর্তে নেয়া হয় ৪০০ টাকা। এতে অতিরিক্ত ৩৪০ টাকা করে মোট ৬৯ হজার ৭০০ টাকা আদায় করছে কর্তৃপক্ষ। নবম শ্রেণীর রেজিষ্ট্রেশন ফি ১৭১ টাকার পরিবর্তে ৪০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। ২৫৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০০ জনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ২২৯ টাকা করে অতিরিক্ত ২২ হাজার ৯০০ টাকা আদায় করেছে। তদন্ত শুরু হওয়ায় বাকি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করতে পারেনি।

ষষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণী পর্যন্ত ফরম বাবদ রশিদ বিহীন ৮৫০ জনের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে মোট ৮৫ হাজার টাকা ও ইউনিক গাইড বাবদ ৫০০ জনের কাছ থেকে একশ টাকা করে ৫০ হাজার টাকা এবং ৩৯৯ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মার্কসীট ও সার্টিফিকেট বাবদ অতিরিক্ত ২০০ টাকা করে (যা পূর্বে ফরম ফিলাপের সময় আদায় করা হয়েছে) ৭৯ হাজার ৮০০ টাকা আদায় করা করেছে স্কুল প্রধান শিক্ষক ও অফিস সহকারি। এভাবে মোট ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৫২০ টাকা বিনা রশিদে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দুর্নীতির ঘটনা ধামাচাপা দিতে ১৪ অক্টোবর রাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ফোন করে পরের দিন ১৫ অক্টোবর শুক্রবার ও বিজয়া দশমির সরকারি বন্ধের দিনে কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে জোর পূর্বক ডেকে আনা হয়। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। বিনা রশিদে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়টি জানায় তারা। এসব অতিরিক্ত টাকা সংরক্ষণ করা হয়নি রেজিস্টারে, দেখানো হয়নি কোনো ব্যয়ের খাত। এমনকি জমা করা হয়নি স্কুলটির ব্যাংক হিসাবেও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, ভর্তি থেকে শুরু করে ফরম ফিলাম পর্যন্ত রশিদ ছাড়াই শিক্ষকরা অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। শিক্ষকদের কাছে আমরা জিম্মি।

অষ্টম শ্রেণী ও ১০ শ্রেণীর একাধিক শিক্ষার্থী বলছে, গণমাধ্যমের কর্মীরা বিষয়টি অবগত হওয়ার রেজিষ্ট্রেশন ও ফরম ফিলাপের অতিরিক্ত ফি ফেরত দেয়া হচ্ছে। তবে অন্য খাতে ও ক্লাসের রশিদ ছাড়া আদায় করা অতিরিক্ত টাকা এখনও ফেরত দেয়নি।

একাধিক অভিভাবক বলেন, ৬০ টাকার রেজিস্ট্রেশন ফি’র পরিবর্তে শিক্ষকরা ৪০০ টাকা আদায় করছে। এ ছাড়াও ফরম ফিলাম ও সনদপত্র এবং মার্কশীট বিতরণের সময়ও অতিরিক্ত টাকা আদায় করে। এ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরাও কোনো প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তাদের সায় রয়েছে বলেই এই স্কুল বছরের পর বছর লাখ লাখ অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

এজন্য প্রধান শিক্ষক ও অফিস সহকারি দায় চাপাচ্ছেন শ্রেণী শিক্ষকদের উপর। আর শ্রেণী শিক্ষকরা বলছেন তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না! কোনো শিক্ষার্থীই তাদের কাছে অর্থ জমা দেয়নি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাল মাহমুদ বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বোর্ড ফি ছাড়া অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়নি। অনেকেই শত্রুতা করে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করছে।

টাকা ফেরতের বিষয়ে জানতে  চাইলে তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীদের মিলাদের টাকা ফেরত দেয়া হচ্ছে। তবে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কাছ কোন খাতে ৩৬০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছিল আর কেনইবা টাকা ফেরত হচ্ছে জানতে চাইলে কোন উত্তর দিতে পারেননি এই প্রধান শিক্ষক।

তদন্ত দলের প্রধান ডা. স্বপন দেবনাথ বলেন, তদন্ত করে অভিযোগের অনেক সত্যতা পেয়েছি। তদন্ত শেষে মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিকট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।

ভূঞাপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় ঘটনার সময়ে আমি কর্মস্থলে ছিলাম না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ইশরাত জাহান বলেন, অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য অভিযোগকারীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেয়া হয়েছিল। ক্লাস না হওয়ায় সেই অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেয়া হয়েছে। রশিদ বিতরণে কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞাপন