চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভুটানের স্বীকৃতির দিনটি ছিল অনন্য: প্রধানমন্ত্রী

‘লোটে শেরিং শুধু ভুটানের না, বাংলাদেশেরও’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন: ভুটান যেদিন স্বীকৃতি দেয় সেদিনের কথা কখনও ভুলব না। সেটা আমাদের জন্য হাসি-কান্নায় অনন্য দিন ছিল।

বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। ‘মুজিব চিরন্তন’ প্রতিপাদ্যে ১০ দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের অষ্টম দিনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শান্তি, মুক্তি ও মানবতার অগ্রদূত’। প্যারেড স্কয়ারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা বলেন: ভুটানই প্রথম দেশ, যারা স্বাধীন বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি প্রদান করে, তখন আমরা বন্দি শিবিরে ছিলাম। তখনও বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয় হয়নি। সেদিন রেডিওতে আমরা যখন প্রথম শুনতে পারলাম যে ভুটান আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেটা আমাদের জন্য অনন্য দিন ছিল। হাসি-কান্নার মধ্য দিয়ে দিনটি আমাদের কেটেছিল। কাজেই আমরা সব সময় ভুটানের কথা স্মরণ করি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন: ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় লাভের আগেই ৬ ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। সে দিনটির কথা আমি কখনও ভুলতে পারি না। কারণ, তখন আমরা বন্দি শিবিরে ছিলাম। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, সেই সঙ্গে আমার মাকে গ্রেফতার করে। আমি ও আমার ছোট বোন রেহানা, ছোট্ট রাসেল, জয় তখন মাত্র ৫ মাসের একটি শিশু, আমরা তখন সবাই বন্দিখানায়। আমরা ভুটানের জনগণের সেই অবদানের কথা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করি। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য আমরা ২০১২ সালে ভুটানের মহামান্য তৃতীয় রাজা জিগমে দোর্জি ওয়াংচুককে ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননায় ভূষিত করেছি।’’

শেখ হাসিনা বলেন: বাংলাদেশ এবং ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, পর্যটন, শিক্ষা ইত্যাদি খাতে সহযোগিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভুটানের ছাত্র-ছাত্রী বাংলাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। আজকের সম্মানিত অতিথি লোটে শেরিং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। তিনি শুধু ভুটানের না, তিনি বাংলাদেশেরও।

প্রধানমন্ত্রী বলেন: এই অনুষ্ঠানমালাকে ঘিরে ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যেই মালদ্বীপ এবং নেপালের রাষ্ট্রপতিদ্বয় এবং শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। আজকের অনুষ্ঠানে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং আমাদের মাঝে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন। তার উপস্থিতি এই অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করেছে এবং আমরা নিজেরা সম্মানিত বোধ করছি। বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে তাকে এবং ভুটানের জনগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

শেখ হাসিনা বলেন: ভুটান আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র। ভৌগোলিক নৈকট্য ছাড়াও আমাদের রয়েছে প্রায় একই ধরনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের অবস্থান প্রায় এক ও অভিন্ন। আমরা একে অপরকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বহু প্রাচীন। দশম শতাব্দীতে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণকারী বৌদ্ধ ধর্মগুরু মহাসিদ্ধ তিলোপা তিব্বত-ভুটানে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুধু বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই লড়াই করেননি। তিনি বিশ্বের সকল নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। তিনি শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

শেখ হাসিনা বলেন: দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষের বসবাস। এ অঞ্চলে যেমন সমস্যা রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা। আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের রয়েছে অসম্ভব প্রাণশক্তি, উদ্ভাবন ক্ষমতা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে জয় করে টিকে থাকার দক্ষতা। পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রাপ্ত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে আমরা সহজেই দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে পারি। আমরা যদি আমাদের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করি, তাহলে অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

তিনি বলেন: বাংলাদেশে আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, আমরা সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি।

বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন: জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের এই শুভ মুহূর্তে আমি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের, নীতিনির্ধারকদের প্রতি একটি শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া গড়ে তুলতে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।

অনুষ্ঠানে সন্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং, স্বাগত বক্তব্য রাখেন ড. এ কে আব্দুল মোমেন, প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর আলোচনা করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. রওনক জাহান।

ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর ভিডিওবার্তা প্রচার করা হয়। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছোটকন্যা শেখ রেহানা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।

বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে ভুটানের শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেন। এছাড়াও  রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল সংগীত, লোকসংগীত, নৃত্যানুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।

বিজ্ঞাপন