চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভিশন ও বিনয়

গতকাল জাতীয় সংসদের আয়োজনে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ: সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় তথ্য ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক এক কর্মশালায় জাতির জনকের দৌহিত্র, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় মুখ্য আলোচক হিসেবে এক স্বপ্নভরা বক্তব্য রেখেছেন।

তিনি দেশে থাকলে কিছু সভা, সেমিনার, কর্মশালায় ভাষণ দেন। মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী সভায় যোগদান করে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। কিন্তু তার গতকালের ভাষণটি ছিল বেশ ভিন্নতর। উপস্থিত আইন প্রণেতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার ভাষণ শুনেছেন। নেতা, বুদ্ধিজীবী, পদস্থ ব্যক্তিবর্গ অনেকেই অনেক ভাষণ দেন। কিন্তু তাদের সব ভাষণই মানুষকে বিমোহিত করে না, স্বপ্নে জাগ্রত করে না। কোনো কোনো ভাষণ শ্রোতাকে বিমোহিত করে, স্বপ্নে আবিষ্ট করে, উজ্জীবিত করে। শ্রোতা বিমুগ্ধ হয়ে নতুন স্বপ্নে দীপ্ত শপথ নিয়ে মহৎ কর্মে নিমগ্ন হবার পথে ধাবিত হয়। সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই বক্তৃতা তেমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি গত এক দশকে বাংলাদেশের নিজের মতো করে আত্মশক্তিতে নীরব ও নিরবচ্ছিন্ন এগিয়ে যাওয়ার গল্প শুনিয়েছেন এবং আগামী দিনে আরো অগ্রগতির পথরেখা উপস্থাপন করেছেন। তথ্য-প্রযুক্তি খাতে কোনো ব্যয়বহুল বিদেশী পরামর্শকের সহায়তা ছাড়া বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি ধাপ রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মতো অল্প কথায় বিশাল ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন সাবলীল বাংলা ভাষায়। আমরা যেখানে কথায়, কথায় ইংরেজি শব্দ, বাক্য উচ্চারণ করে নিজেদের পাণ্ডিত্য প্রকাশের চেষ্টা করি, সেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষায় গড়ে উঠা শেখ হাসিনা পুত্র তার পুরো ভাষণে কোনো ইংরেজি শব্দের অবতারণা করেননি।

তার বক্তৃতার যে কয়েকটি পয়েন্ট শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে তার একটি হল, প্রতিটি সরকারি দপ্তরে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারী দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রত্যয় ঘোষণা। তিনি বেসরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি দমনের বাগাড়ম্বর করেননি। ভয় দেখিয়ে, আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে অথবা কঠোর হয়ে দুর্নীতি দমনের কথা বলেননি। বরং প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি করার ফাঁক-ফোকর বন্ধ করে দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত সরকারি সেবা এবং সরকারি ক্রয় পদ্ধতি বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছেন। প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে কাজ নির্ধারণ, পরিকল্পনা ও প্রাক্কলন প্রস্তুত এবং দ্রুত ও টেকসইভাবে কর্মসম্পাদনের মাধ্যমে দুর্নীতি করার সকল অলিগলি বন্ধ করার পদ্ধতি উপস্থাপন করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ জাতির লড়াই দীর্ঘদিনের, অগ্রগতিও প্রচুর। কিন্তু সুযোগ সন্ধানীর সংখ্যাও অগণিত। ফলে রাজনৈতিক সরকারি দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হলেও প্রশাসনিক ও প্রায়োগিক পর্যায়ে দুর্নীতি হ্রাসে আরো দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে। মাঝেমধ্যেই ফাঁক গলে দুর্নীতিবাজরা সুযোগ নিয়ে ফেলে। চিন্তাবিদ সজীব ওয়াজেদ সেই জায়গাটা অনুধাবন করেছেন এবং সকল কালো পথ বন্ধ করার প্রত্যয় দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন। এই প্রত্যয় ও পদ্ধতির উদ্ভাবন তার এই ভাষণ অনন্য উচ্চতায় উন্নীত করেছে।

সকল ক্ষেত্রে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে জনসেবা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্নীতি বন্ধের জন্য তিনি ডিজিটাল বান্ধব আইন প্রণয়ন এবং বিধিমালা, নীতিমালা দ্রুত পরিবর্তনের অনুরোধ করেছেন। একটি বিষয় পরিষ্কার, বিধিমালা বা নীতিমালা আইন নয়, এটি পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘসূত্রিতার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন মহৎ লক্ষ্য ও উদার কর্মস্পৃহা।

তার ভাষণের আরেকটি দিক হল, তিনি জেনারেশন গ্যাপের কথা অতি সতর্কতার সঙ্গে বিনীতভাবে উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের কারণে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, এমনকি কিশোর প্রজন্ম অনেক বেশি অগ্রগামী ও প্রযুক্তি নির্ভর। আমরা ঐতিহ্যবাদীরা কিছুটা পুরোনো ধ্যান-ধারণায় আসক্ত। নতুন নতুন উদ্ভাবনকে আত্মস্থ করতে কিছুটা অনীহা প্রকাশ করি। ফলে আমাদের ফেলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম অনেক এগিয়ে চলছে। তরুণ ও তরুণদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত সজীব ওয়াজেদ জয় অপেক্ষাকৃত প্রবীণদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানাননি, সর্বক্ষেত্রে নতুনদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেননি। তিনি অনুধাবন করেছেন, তার মা বিশ্বসেরা প্রধানমন্ত্রীর সব জেনারেশন ধারণ করার কৌশলই সর্বোত্তম পন্থা। আওয়ামী লীগের মত একটি গণভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক দল কেবল নবীনের কর্পোরেট কালচারে সামনে এগুতে পারবে না। বরং কর্পোরেট নবীনের সঙ্গে কাঁদামাটি গায়ে মাখা প্রবীণরা অপরিহার্য। নবীন, প্রবীণের সমন্বয়েই বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের আওয়ামী লীগকে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে নিতে হবে, বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সিনিয়রদের প্রতি বিনয়ের সঙ্গে নতুনদের ধ্যান-ধারণা, আধুনিক বিজ্ঞান, তথ্য-প্রযুক্তির নব নব উদ্ভাবন ধারণ করার অনুরোধ করেছেন। নতুনদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান করেননি। তার এই আহ্বান তাকে অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।

জনাব জয়ের পুরো বক্তৃতার যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তা হল তার বিনয়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে, তিনি রাজনীতিতে অফিসিয়ালি পদ গ্রহণের পূর্বেই একটি রাষ্ট্রে নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছেন, নতুন স্বপ্নে নব প্রজন্মকে উজ্জীবিত করেছেন এবং তার দেখানো ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি নিজেই বাস্তবায়ন করে চলেছেন। এই বয়সে এত বড় মহৎ অর্জন তাকে মহিমান্বিত করেছে। পৃথিবীর খুব কম রাজনীতিবিদের এমন সৌভাগ্য হয়েছে যে, তিনি রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করে জাতিকে আলোড়িত করেছেন এবং তিনি নিজে তা বাস্তবায়ন করেছেন। সজীব ওয়াজেদ জয় সেই ইতিহাস খ্যাতদের তালিকায় স্বমহিমায় নিজের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন।

উপরন্তু তার মাতামহ একটি পরাধীন জাতিকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়ে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীন করেছেন। তার মাতা এক চরম বৈরী পরিবেশ মোকাবেলা করে হতাশাগ্রস্ত একটি জাতিকে সংগঠিত করে ক্ষুধা মুক্ত একটি আত্মনির্ভরশীল উন্নত জাতিতে পরিণত করার লক্ষ্যে সাফল্যের বরমাল্য গলায় নিয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে সমুখের পানে এগিয়ে চলছেন। এমন জগৎজোড়া সাফল্যের তিলক যার ললাটে সেই তরুণের মৌখিক ও শারীরিক ভাষায় কিছুটা দাম্ভিকতা, কিছুটা অহঙ্কার, কিছুটা কমান্ডের সুর থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। প্রচলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তাই বলে।

কিন্তু তার বক্তব্যের প্রতিটি ছত্রে ছিল অনুরোধের ভাষা, বিনয়ের পরমতম বহিঃপ্রকাশ। তার মাতার রাজনৈতিক কর্মীরা তাকে পরবর্তী নেতৃত্বের আসনে স্বাগত জানানোর জন্য উন্মুখ হয়ে বসে অপেক্ষা করছেন। সেখানে তার বক্তৃতায় নির্দেশনা থাকা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি তার মায়ের কর্মীদের বিভিন্ন বিষয়ে অনুরোধ জানিয়ে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছেন। তার ভিশনারি বক্তব্যের ছত্রে ছত্রে ছিল বিনয় ও শিষ্টাচারের পরম বহিঃপ্রকাশ।

উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা অভিভূত হয়ে লক্ষ্য করেছেন, মা শেখ হাসিনা তার পিতার নিকট থেকে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, রাজনৈতিক ও সামাজিক শিষ্টাচার এবং বিনয়ের যে দীক্ষা পেয়েছেন তিনি সফলভাবে তা তার সন্তানের মাঝে সঞ্চারিত করেছেন। যে নির্লোভ তরুণের মাঝে স্বপ্ন, ভিশন, শিষ্টাচার ও বিনয়ের পরম সম্মিলন রয়েছে তার জয়যাত্রা রুখবার সাধ্য কারো নেই। তার নেতৃত্ব পরম বিকশিত হবে এবং দেশ ও জাতি উন্নতির শিখরে আরোহণ করবেই।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)