চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভিডিও না থাকলে কী হতো?

Nagod
Bkash July

সিলেটের শিশু রাজন থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তি এবং সবশেষ কলেজছাত্রী খাদিজা; সবগুলো ঘটনার ন্যায়বিচার কিংবা এসব ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়ের মূল অনুঘটক মোবাইল ফোনের ভিডিও।

Reneta June

যারা রাজনকে পিটিয়ে মারা, শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবস করানো এবং খাদিজাকে নৃশংসভাবে কোপানোর ওই দৃশ্যগুলো ভিডিও করেছেন, তারা সবাই একঅর্থে ওই সময়ে নাগরিক সাংবাদিকতা বা সিটিজেন জার্নালিজমের চর্চা করেছেন; যে ছবিগুলো পরে পিক করেছে মূলধারার গণমাধ্যম। যে কারণে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক কখনো সখনো মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়েও শক্তিশালী।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি রাজনকে পিটিয়ে মারা কিংবা শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবস করানো অথবা খাদিজাকে কোপানোর ওই ভয়াবহ দৃশ্যগুলোর কোনো ভিডিও না থাকত, যদি উৎসাহী কেউ ওই দৃশ্যগুলো তাদের মোবাইল ফোনে ধারণ না করতেন, তাহলে এই ঘটনাগুলোর কী পরিণতি হত?দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাজন হত্যার বিচার কি হত? শ্যামল কান্তি এবং খাদিজার পক্ষে কি সারা দেশ জেগে উঠত? কুমিল্লার কলেজছাত্রী তনু খুন হয়েছেন খোদ সেনানীবাস এলাকার ভেতরে। ওই নৃশংসতার কোনো ভিডিও নেই। থাকলে কী হত বা আদৌ কিছু কি হতো?

তবে এইসব ভিডিও মধ্য দিয়ে আমরা দেখেছি সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকের শক্তি। রাজন হত্যা মামলার পুরো বিচারকাজ শেষ হয়েছে মাত্র ১৭ কার্যদিবসে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। দেশের আদালতগুলোয় যেখানে প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন, সেখানে মাত্র ১৭ দিনে এরকম একটি চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে সামাজিক চাপের কারণে। আর এই চাপটি এসেছে ফেসবুকের মাধ্যমেই।

ফেসবুকে রাজনকে পিটিয়ে মারার ওই ভয়াবহ দৃশ্য প্রচারিত হবার পর সারা দেশ এর বিরুদ্ধে জেগে ওঠে, যা প্রকারান্তরে একটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের ওপর। নারায়ণগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবস করিয়েছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। অত্যন্ত মানহানীকর এই দৃশ্য কেউ একজন তার মোবাইল ফোনে ধারণ করেন যা পরে ছড়িয়ে দেয়া হয় ফেসবুকে এবং যথারীতি মূলধারার গণমাধ্যম যেমন টেলিভিশন ও সংবাদপত্র সেই ছবি প্রচার ও প্রকাশ করে।

আর এর মাধ্যমেই টনক নড়ে সরকারের। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় খোদ কেবিনেটে। এই ঘটনায় নিন্দা আর ক্ষোভ জানান খোদ আইন ও শিক্ষামন্ত্রী। সরকারের উচ্চমহলের হস্তক্ষেপে শিক্ষক শ্যামল কান্তির বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে তাকে পুনরায় স্বপদে বহাল করা হয়। এ বিষয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয় যে, শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবস করানোর ওই দৃশ্যটি কেউ যদি ভিডিও না করতেন এবং যদি এটি ফেসবুকে ভাইরাল না হত, তাহলে শ্যামল কান্তির স্বপদে বহাল তো দূরে থাক, এতদিনে তাকে ঘটিবাটি বিক্রি করে পাশের দেশে পাড়ি জমাতে হত। রাজনকে পিটিয়ে মারার দৃশ্যেরও যদি কোনো ভিডিও না থাকত, তাহলে ১৭ কার্যদিবসে বিচার তো দূরে থাক, এতদিনে ওই মামলার চার্জশিটও হত কি না সন্দেহ।

একইভাবে কলেজছাত্রী খাদিজাকে কোপানোর দৃশ্যও কেউ যদি ক্যামেরাবন্দি না করতেন, তাহলে এটি দেশের আর দশটি হামলার মতোই তামাদি হয়ে যেত। বরং হামলাকারী বদরুল যেহেতু ক্ষমতাসীন দলের নেতা, সুতরাং তাকে মারধরের অপরাধে ওই এলাকার বহু লোকের উপর এরইমধ্যে নির্যাতনের খড়্গ নেমে আসত। পুলিশের দাবড়ানির ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হত নিরীহ বহু মানুষকে।

তার মানে কি দাঁড়াচ্ছে এই যে, এখন যেকোনো ঘটনার ন্যায়বিচার পেতে গেলে তার ভিডিও থাকতে হবে? প্রশ্নটা এ কারণে যে, শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবস করানোর কিছুদিন পরেই লালমনিরহাটে একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করার খবর এসেছে গণমাধ্যমে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা প্রতিবাদও জানিয়েছেন। কিন্তু এ নিয়ে খুব বেশি আলোড়ন তৈরি হয়নি। না ফেসবুকে, না মূলধারার গণমাধ্যমে। কারণ ওই শিক্ষককে জুতাপেটা করার কোনো ভিডিও ছিল না।

খাদিজাকে কোপানোর প্রতিবাদে সিলেট এখন আন্দোলনমুখর। কিন্তু প্রতিদিন আরও অনেক খাদিজাকে এরকম নৃশংসতার শিকার হতে হয়। তার সব খবর আমরা জানি না। সব খবর নিয়ে ফেসবকু তোলপাড় হয় না। ফেসবুক তোলপাড় না হলে মূল ধারার গণমাধ্যমও সরব হয় না। অবস্থাদৃষ্টে এখন মনে হচ্ছে, আগে ফেসবুকে কোনো ইস্যু তৈরি হবে, তারপর সেটি পিক করবে গণমাধ্যম।

অথচ হবার কথা ছিল এর উল্টো। আবার এই ফেসবুকেই কেউ কেউ এই বলে সমালোচনা করেন যে, যারা ওইসব ঘটনার দৃশ্য ভিডিও ধারণ করেছেন, তারা এগিয়ে গেলে ঘটনাটি ঘটত না। অর্থাৎ চোখের সামনে আপনি যখন একটি অপরাধ হতে দেখবেন তখন আপনি কি সেটি থামাতে যাবেন নাকি সেটির ছবি তুলবেন-এট একটি ডায়্যালেকটিক। আবার সব সময়ে আপনার বাধা দেয়ার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে।

খাদিজাকে যখন কোপাচ্ছিলো বদরুল, তখন তার সেই ধারালো চাপাতির সামনে যাওয়ার সাহস অনেকেরই হবার কথা নয়। কিন্তু কিছু মানুষ যখন একত্র হয়েছে, তখন তারা ঠিকই বদরুলকে ধরেছে এবং গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে। কিন্তু কেউ একজন যদি ওই দৃশ্যটি ভিডিও না করত, তাহলে ঘটনার এরইমধ্যে কোনদিকে মোড় নিত, তা আগেই বলা হয়েছে।একইভাবে শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবস করাচ্ছিলেন খোদ সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। নারায়ণগেঞ্জে এই ওসমান পরিবারের কী প্রতাপ তা কারো অজানা নয়। সুতরাং কার এত বড় বুকের পাটা যে সেলিম ওসমানের সামনে দাঁড়িয়ে ওই ঘটনার প্রতিবাদ করবে?

সুতরাং ওই ঘটনারও যদি কেউ একজন ভিডিও না করত, তাহলে এর পরিণতিও হত উল্টো। সুতরাং অপরাধ দেখলে সেটি থামানোর চেষ্টা করা যেমন নাগরিক দায়িত্ব, তেমনি কেউ যদি ওই অপরাধের ভিডিও ধারণ করেন, সেখানেও দোষের কিছু নেই। বরং এটি এখন জনমত তৈরি এবং ন্যায়বিচারের জন্য আবশ্যক হয়ে উঠছে।

যদিও গুলশান হামলার পরে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে তাহমিদ নামে এক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানেরও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু তাহমিদকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই ছবিটি কি ভুয়া? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

BSH
Bellow Post-Green View