চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভিকটিম ও সাক্ষীকে সুরক্ষা দেয়ার মতো কোনো আইন নেই: এমজেএফ

ভিকটিম ও সাক্ষীকে সুরক্ষা দেয়ার মতো আইন বাংলাদেশে নেই বলে কোনো মামলা দায়েরের পর নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা ভিকটিমরা সাধারণত অসহায় হয়ে পড়েন বলে মন্তব্য করেছেন মানুষের জন্য ফাউন্ডশেন (এমজেএফ) আয়োজিত ওয়েবিনারে অংশ নেওয়া আলোচকরা।

বুধবার বিকালে মানুষের জন্য ফাউন্ডশেন ‘প্রটেকশন অব দ্যা ভিকটিমস এন্ড উইটনেসেস’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন উপলক্ষে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সেখানে বক্তারা বলেন: আমরা দেখেছি ভিকটিমরা বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার কাছ থেকে হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা ভিকটিমদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা ভিকটিমদের সাপোর্টতো করেই না উপরন্তু ভিকটিমদের হুমকি দিয়ে থাকে। একটি গবেষণার অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কেইস স্টাডি থেকে এই তথ্যগুলো উঠে এসেছে।

তারা আরও বলেন: ভিকটিমরা তাদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে জানেন না। এমনকি যারা বলেন যে ভিকটিম প্রটেকশন আইন আছে, তারাও অনেকসময় ঠিক মতো বলতে পারে না আইনটা কী এবং কী ধরণের প্রটেকশন দেয়া হবে বা হচ্ছে? মাত্র ৫১ ভাগ উত্তরদাতা বলেছেন তারা জানেন যে ভিকটিমকে সুরক্ষা দেয়ার এরকম কোন আইন নেই। যারা বলেছেন যে ভিকটিমকে সুরক্ষা দেয়ার মতো কোন আইন নেই, তাদের শতকরা ৭৯ ভাগ মনে করেন এইরকম আইন থাকা উচিৎ।

ওয়েবিনার থেকে আরও বলা হয়: বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি বা ভিকটিম এবং সাক্ষী বা উইটনেসের সুরক্ষা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং এর উপর ভিত্তি করে একটি ‘ভিকটিম এন্ড উইটনেস প্রটেকশন এ্যাক্ট’ প্রণয়নে সহায়তা করার জন্য মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন একটি গবেষণা করিয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বাউল।

‘ভিক্টিম অব ক্রাইম এন্ড উইননেস প্রটেকশন’ বিষয়ক খসড়া প্রতিবেদনের উপর গবেষণা করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে আজকের জুম মিটিংএ।

গবেষণা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে: ভিকটিমদের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি দরকার। কারণ অধিকাংশ ভিকটিম দরিদ্র এবং দিনমজুর। কাজেই তাদের পক্ষে আদালতে উপস্থিত থাকার মতো যাতায়াত খরচ ও খাবার কিনে খাওয়ার টাকা থাকে না। ভিকটিমরা সামাজিক নিরাপত্তা চায়। যাতে তারা স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা হয়রানির শিকার না হয়।

বিজ্ঞাপন

কেন বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও সাক্ষীর সুরক্ষা আইন দরকার? এমন প্রশ্নকে সামনে রেখে বক্তারা বলেন: কারণ বাংলাদেশে এখন এমন কোনো আইন নাই, যা দিয়ে ভিকটিম অথবা সাক্ষীকে রক্ষা করা যায়। এমনকি ভিকটিম এবং উইটনেস কী বা কারা? এ সম্বন্ধে আইনে কোন সংজ্ঞাও নেই। সাধারণ অভিধানে যে অর্থ আছে, সেই অর্থ দিয়েই সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই যে বাংলাদেশের আইনে প্রটেকশন বা সুরক্ষা বলে কোনকিছু বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত করা নাই। তাই গবেষকরা এই বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন উদাহরণ নিয়ে কাজ করেছেন।

এই গবেষণায় আলাদা আলাদা করে বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট আইনের আলোকে ভিকটিম, উইটনেস এবং প্রটেকশনকে সংজ্ঞায়িত করে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।

সুপারিশমালায় বলা: দ্রুত ভিকটিম ও উইটনেসের জন্য আইনটি বাস্তবায়ন করা, প্রতি জেলায় ভিকটিম ও উইটনেসের জন্য অফিস প্রতিষ্ঠা করা, পুলিশ স্টেশনে ভিকটিম এবং উইটনেসের জন্য প্রটেকশন সেল গঠন করা, আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, ভিকটিমদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাদেরকে আইন সম্পর্কে জানানোটা খুব জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ফারজানা রহমান বলেছেন: এই দুইটি শব্দের অর্থ আভিধানিক অর্থের চাইতেও অনেক ব্যাপক।

তিনি মনে করেন, এই শব্দ দুটির সংজ্ঞা থাকা এজন্যই উচিৎ, যেন বোঝা যায় সমাজের ঠিক এই মানুষগুলিই সুরক্ষা সুবিধা পাবে। এছাড়া যে মানুষগুলো রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুরক্ষা সুবিধা সেভাবে পায় না, যেমন আদিবাসী, তৃতীয় লিঙ্গ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে দালিত হরিজন, তাদের সরাসরি চিহ্নিত করা যাবে।

গবেষণা চলাকালে দেখা গেছে বর্তমানে বাংলাদেশের আইনে ভিকটিম ও সাক্ষীর একটা পরোক্ষ পরিচিতি আছে। এবং দেশের নীতিনির্ধারকরা শত বছর ধরে এইসব আইনকেই ভিকটিম প্রটেকশন এ্যাক্ট বলে মনে করে আসছেন। তবে এগুলো সম্পূর্ণভাবে সাক্ষী ও ভিকটিমকে সুরক্ষা দেয় না। অন্যদিকে দেশের সাধারণ আইনে অপরাধীকে এমন সব পদ্ধতিগত সুবিধা দিয়ে থাকে, যা তাদের হাতকে আরো শক্তিশালী করে।

গবেষণার উপস্থাপিত তথ্যের উপর বক্তব্য রাখেন এডভোকেট সালমা আলী, এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত এবং অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। সভাপ্রধান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এমজেএফের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।