চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভাসমান শহর!

মালদ্বীপ ভ্রমণ: পর্ব-১

মালদ্বীপে আসার ইচ্ছেটা যে কখনো ছিল না সেটা না বলাই ভালো। ছিল… কিন্তু সেটা খুব জোড়াল কিছু না। দেশের বাইরে আমার থাকতে ভালো লাগে না। অফিস থেকে আগেও যখন ট্যুরে গেছি, তখন দেশে ফিরে হা করে নিঃশ্বাস নিতাম! খাবার ভালো লাগতো না। তাই প্রথম দশদিন চকোলেট আর জুস খেয়ে থাকতাম। কখনো প্রেসবক্সে খাবার দিলে শুধু যতটুকু না পারতে নয়, ততটুকুই খেতাম। ক্ষুধা পেলে বাঘেও ধান খায়। ব্যাপারটা সেরকম।

করোনার জন্য বিদেশ সফর একরকম বন্ধই ছিল। গতবছর যারা বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব কাভার করতে কাতার গিয়েছিল, তারা কোয়ারেন্টাইনের যাঁতাকলে পড়ে হোটেল রুম থেকেই বের হতে পারেনি। এখন অবশ্য দেশেও তেমন নেই। স্কুল-কলেজ খুলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে বিদেশ সফরে আছেন। এই বছর আবার টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ। সাথে যোগ হয়েছে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ।

আমি আসলে কোনো কিছুতেই আগ্রহবোধ করি না। জীবনকে বহু আগেই সময় নামক এক ভেলার ওপর বসিয়ে পানিতে ছেড়ে দিয়েছি। যা করার সময়ই করবে।

মালদ্বীপে আসার কয়েকদিন আগে, ২২/২৩ সেপ্টেম্বরের দিকে আমার স্পোর্টস এডিটর রাত ১১টায় ফোন করে বললেন, অফিস আমাকে মালদ্বীপে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ কাভার করার জন্য পাঠাচ্ছে।

আমি! হঠাৎ করে দুনিয়ার সমস্ত পিঁপড়াগুলো মাথায় ঘুরতে শুরু করল। একেতো আবেদনের সময় শেষ, আরেকদিকে বুঝেই উঠতে পারছিলাম না কি করবো!

এরপর থেকে একদিকে আবেদনপত্র নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, আরেকদিকে এসাইনমেন্ট। সবমিলিয়ে কী যেন হয়ে গেল। শুধু মনে মনে আল্লাহকে ডাকছিলাম।

আরও যখন শুনলাম সাত থেকে আটবার কোভিড টেস্ট করাতে হবে ২০ দিনের মধ্যে, তখন শুধু দোয়া চাওয়া শুরু করলাম। কি কি নিতে হবে, কি কি পড়াশুনা করতে হবে, কিছুই মাথায় আসছিল না। যতটুকু এসেছে মুহূর্তেই ভুলে গেছি।

ফ্লাইট ভোর ৪টা ২৫ মিনিটে। কাতার এয়ারওয়েজ। কিছুই গোছাইনি। রওনা হওয়ার দিন, মানে দুপুরে গিয়ে সুটকেস কিনে আনলাম। তারপর অফিসে গিয়ে ক্যামেরা, ল্যাপটপ, ট্রাইপড, লাইভ দেয়ার জিনিসপত্র নিয়ে বাসায় আসলাম সন্ধ্যা ৭টায় বা তারও পরে। লাগেজই খোলা হয়নি। গোছাবো কি!

বিজ্ঞাপন

যাই হোক, অবশেষে সব গোছানো শেষ হল। শুধু অফিস থেকে কিছু অফসেট পেপার নিতে ভুলে গেলাম। একটু বলে রাখি, আমি লিখে লিখে কাজ করি। কাগজ-কলম ছাড়া আমার কাজ ঠিকভাবে হয় না। আমার এক ফ্রেন্ড এটা জানতো বলে ও আমাকে আগেরদিন একটা প্যাড দিয়েছিল। আজকে দ্বিতীয় দিন চলছে, এখনো এয়ারপোর্টের কিছু কাজ ছাড়া কলমের ব্যবহার হয়নি।

নীল জলরাশির পাড়ে লেখক

এয়ারপোর্টে রওনা হওয়ার আগে শাইখ সিরাজ স্যার ফোন করলেন। ফ্লাইট কয়টায় জানাতেই বললেন তাহলে তো ঘুম হারাম। এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম রাত দেড়টায়।

স্টেশন না ঠিক, গাবতলিতে ঈদের সময় যেমন ভিড় হয় সেরকম ভিড়। এই প্রথম এয়ারপোর্টে কোনো ট্রলি পেলাম না। সব নিয়ে ভেতরে ঢুকে অন্য কলিগদের সাথে দেখা।

কথামতো একসাথে বোর্ডিংয়ের জন্য দাঁড়াবো। কিন্তু বিশাল লাইন। এক ট্রলিতে তিনজনের লাগেজ, ট্রাইপড, ক্যামেরা। কোভিডের কাগজপত্র দেখতে এই লাইন। আমরা ভেবেছিলাম বোর্ডিং!

অবশেষে ইমিগ্রেশন। সেটা পার হয়ে বসারও সুযোগ হল না। সময় হয়ে গেছে। আবার দৌড়। সেখানেও লাইন। প্লেন ছাড়ল প্রায় ৩৫ মিনিট পর।

দোহা এয়ারপোর্টে গেট জটিলতায় পড়ে এক গেট থেকে অন্য গেট থেকে পৌঁছাতেই দেড়ঘণ্টা পার। প্লেন থেকে যখন মালদ্বীপের আড়াই হাজার দ্বীপগুলো দেখা যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল আমাদের দেশের নদীর চড়। আপাত অর্থেই দ্বীপগুলো চড়ের চেয়ে খুব একটা বড় না, কোনটা তার চেয়ে ছোট। তবে বসতি আছে। এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে গিয়ে মানুষ অফিস করে।

মালদ্বীপে এসে ইমিগ্রেশন পার হয়ে হোটেলের কার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম একজনকে (আমাদের আগেই জানানো হয়েছিল হোটেল বুকড করা আছে)।

সামনে তাকাতেই হঠাৎ আমার জ্ঞান ফিরল। আমি ভাসছি! পানির ওপরে! সামনে অনেক ওয়াটার ট্যাক্সি। আর পুরোটা জুড়ে নীলচে সবুজ রঙের পানি। হালকা ঢেউ। মাতাল করা ঢেউ বললেও ভুল হবে না। আমি বুঝলাম… আমি এখন মালদ্বীপে!

বিজ্ঞাপন