চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বুকে নিয়ে ঢাবিতে এক অন্যরকম জাদুঘর

পাঁচ কি সাড়ে পাঁচটি রাস্তা নিয়ে রাজধানীর পলাশীর মোড়। সেই পলাশীর মোড়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার একদম প্রান্তে অবস্থিত একটি অন্যরকম জাদুঘর ও সংগ্রহশালা। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর মাষ্টার্সের ছাত্র শহীদ আবুল বরকতের নামে ‘শহীদ আবুল বরকম স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা’ স্থাপিত হয়েছে।

ভাষা শহীদ আবুল বরকতের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৩ জুন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহাকুমার ভরতপুর থানার বাবলা নামক একটি ছোট গ্রামে। আবুল বরকতের ডাক নাম ছিল আবাই। তার বাবা শামসুজ্জোহা ও মা হাসিনা বিবি।

Reneta June

পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। প্রাথমিক পড়াশুনা শেষে তিনি পার্শ্ববর্তী গ্রাম তালিবপুর ইংলিশ হাই স্কুলে ভর্তি হন। ওই স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে মেট্রিক পাশ করেন। মেট্রিক পাশ করার পর তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি বাংলাদেশে চলে আসেন। ঢাকার পুরানা পল্টনে বিষ্ণু প্রিয়া ভবনে তার মামা আব্দুল মালেক সাহেবের এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। ওই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে তিনি অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন এবং এম.এ. শেষ পর্বে ভর্তি হন।

বিজ্ঞাপন

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্মের পরই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে দাবি ওঠে, বাংলাকেও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। এতে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ একটি স্মরণীয় দিন। গণপরিষদের ভাষা-তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেওয়া ছাড়াও পাকিস্তানের মুদ্রা ও ডাকটিকেটে বাংলা ব্যবহার না করা এবং নৌবাহিনীতে নিয়োগের পরীক্ষা থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাখার প্রতিবাদস্বরূপ ওইদিন ঢাকা শহরে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটিদের দাবি ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা। ধর্মঘটের পক্ষে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই শ্লোগানসহ মিছিল। এরপরে নানা ঘটনার মধ্যে দিয়ে ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়।

১৯৪৮ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানে থাকার ফলে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকায় ভাষা আন্দোলনের দাবি ও নানা সংগ্রাম কর্মসূচির ঢেউ আবুল বরকতকে আলোড়িত করে। তিনিও ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ভাষার দাবিতে ছাত্রদের মিছিল-মিটিং ও লিফলেট বিলিতেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে থাকে। এরপরে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধিদের এক সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। এসব কর্মসূচির আয়োজন চলার সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশ-শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। ১৪৪ ধারা অমান্য করা হবে কিনা এ প্রশ্নে সভায় দ্বিমত দেখা দেয়, তবে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সঙ্কল্পে অটুট থাকে। ওইদিন ঢাকা শহরের স্কুল-কলেজের হাজার হাজার ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সমবেত হয়ে পাঁচ-সাতজন করে ছোট ছোট দলে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসলে পুলিশ তাঁদের উপর লাঠিচার্জ করে, ছাত্রীরাও এ আক্রমন থেকে রেহাই পায়নি। বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসররত মিছিলের উপর পুলিশ গুলি চালায়। ওই মিছিলে ছিলেন শহীদ আবুল বরকত। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবি এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর মাষ্টার্সের ছাত্র), রফিক উদ্দীন এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মৃত্যুবরণ করেন। পরে হাসপাতালে আব্দুস সালাম যিনি সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন মৃত্যুবরণ করেন। অহিউল্লাহ নামে ৯ বছরের একটি শিশুও পুলিশের গুলিতে মারা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বরকত স্মরণে তার প্রিয় ক্যাম্পাসে স্থাপিত হয়েছে ‘শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা’। ঢাকা জেলা পরিষদের সহায়তায় ছিমছাম ওই জাদুঘরটির সার্বিক ব্যবস্থায় রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হয় জাদুঘরটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ড. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন জাদুঘরের পরিচালক হিসেবে পদাধিকার বলে দায়িত্ব পালন করছেন।

জাদুঘর ও সংগ্রহশালাটি সর্ম্পকে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ভাষা সংগ্রামে শহীদদের অবদানকে স্মরণ করতে ও সম্মান জানাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা করা হয়েছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁতে শহীদ জব্বার, মানিকগঞ্জে শহীদ রফিক, নোয়াখালিতে শহীদ সালাম এবং ফেনীতে শহীদ শফিউরের নামে জাদুঘর আছে। যেহেতু আবুল বরকতের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় এবং তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, সেজন্য এখানে তার নামে জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে।

শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর। ২০০৯ সালের ১৬ জুন এর নির্মাণকাজ শেষ হয়।  ২০১২ সালের ২৫ মার্চ বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান জাদুঘর ও সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করেন।

মাত্র ৫ জন কর্মী নিয়ে জাদুঘর ও সংগ্রহশালার যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। দারুণ ছিমছাম এই জাদুঘরে প্রবেশ করলে কর্মীদের যত্নের ছাপ সহজেই চোখে পড়ে।

দর্শনার্থীদের জন্য ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বিভিন্ন স্মারক, মূল্যবান দলিল ও শহীদ বরকতের জীবনের বিভিন্ন খন্ডচিত্র পাওয়া যাবে জাদুঘরে।

আন্দোলনের সময় তলপেটে গুলি লেগেছিল বরকতের। পরনের নীল হাফ শার্ট, খাকি প্যান্ট ও কাবুলী স্যান্ডেল রক্তে ভিজে যাচ্ছে। দু’তিন জন ছুটে এসে সুঠামদেহী বরকতকে কাঁধে তুলে জরুরী বিভাগের দিকে দৌড়াতে থাকেন। বরকত বলেছিলেন, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি বাঁচব না, আমার কিছু হলে বিষ্ণু প্রিয়া ভবন পুরানা পল্টনে খবর পৌঁছে দিবেন। ডাক্তাররা তাকে বাঁচাতে পারেননি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য ২১ ফেব্রুয়ারী রাত ৮টার সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি ওয়ার্ডে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বরকত। এই ঘটনার পুরো চিত্র ফুঁটে উঠেছে জাদুঘরে।

দোতলায় রয়েছে লাইব্রেরি ও গবেষণা কর্মের নির্দিষ্ট স্থান। জাদুঘরের পরিচালকের আগ্রহে সেখানে রয়েছে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অনেক বই এবং মূল্যবান অনেক দলিল। অনুমতি সাপেক্ষে তা ব্যবহার করতে পারেন আগ্রহী গবেষকরা।

২১ ফেব্রুয়ারি এলেই শহীদ মিনার রং করা হয় আর পরিষ্কার করা হয় বলে অনেকে অভিযোগ করে থাকেন। তবে শহীদ বরকতের নামে স্থাপিত ওই জাদুঘরটি পরম মমতায় যত্ন নিয়ে প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পৌঁছে দিচ্ছে জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা কর্মী বাহিনী ও পৃষ্টপোষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জাদুঘরটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের পশ্চিম পাশে এবং পলাশী মোড়ের উত্তর পাশে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রবেশ পথের শুরুতে হাতের বাঁয়ে অবস্থিত। এর দক্ষিণে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। রাজধানীর শাহবাগ মোড় থেকে পলাশীর মোড় পর্যন্ত রিকশায় যাওয়া যায় সহজে। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে রাজধানীর পলাশী মোড়ের এ স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালা। এছাড়া বিশেষ দিবসেও খোলা থাকে জাদুঘরটি।