চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ভালোবাসি তোমায়…….’

কাকে দেখে বুকের মধ্যে প্রথম কুসুম কুসুম অনুভূতি হয়েছিল, এখন আর মনে পড়ে না। অনুধাবন করতে পারি, যে এলাকায় থাকতাম, কোনও চঞ্চলা কিশোরীকে দেখে হয়তো চঞ্চল হয়েছিল মন। কোনও একজনা নিশ্চয় নয়। তখন তো চড়ুই পাখির মতো অস্থির মন। বদলে যায় ক্ষণে ক্ষণে। কখনও এ ডালে। কখনও অন্য ডালে। সেই কিশোর কিশোর ভালোবাসা হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে যেতে বেশি সময় লাগে নি। সেই বয়সে তো আর পরিপক্ব ছিলাম না। কবেইবা তা হতে পেরেছি?

চকিত চাহনির বেশি কিছু হওয়ার সুযোগও তো ছিল না। তাই যে হয়েছে, সেটাইবা বলি কী করে? বিপরীত লিঙ্গের অপরিচিতা কারো দিকে তাকানোর মতো আত্মবিশ্বাসও তো ছিল না। সামান্য টোকাতেই তো গুটিয়ে যেতাম লাজুক লতার মতো। দূর থেকে রঙধনুর মতো দীপ্তি নিয়ে কাউকে হেঁটে যেতে দেখে কিংবা টুনটুনি পাখির মতো সুরেলা কোনও কণ্ঠ শুনে বুকের মধ্যে বোধকরি জমেছিল ভালোবাসার শিশিরবিন্দু। বুদ বুদের মতো উন্মীলিত সেই জলকণা দিয়ে হয়তো কল্পনার মেঘ সাজিয়েছি।

বিজ্ঞাপন

আর যা কিছুর ঘাটতি থাকুক না কেন, কল্পনার কোনও কমতি কোনও সময়ই ছিল না। কল্পনা দিয়েই কত কিছু গড়ে তুলি। কল্পনার রঙ-তুলি দিয়ে আঁকি কত না ছবি। আবার মুছেও ফেলি। কল্পনায় কতজনের সঙ্গে আবেগময় কথোপকথন হয়েছে। মেঘের মতো ভেসে ভেসে কত দূরে দূরে চলে গেছি। কবি জয় গোস্বামী তো প্রশ্রয় দিয়েছেন এভাবে, ‘স্বপ্নে বসি ট্যাক্সিতে তোর পাশে/স্বপ্নে আমি তোর হাত থেকে বাদাম ভাজা খাই/কাঁধ থেকে তোর ওড়না লুটোয় ঘাসে/তুলতে গেলি-কনুই ছুঁলো হাত/তুলতে গেলি -কাঁধে লাগলো কাঁধ/সরে বসব? আকাশভরা ছাতে/মেঘের পাশে সরে বসল চাঁদ’। এমনটি ভাবতেই তো পুলকিত হয়েছে অন্তঃকরণ।
কত কল্পনাবিলাসী স্বপ্ন দেখেছি। তাতে অবশ্য স্বপ্ন ভঙের কষ্ট থাকে না। তবে সেই বয়সে বুকের গভীরে স্থান করে নেওয়া একজন ‘মৃম্ময়ী’ চিরকালের আরাধ্য নারী হয়ে আছে। যদিও তাকে কখনও বাস্তবে খুঁজে পাই নি। তারপরও না পাওয়া সেই নারীকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অনন্ত প্রেম’ উদ্ভাসিত হয়ে আছে হৃদয়ে, ‘তোমারেই যেন ভালবাসিয়াছি শত রূপে শতবার/জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার।/চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার-/কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার/জনমে জনমে যুগে যুগে অনিবার’। এখনও কি তাকে খুঁজে ফিরি না? জীবনানন্দ দাশের মতো করে বলতে পারি, ‘আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;/জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে/কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে’।

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আসার পর দেহ ও মনে উড়তে থাকে রঙিন প্রজাপতি। তার পাখনায় ভর দিয়ে মনের ভিতর কত যে রোমান্টিকতার আনাগোনা হয়। যদিও এত এত রোমান্টিকতা নিয়েও কারও হৃদয়ে আঁচড় কাটা সম্ভব হয় নি। এরজন্য যে উদ্যম ও হিম্মত থাকার প্রয়োজন, সেটা তো কখনই ছিল না। তাতে কি আর ভবী ভোলে?

কারও সান্নিধ্য না পেলেও ভালোবাসার উষ্ণতায় প্লাবিত তো হওয়াই যায়। কল্পনায় কাউকে কাছে পেতে তো আর বাধা নেই। তখন তো ‘ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো’ লাগারই বয়স। কারও এক টুকরো হাসি, কারও একটুখানি দুষ্টুমি, কারও ফ্যাশনবেল সাজ, কারও অপরূপ ভঙ্গিমার মোহনীয়তা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় হৃদয়। তাদের কেউ হয়ে যেতেন স্মিতা পাতিল। কেউ শ্রীদেবী। কেউবা মাধুরী দীক্ষিত। তখন তো বলিউডের নায়িকারাই চোখে এঁকে দিতেন স্বপ্নের মায়াঞ্জন।

তবে অনেকের ভিড়ে কোনও একজনকে হয়তো আলাদাভাবে জুম-ইন করে হৃদয়ে বিশেষ স্থান দিতাম। তাতে তো আর কারও মাইন্ড করার সুযোগ থাকতো না। কল্পনার এই প্রেমিকাদের নিয়েই জীবন হয়ে ওঠতো রঙদার। আর ঘটনাক্রমে কারও সঙ্গে একটু বেশি দেখন-হাসি হলেই নিজেকে মনে হতো ‘নাইনটিনফোট্টিটু লাভ স্টোরি’র উদ্বেলিত অনীল কাপুর। খুশিতে বাক-বাকম হয়ে বুকের মধ্যে বাজতে থাকতো ‘এক লাড়কি কো দেখা তো অ্যাইসা লাগা’। উড়ু উড়ু আহ্লাদিত এই আবেগটাই ছিল। ছিল না কোনও মনীশা কৈরালা।

বিজ্ঞাপন

অথচ কত গভীরভাবেই না ভালোবাসতে চেয়েছি। নিজেকে নিংড়ে দিয়ে বলতে চেয়েছি, ‘মেরা দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায়, ইয়ে পিয়ার তো তুম সে করতা হ্যায়’। হায়! কাউকে এমনভাবে হৃদয়ের কথা বলা হয় নি। শুধু কল্পনায় চেয়েছি, ‘ভালোবেসে সখি নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো- তোমার মনের মন্দিরে’। কেউ মনের মন্দিরে নামটি লিখেছিল কিনা জানতে পারি নি। আসলে তখন সময়টাই ছিল এমন, যতটা না ভালোবাসা হতো, তারচেয়ে বেশি থাকতো কল্পনার আল্পনা।

তবে দুঃসাহসিক প্রেমিকদের জন্য সব কালই সমান। তারা রোমিও হয়ে যুগে যুগে জুলিয়েটদের মন হরণ করে নিতে পেরেছেন। আর আমাদের সময়ে ‘রঙচটা জিন্সের প্যান্ট পরা/জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে ধরা/লাল শার্ট গায়ে তার বুক খোলা/সানগ্লাস কপালে আছে তোলা’ যুবকদের কদর ছিল বেশি। যে কারণে ডলি সায়ন্তনীরা কোনও রাখ-ঢাক না রেখেই বলতে পারতেন, ‘দৃষ্টিতে যেন সে রাজপুতিন/খুন হয়ে যাই আমি প্রতিদিন/নামধাম জানি না তার কিছু/তবুও নিলাম আমি তার পিছু’।

আমি তো আর সেই ক্যাটাগরিতে পড়তাম না। তারপরও তো কোনও একজনের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে কত কত দুপুর দাঁড়িয়ে থেকেছি। ক্ষেপণ করেছি কত না সময়। কলেজের ক্লাস অবলীলায় ফাঁকি দিয়েছি। গুরুত্বপূর্ণ কাজ উপেক্ষা করেছি। সব পিছুটানকে নাকচ করে দিয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময়ে হাজিরা দিয়েছি। সেকেন্ডের কাটা এদিক থেকে ওদিক হওয়ার সময় পায় নি। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় কিছুই দমিয়ে রাখতে পারে নি। শুধু একটুখানি দেখা আর কালেভদ্রে এক টুকরো মোনালিসা হাসির প্রলোভনে ছুটে গিয়েছি। পারস্যের কবি হাফিজ প্রিয়ার গালের একটি তিলের জন্য বোখারা আর সমরখন্দ বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। আমার তো সেই সামর্থ্য বা ক্ষমতা ছিল না। আমি কেবল প্রেয়সীকে আমার হৃদয়ের সুপ্ত আকুতিটুকুই দিতে চেয়েছি। কিন্তু ‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী/তারে বুঝিতে (বোঝাতে) পারি নি’।

বয়স বেড়েছে। পরিপক্বতা না এলেও অভিজ্ঞতা তো হয়েছে। বদলে গেছে সময়। কিন্তু ভালোবাসার বাসনা আমাকে কখনই ছেড়ে যায় নি। এখনও কল্পনার তুলিতে কারও মুখ আঁকার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি। কবি নির্মলেন্দু গুণ হয়ে ওঠেন পরম আশ্রয়, ‘হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে/মন বাড়িয়ে ছুঁই,/দুইকে আমি এক করি না/এক কে করি দুই’। এর বেশি তো সাহসে কুলায় না। আমি তো আর প্রেমিক পুরুষ হেলাল হাফিজ নই যে কোনও দ্বিধা না করেই সরাসরি বলবো, ‘দেখবো দেখাবো পরস্পরকে খুলে/যতো সুখ আর দুঃখের সব দাগ,/আয় না পাষাণী একবার পথ ভুলে/পরীক্ষা হোক কার কতো অনুরাগ’।

এখন তো ভালোবাসার খোলা হাওয়ায় কাউকে আর বেধে রাখা যায় না। কত সহজে, কত সুলভে, কত সাবলীলভাবেই ভালোবাসা হয়ে যায়। মাধ্যম হিসেবে আছে ফেসবুক, টুইটার, ইয়াহু, গুগল, স্মার্ট ফোনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। ভালোবাসার জন্য আছে একটি নির্ধারিত দিন ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। আর এখন তো বসন্ত আসে ঘোষণা দিয়ে, ‘আকাশে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা/কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে’।

হলুদ বা লাল শাড়ি, ফুলেল খোঁপা, ঝুমকো কানের দুল, টিপ, বাহারি চুড়ি, কাজল আর লিপস্টিকের মাধুর্য ছড়িয়ে ঘুরে বেড়ায় ভালোবাসা। আছে হৃদয় বিনিময়ের হরেক উপকরণ। ফুল, কার্ড, চকলেটসহ কত কি! এমনকি বইগুলো হয়ে গেছে ভালোবাসার। পরিবেশ এতটাই রোমান্টিক হয়ে গেছে, ভালোবাসার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় না। চাইতেও হয় না-‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়’। অথচ ভালোবাসার জন্য কাঙাল এই হৃদয় কত না তৃষ্ণার্ত হয়ে থেকেছে। হায়! কেউ একজন মল্লিকা সেনগুপ্ত’র মতো করে বলে নি, ‘তবুও তোমার ঘাম গন্ধ/সস্তা তামাক স্বপ্নের চোখ/আমাকে টানত অবুঝ মায়ায়’।

কিংবা তসলিমা নাসরীনের মতো এমন অনুভব যদি কারও থাকতো, ‘জানি না কেন হঠাৎ কোনও কারণ নেই, কিছু নেই, কারও কারও জন্য খুব/অন্য রকম লাগে/ অন্য রকম লাগে,/কোনও কারণ নেই, তারপরও বুকের মধ্যে চিনচিনে কষ্ট হতে থাকে,/কারুকে খুব দেখতে ইচ্ছে হয়, পেতে ইচ্ছে হয়,/কারুর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে/বসতে ইচ্ছে হয়,/সারাজীবন ধরে সারাজীবনের গল্প করতে ইচ্ছে হয়,/ইচ্ছে হওয়ার কোনও কারণ নেই, তারপরও ইচ্ছে হয়।’ এমন ইচ্ছের কথা আমাকে কেউ কোনো দিন বলে নি। আর আমিও তো গুটানো স্বভাবের কারণে কখনই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারি নি ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমায়…….’। এই না পারার কারণে অপ্রকাশের বেদনাই বোধকরি বুকের মধ্যে জ্বালিয়ে রেখেছে ভালোবাসার রওশন। সেটা নিয়েই কেটে যাচ্ছে এ জীবন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View