চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভালোবাসা ভালোবাসা

কুকুর দেখলে বরাবরই ভয় পায় ফ্লোরা। তাও যদি ১টা কুকুর হতো! এই গলিতে কুকুর আছে ৭টি। ভয় পাবে না তো করবে কি? ফ্লোরা ভয় পেলেও নির্ঝরের সঙ্গে তাদের দারুণ ভাব।
রোজকার ৪৮ টাকা সিগারেটের বাজেটের সাথে ১২ টাকার পাউরুটির বাজেট তো ওদের জন্যই ধরা।

কুকুর ৭টা হলে কি হবে, নির্ঝরের একনিষ্ঠ ভক্ত ওরা দুইজন: কয়লা আর বাদাম। গায়ের রং এর কারণেই এমন নাম। কয়লা কুকুরটার গায়ের রং কালো, বাদামের গায়ের রং বাদামী। নির্ঝরই এই নাম দিয়েছে। ফ্লোরার তো নাম পছন্দই হয়নি, কুকুর নিয়ে এত বাড়াবাড়িও পছন্দ না।

তবু নির্ঝর রোজ ফেরার পথে কয়লা আর বাদামকে নিয়ে বেশ সময় কাটায়। ফ্লোরা ভ্রু কুঁচকে অপেক্ষা করে বাসার গেটের সামনে। এসব কবে যে বন্ধ হবে!

কয়লা ছেলে কুকুর। বাদাম মেয়ে। ফ্লোরা সেদিন বলেই ফেললো, “বুঝলে কি করে?”
নির্ঝর হেসেছে শুধু। কিছু না বলে পাউরুটির প্যাকেট খোলায় মন দিয়েছে।
ওদিকে প্যাকেট খোলার শব্দে তুমুল লাফালাফি শুরু করেছে বাদাম আর কয়লা।

ফ্লোরা আর নির্ঝর বিয়ে করলো ছ’মাস হয়েছে। এখনো নতুনের গন্ধটা সম্পর্কের গা থেকে যায়নি। ফ্লোরাকে ভালোবেসে ফুল বলে ডাকে নির্ঝর। আর ফ্লোরা নির্ঝরকে ডাকে ঝড় বলে।
নাম পরিচয় তো হলো। এবার গল্প।

বিয়ের শুরুটা নাকি স্বর্গীয় হয়। ঝড় আর ফুলেরও তাই। দারুণ সময় কাটছে ওদের। একেবারে স্বপ্নময়। ঝগড়া নেই, তর্ক নেই। আহা! জীবনটা এতো সুন্দর কে জানতো! সুখ ঘিরে থাকা এ জীবনে খানিকটা রাগারাগি ওই কুকুরগুলোকে নিয়েই। দিন দিন ঝড়ের আদিখ্যেতা বাড়ছে। ফুলের বাড়ছে রাগ। রোজ কেন খাওয়াতে হবে ও দুটোকে?

ঝড় ফুলের সব কথা শোনে। শুধু এ বেলাতেই আপত্তি। শুধু বলে, “ওদের চোখগুলোকে দেখেছ? আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে” এ কথা শুনে বাদাম আর কয়লা কি বুঝলো কে জানে, চিৎকার করে ডাকতে শুরু করলো। হয়তো খুশির ডাক। কিংবা ভালোবাসার!

কত বড় একটা আক্ষেপের বিষয়, মানুষ তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচরের ভাষা বুঝতে পারে না। হয়তো এ কারণেই কুকুর বিশ্বস্ত! মানুষের মতো কথা বলতে পারলে বদলে যেতে পারতো প্রেক্ষাপট। তখন হয়তো মীরজাফরের খাতায় নাম লেখাতে হতো ওদের।

অপেক্ষার কথাটা শুনেই একটু ক্ষেপে উঠলো ফুল। বললো, “ওরে বাবা, এখন ওদের অপেক্ষাও চোখে পড়ছে! এই, সর এখান থেকে। সর।” ইশারা করে বাদাম ও কয়লাকে সরতে বলে ফুল। ফুল ওদের দেখতে পারে না ঠিকই, তবে আগের মতো ভয়ও পায় না।

ওরাও মাথাটা নিচু করে সরে যায় ওখান থেকে। ঝড় কিছু বলে না। খানিকটা হাসে। এই হাসির অর্থ কখনো বোঝে না ফুল। সংসারটা সাজিয়ে ওঠা হয়নি ফুল আর ঝড়ের। রোজ রোজ নতুন কিছু যুক্ত হচ্ছে পরিবারে। এই যেমন আজ যোগ হলো রুটি বেলার বেলন আর চাকি।

জীবনের প্রথম রুটি বানাচ্ছে ফুল। সঙ্গে ঝড়। দেখার মতো সাইজের রুটি হয়েছে। একদম ছেঁড়া কাথার মতো। ঝড় হেসে বললো, “এটাতে শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা যাবে তো!”
ফুলের বড় অভিমান। বললো, যাও তো। খাবই না আজ কিছু। ঝড় এখন মান ভাঙাতে ব্যস্ত। আটামাখা হাতে।

ঝড় আর ফুলের বিবাহবার্ষিকী কাল। দুজনেই লুকিয়ে দুটো কেক অর্ডার করেছে। বেশির মধ্যে ঝড় ফুল আর বেলুন অর্ডার করেছে। আর মনে মনে ঠিক করেছে একটা রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে। না সস্তা।না দামি। হৃদয়টা ভালোবাসায় টইটুম্বুর হলেও পকেটটা অতটা থৈথৈ না। ওটা আধো ভরা, আধো খালিই থাকে।

বিজ্ঞাপন

রাত তিনটা। কয়লা আর বাদাম খুব বেশি ডাকছে। কান্নার মতো সুরে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে ঝড়কে জড়িয়ে ধরে ফুল। “ওরা এভাবে কাঁদছে কেন ঝড়? কুকুর কাঁদলে নাকি বিপদ হয়?” ঝড় ফুলের মাথায় হাত বুলিয়ে হাসে। শুধু হাসে। এই হাসির অর্থ আজও বোঝে না ফুল। শুধু ঘুমানোর আগে কানে কানে বলে, “আমার মতো মানুষকে এক বছর সহ্য করলে কিভাবে?”

ঝড়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুল। কেন জানি চোখ ভেঙে জল নামছে। বাইরে কেঁদেই চলেছে কয়লা আর বাদাম। ওদের কান্নাতেও কি অশ্রু থাকে?

খুব ভোরে দুজন হাঁটতে বের হলো। বিয়ের বর্ষপুর্তিতেই অর্থাৎ আজই এ অভ্যাসের শুরু করেছে ওরা। গলিতে কোথাও কয়লা বা বাদামের দেখা মিললো না। ফুল মনে মনে একটু খুশিই হলো। হেঁটে ফেরার পথেও ওরা নেই। ঝড় একটু উদ্বিগ্ন।

সন্ধ্যায় কেক, ফুল আর সাথে অনেক কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে বানানো আংটি নিয়ে ফিরছিলো ঝড়। গলির মুখেই দেখে কয়লা আর বাদাম লেজ নাড়ছে। ঝড় মুখ দিয়ে আদর করে ডাকার শব্দ করতেই দৌঁড়ে এগিয়ে এল ওরা। গলিটা নির্জন। অন্ধকারও বটে। কত জায়গায় যে বলেছে ঝড় লাইটের জন্য! কাজ হয়নি।

কয়লা আর বাদাম আসার আগেই পথরোধ করে দাঁড়ালো অন্য কেউ। মুখটা অচেনা। বললো, ” এই কুত্তার বাচ্চা, আংটিটা দে”
– কে আপনি?আংটি কেন দেব?
– আমি তোর বাপ। আংটি দে নাইলে ছুড়ি বসামু।
আংটি দেয় না ঝড়। ছিনতাইকারি তার কথা রাখে। পেট বরাবর ছুড়িও চালায়। আংটিটাও ছিনিয়ে নেয়। মাটিতে লুটায় ঝড়। প্রচুর রক্ত ঝরছে। ছিনতাইকারীও মাটিতে। কয়লা আর বাদাম কামড়ে ধরেছে ছিনতাইকারীর হাত ও পা।ছিনতাইকারী আবার ছুড়ি চালায়। কয়লার পেট বরাবর। ঝড়ের পাশেই পড়ে থাকে কয়লা।

বেঁচে যায় বাদাম। পাগলের মতো ছুটতে থাকে বাদাম। ফুলদের বাসার সামনে এসে করুণ সুরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কে জানে ফুলের কানে কিভাবে পৌঁছায় এ ডাক! আর তো কোন ফ্ল্যাট থেকে কেউ নামেনি। ফুল নিচে নেমেই দেখে বাদাম চিৎকার করে কাঁদছে। চোখে জল। ফুলের কামিজের কোণা মুখে কামড়ে ওকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। ফুল বাধা দেয় না। সম্মহিতের মতো চলতে থাকে বাদামের সাথে।

এত ভিড় কেন গলির মুখে? ঝড়ের পাঞ্জাবি? ঝড়? আংটির খোলা প্যাকেট? রক্তমাখা ফুলের তোড়া? কয়লা? গগনবিদারী চিৎকার করে কাঁদতে চায় ফুল। জ্ঞান হারায়।

সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। চোখের জল সামলে উঠেছে ফুল। মনটা মরে গেছে। সেও মরে যেত।স্বেচ্ছায়। কিন্তু, বাধ সাধলো নিয়তি। কাল বিকেলে জানতে পেরেছে, সে প্রেগনেন্ট। তার শরীরের মাঝে নতুন করে জন্ম নিচ্ছে ঝড়। এ চিহ্ন রক্ষা করতেই হবে যে কোনো মূল্যে।

ফুলের মতোই একা হয়ে গেছে বাদামটা। এখন ফুল রোজ একটা করে পাউরুটি কিনে বাদামকে দেয়। কখনো খায়। কখনো খায় না।সারাদিন গলির ওই কোনাটায় বসে থাকে। কাঁদে। ঠিক ফুলের মতোই।

রাত তিনটা। আজ ভ্যালেন্টাইন’স ডে। ঝড়ের ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদছে ফুল। বাইরে চিৎকার করে কাঁদছে বাদামও।

বাদামের চিৎকার করে কান্না সবাই শোনে। বোঝে না কেউ। ফুলের কান্না সবাই বোঝে। শুনতে পায় না কেউ।

ভালোবাসা। ভালোবাসা।

বিজ্ঞাপন