চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভালোবাসা দিবসের বিষাদ গল্পটি

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে কেন বেছে নেয়া হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে এখনও জানা যায়নি। শত শতাব্দী ধরে পালন করা এই উৎসবের বিষয়ে কোন নথি বা দলিলপত্রও পাওয়া যায় না। এমনকি সাহিত্যেও ভালোবাসা দিবসের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য কোন উল্লেখ নেই। মূলত কিছু উপকথার ভিত্তিতেই বর্তমানে সারা বিশ্বে পালন করা হয় এই দিবসটি।

মূলত প্রাচীন খ্রিস্টান ও রোমান ঐতিহ্যের ভিত্তিতে আধুনিক সেন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবস পালন করা হয়ে থাকে। একটি উপকথায় আছে, প্রতিবছর ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রাচীন রোমানরা লুপেরক্যালিস বা লুপেরক্যালিয়া নামে নবান্ন উৎসব উদযাপন করতো। কিন্তু ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্ম প্রসারের সাথে সাথে পৌত্তলিক উৎসবগুলোকে খ্রিস্টান প্রচারক শহীদদের নামে নামকরন করতে থাকে। ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে পোপ গ্যালাসিআস ‘লুপেরক্যালিয়াকে’ ৩য় শতাব্দীতে রোমান শহীদ সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে নামকরণ করে একে খ্রিস্টান উৎসবে পরিনত করেন। একই সঙ্গে আগে যেদিনে উৎসবটি পালন করা হতো তার একদিন আগেই অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারি এই উৎসব উদযাপনের ঘোষণা দেয়া হয়। এই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরনেই আধুনিক ভ্যালেন্টাইন দিবস পালন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে, ইতিহাসে তিনজন খ্রিস্টান সাধুর নাম পাওয়া যায় যাদের নাম ছিল ভ্যালেন্টাইন। এদের মধ্যে একজন রোমের ধর্মপ্রচারক ছিলেন, একজন ছিলেন টিরনি’র বিশপ। তবে তৃতীয় জনের বিষয়ে তেমন কিছু জানা যায় না, শুধু জানা গেছে তিনি আফ্রিকাঞ্চলের ছিলেন। তবে অবাক করা বিষয় এই তিনজনের শহীদ হবার দিনই ছিলো ১৪ ফেব্রুয়ারি।

এই হিসেবে বলা যায়, তিনজন ভ্যালেন্টাইনের স্মরণে দিবসটি পালন করার আগে থেকেই পোপ গ্যালাসিআস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে উৎসবের দিন হিসেবে পালনের আহবান জানান।

ভ্যালেন্টাইনস ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নিয়ে আরো দুটি ভিন্ন ভিন্ন উপকথা প্রচলিত আছে। এর একটি প্রটেস্টান্ট ও অন্যটি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের মত। তবে উভয় মতেই বলা হয়েছে, ২৭০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ক্লডিয়াস (২য়) তার সৈন্য বাহিনীর সদস্যদের বিয়ে নিষিদ্ধ করেন তখন বিশোপ সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ঐসব সৈন্যদের গোপনে বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। সম্রাট ক্লডিয়াস (২য়)র সময়টি ছিল রোম সাম্রাজ্যের পড়ন্ত বেলা। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার জন্য সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিশৃংঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তখন শিক্ষার মান পড়ে যায়, কর বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাও ছিল খুবই নাজুক। এই সময় উত্তর-পূর্ব ইউরোপ ও এশিয়ার শক্তিশালী বাহিনী গল, হুন, তার্কি এবং মোঙ্গল বাহিনীর মতো বহিঃশত্রুদের দ্বারাও রোম বারবার আক্রামণাত্মক হচ্ছিল। আভ্যন্তরীন কোন্দল ও বাইরের আক্রমণের কারনে সম্রাজ্যের পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য বিশাল সৈন্য বাহিনীর প্রয়োজন হয়েছিল। ক্লডিয়াস (২য়) সম্রাট হবার পর উপলব্ধি করলেন, পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ট থাকার কারনে কোন বিবাহিত ব্যক্তিই ভালো সৈনিক হতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিয়ে পুরুষকে দুর্বল করে দেয়। তাই সৈনিকের মান বৃদ্ধির জন্য তিনি তাদের বিয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন।

সম্রাজ্য জুড়ে এতো বিশৃঙ্খলার মধ্যে বিয়ের উপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা ছিল রোমানদের জন্য একটি বড় আঘাত। কিন্তু শক্তিমান সম্রাটের বিরুদ্ধে তখন কেউই প্রতিবাদ করতে সাহস করেনি। এই সময়ই বিশোপ ভ্যালেন্টাইন এই অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি লক্ষ্য করলেন, তাঁর চারপাশে অনেক তরুণ-তরুণী একদিন তারা বিয়ে করতে পারবে এই আশা নিয়ে দিনযাপন করছে। তখন তিনি সম্রাটের জারি করা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে তাদের লুকিয়ে বিয়ে দেয়ার মনস্থির করেন। যখনই কোন প্রেমিক যুগল নিজেরা বিয়ে করবে বলে মনস্থির করতো তারা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের সাথে একটি গোপন স্থানে চলে যেত এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো। এভাবে গোপনে তিনি প্রচুর বিয়ের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু গোপন বিষয়টি বেশিদিন আর গোপন রইলো না। সম্রাটের কানে যুগলদের এই বন্ধুর নামটি যাবার পরপরই তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

কারারুদ্ধ অবস্থায় যখন তিনি ফাঁসির জন্য অপেক্ষা করছিলেন সেই সময় তিনি তৎকালীন জেলার অ্যাসটেরিয়াসের দৃষ্টিতে পরেন। উপকথায় বর্নিত আছে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের কিছু দৈব ক্ষমতা ছিল যা দিয়ে তিনি মানুষের নিরাময় করতে পারতেন। অ্যাসটেরিয়াসের একটি অন্ধ মেয়ে ছিল। যখন তিনি পাদ্রীর এই ক্ষমতার কথা জানতে পারেন তিনি তাকে অনুরোধ করলেন তার কন্যার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। ক্যাথলিক উপকথায় আছে পাদ্রী বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে মেয়েটির চোখ ভালো করে দেন। তবে প্রোটেস্ট্যান্ট বর্ণনায় এই বিষয়টির কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না।

এই ঘটনার পর ক্লডিয়াস (২য়) সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের সাথে দেখা করে তাকে নিজের দোষ স্বীকার করে নেয়ার আহবান জানান। এমনকি তাকে রোমান দেবতার সমতুল্য ঘোষণা দেয়ারও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সম্রাটের বিয়ে নিষেধাজ্ঞায় পাদ্রী ঘোরবিরোধী ছিলেন বলে সম্রাটের সকল প্রস্তাবই তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও পাদ্রী ভ্যালেন্টাইন জানতেন, তার এই প্রত্যাখ্যানের অর্থ হলো নিশ্চিত মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া। স্বভাবতই সম্রাট পাদ্রীর উপর ক্ষিপ্ত হন এবং তার ফাঁসিও কার্যকর করা হয়।

ইতোমধ্যে অ্যাসটেরিয়াসের মেয়ের সাথে সাধু ভ্যালেন্টাইনের একটি চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। মেয়েটি যখন তার দয়ালু এই বন্ধুর এমন পরিণতির কথা জানতে পারল তখন মানসিকভাবে বেশ ভেঙে পড়ল। এই সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন জেলারের কাছ থেকে কলম ও কাগজ চেয়ে নিয়ে মেয়েটিকে একটি বিদায়ী পত্র লেখেন ‘তোমার ভ্যালেন্টাইনের কাছ থেকে’ শিরোনামে। এই শিরোনামটিই প্রজন্মাত্মরে ভালোবাসার প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে। আরেকটি উপকথায় আছে, ভ্যালেন্টাইন অন্ধ এই মেয়েটির প্রেমমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।

উপকথায় যাই থাকুক না কেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের কাহিনীটি ভালোবাসায় আবৃত্ত ছিল। এই ভালোবাসা দিবসের অধিকাংশ গল্প-কাহিনী খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভুক্তেরও বলা যায়। ধারণা করা হয়, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল ২৭০ খ্রিস্টাব্দের, ১৪ ফেব্রুয়ারি।

এভাবেই ১৪ ফেব্রুয়ারি সকল প্রেমিক যুগলের ভালোবাসার দিন হিসেবে পরিণত হয়েছে এবং সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ভালোবাসার প্রতীক হয়ে আছেন যুগ যুগ ধরে। শুভ ভালোবাসা দিবস।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)