চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভারতে সংখ্যাগুরু আধিপত্যবাদ এবং দক্ষিণ এশিয়া

গত ৫ আগস্ট অযোধ্যায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তূপের উপর রামমন্দিরের ভিতপুজো করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই ঘটনাটিকে উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার আবর্তকে অতিক্রম করে ভারতের সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদের পর্যায়ে প্রবেশের কাল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।ভারত যেভাবে সংখ্যাগুরুর সাম্প্রদায়িকতাকে, সংখ্যাগুরুর আধিপত্যবাদে রূপান্তরিত করেছে, তার বিষময় ফল যে কেবল ভারতকে ভোগ করতে হবে তা নয়। এই অন্ধকারের আবাহন সামগ্রিকভাবে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি বিঘ্নিত করবে। ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশকে বিনষ্ট করে সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু, উভয় সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদকে শক্তিশালী করবে। গোটা উপমহাদেশের গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকেও প্রবল সঙ্কটের ভিতরে ফেলে দেবে।

হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে দেশভাগের পর থেকেই তৎপর।ধর্মনিরপেক্ষ ভারত হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের চক্ষুশূল। আজকের বিজেপির মূল মস্তিষ্ক আরএসএস, ‘৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতাকে স্বাগত জানায়নি। তাদের সেই সময়ের রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দু মহাসভা চেয়েছিল পাকিস্তানের আদলে ভারত ও ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র হোক। তারা চেয়েছিল মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের পাল্টা হিসেবে ভারতও হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার পীঠস্থান হিসেবে হিন্দু রাষ্ট্র হোক। এই লক্ষ্যে আরএসএস সহ গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবির কখনোই ভারতের তিরঙ্গা পতাকাকে মর্যাদা দেয়নি। দীর্ঘদিন আরএসএসের কোনো অফিসেই স্বাধীন ভারতের তিরঙ্গা পতাকা উত্তোলিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের নির্বিচার হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন বলে এই আরএসএসের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীকে। পাকিস্তানকে ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন গান্ধীজী। তাই তাকে আর একদিনও বাঁচতে দেওয়া রাজনৈতিক হিন্দুদের স্বার্থে উচিত নয় মনে করেই গুলি করে তাকে হত্যা করে আরএসএসের ঘরের লোক নাথুরাম গডসে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের জাতীয় আন্দোলনের সময়কালেই এই আরএসএসের ভয়ঙ্কর চরিত্র অনেকের থেকে বেশি বুঝেছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। গান্ধীজী তার সন্তসুলভ অভিব্যক্তিতে সঙ্ঘ সম্পর্কে কিছুটা বাস্তবের বাইরে গিয়ে মন্তব্য করলেও (To Members of the RSS -Harijan. 28th September .1947) এই সংগঠনটি প্রসঙ্গে পণ্ডিত নেহরুর কখনোই ইতিবাচক কোনোরকম ধারণা ছিল না।

দেশভাগের সময়কালে দিল্লি ও সন্নিহিত এলাকাতে ভয়াবহ মুসলমান হত্যা সম্পর্কে নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে বলেছিলেন; এই বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, দিল্লিতে তো অবশ্যই, এমনকি দেশের আর যেসব জায়গাতে গণ্ডগোল হচ্ছে, সেইসব গোলমালের পিছনে আরএসএসের একটা বড় ভূমিকা আছে। অমৃতসরের ঘটনাক্রমে থেকে এটা খুব পরিষ্কার যে, যাবতীয় গোলমালের পিছনে আরএসএস।

অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষাতে নেহরু, সর্দার প্যাটেলকে বলেছিলেন: কোনো কোনো হিন্দু ফ্যাসিস্ট এবং শিখ মহল থেকে এই সরকারকে ফেলে দেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এই সরকারের বর্তমান চরিত্রকে তছনছ করে দেওয়ার প্রবল চেষ্টা চলছে। এই লক্ষ্যে একটা সংগঠিত, নির্দিষ্ট প্রয়াস পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। যেটা হচ্ছে, সেটা নিছক সাম্প্রদায়িক কোনো গণ্ডগোল নয়। এই ঘটনাপ্রবাহের পিছনে আরও নিগূঢ় অর্থ রয়েছে। যারা এইসব করছে, তাদের আচরণে যে হিংস্রতা আর ভয়াবহতা ফুটে উঠছে, তাতে এই আশঙ্কা খুব পরিষ্কার।একদম আতঙ্কবাদীদের মতোই এদের সব আচরণগুলি আমরা দেখতে পাচ্ছি (১৯৪৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সর্দার প্যাটেলকে লেখা নেহরুর চিঠি। Sardar Patel’s Correspondence, 1945- 50.Vol-4, Page- 297-299)। পণ্ডিত নেহরু যে কেন আর এস এস, বিজেপি, নরেন্দ্র মোদির কাছে এতোটাই অপছন্দের মানুষ, নেহরুর এই চিঠির পর তা নিশ্চয়ই আর আলাদা করে বলতে হবে না!

দুর্ভাগ্যের বিষয়, স্বাধীন ভারতে জয়প্রকাশ নারায়ণ থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এই আরএসএসকেই নানাভাবে দোসর ঠাওড়েছেন। এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে এই আরএসএস এর ঘরের লোক অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন ইন্দিরা গান্ধীকে ভারতীয় সংসদে দেবী দুর্গা বলে সম্বোধিত করেছিলেন, সেই মৌতাতের আবেশকে শ্রীমতী গান্ধীও অস্বীকার করতে পারেননি। আবার জয়প্রকাশ জরুরি অবস্থার স্রষ্টা ইন্দিরাশাহীর অবসানের লক্ষ্যে এই আরএসএস কে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন পর্যন্ত করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

‘আরএসএস একটি বিপ্লবী সংগঠন। আমাদের দেশের অন্য কোনো সংগঠনের সাথেই সঙ্ঘের কোনও তুলনা চলে না। এই সংগঠনের একাই গোটা সমাজকে ইতিবাচকভাবে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। সঙ্ঘই পারে জাতপাতের অবসান ঘটাতে। গরীবের চোখের জল মোছাবার একমাত্র ক্ষমতা সঙ্ঘেরই আছে। নোতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেশকে নতুনভাবে গড়বার ক্ষেত্রে সঙ্ঘের ভূমিকা এবং অবদান সম্পর্কে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে’– জয়প্রকাশ নারায়ণের পাটনাতে আর এস এসের একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে ‘৭৭ সালের ৩ নভেম্বর জেপি কর্তৃক প্রদত্ত বক্তৃতা।

জয়প্রকাশ নারায়ণই হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি একদা গান্ধী হত্যার দায়ে গঠিত তদন্তে সঙ্ঘকে আওতাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন।

পাটনা, কালিকট ইত্যাদি বহু জায়গায় জরুরি অবস্থার সময়ে ও পরে সঙ্ঘের শিবিরে জেপি’র দেওয়া বক্তৃতা সঙ্ঘকে গান্ধীহত্যার দায় থেকে মুক্ত করে সামাজিক ভাবে জলচল করেছে। এই জলচল করবার খেসারত যে কেবল ভারতের মানুষকে দিতে হচ্ছে, বা আগামী দিনে দিতে হবে, তা-ই নয়। আরএসএস তথা হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরকে জয়প্রকাশ নারায়ণ কর্তৃক সামাজিক অগ্রাধিকার দেওয়ার মাশুল গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষদের দিতে হবে। গান্ধীজীর জীবনদান, হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের প্রতি আপোষহীন মানসিকতা- এইসবের ভিত্তিতে সামাজিক স্তরে খুব সফল হতে না পারলেও, সংসদীয় রাজনীতিতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের ভারতের মাটিতে কোণঠাসা করতে পেরেছিলেন নেহরু। ফলে অবিভক্ত পাকিস্তানে মুসলিম মৌলবাদকে সামরিক বর্মের ভিতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে হয়েছিল। এই গোটা পটভূমিকাটি জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে, নিজের শক্তির এতোটুকু পরিমাপ না করে, কেবলমাত্র আরএসএস এর উপর নির্ভর করে সংগঠিত করে আগামী দিনের ভারতকে, তথা গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে এক ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে গিয়েছেন জয়প্রকাশ নারায়ণ।

জরুরি অবস্থাকে শিখন্ডীর মত দেখে ইন্দিরার সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত লড়াইকে একটা আদর্শগত তকমা দিতে চেয়েছিলেন কি জয়প্রকাশ? সাতের দশকের গোড়ার দিক, মুক্তিযুদ্ধের কাল, এইসব সময়ে তো জয়প্রকাশের সঙ্গে ইন্দিরার সখ্যতা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল। জয়প্রকাশ কি চেয়েছিলেন, গান্ধী উত্তর যুগে আর একজন গান্ধী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে? তাই নিজের সেই ইচ্ছাকে পরিপূর্ণতা দিতে মোরারজি দেশাইদের মত ঘোরতর হিন্দু সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গে নিয়েই নিজের আন্দোলনকে প্রসারিত করেছিলেন জয়প্রকাশ? বামপন্থীরা (সিপিআই কে বামপন্থী হিসেবে ধরা হচ্ছে না। কারণ, তারা তখন ইন্দিরার সঙ্গেই রয়েছে) একক শক্তিতে পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, অন্ধ্র, সিপিআই’র সাথে লড়াই করে অবিভক্ত বিহার (যেখানে জয়প্রকাশের সঙ্গীদের হাত ধরে ভয়ঙ্কর সক্রিয় হয়ে উঠেছিল আরএসএস), অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশ, ত্রিপুরাতে তখন ইন্দিরার আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছে। ভারতে প্রকৃত বামপন্থী শক্তি হিসেবে সিপিআই ( এম) এর এই উঠে আসার সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করবার লক্ষ্যে আরএসএস এর বোড়ের চাল হিসেবে জয়প্রকাশ নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েছিলেন কিনা, সে সম্পর্কেও নির্মোহ গবেষণা দরকার।

ইন্দিরার স্বৈরাচারের পাশাপাশি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাও যে স্বাধীন ভারতের অত্যন্ত বড়ো রকমের বিপদ, সেটা ভারতের রাজনীতিতে সিপিআই ( এম) ব্যতীত অন্য কোনও রাজনৈতিক দল অনুভব করেনি।আবার সেই সিপিআই ( এম) ই ভি পি সিং সরকারের সমর্থনে বিজেপির সাথেই সংসদে ট্রেজারি বেঞ্চে বসতে বাধ্য হয়েছিল। কারণ, সেদিন যদি সি পি আই( এম) ভি পি সিং সরকারকে সমর্থন না জানাতো, তাহলে ভারতের রাজনীতিতে একটা ভয়াবহ অচলাবস্থা তৈরি হতো। তবে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধতার প্রশ্নে বিজেপি এমন কিছু সুযোগ নিজেদের ঘরে তুলেছিল, যেগুলোকে ঠেকাতে যেমন বামপন্থীরা পারেনি, তেমনি ই ভি পি সিংয়ের সমর্থক অকংগ্রেসি, অবাম, অবিজেপি দলগুলি ও পারে নি। এই প্রেক্ষিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই যে, নিজের রাজনৈতিক বনিয়াদ শক্ত করবার লক্ষ্যেই কি ভি পি সিং মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করবার প্রশ্নে, সেদিন অতি তৎপরতা দেখিয়েছিলেন? আর মন্ঠল ঘিরে ভি পি র এই অতি তৎপরতা মোকাবিলা করতেই কি আর এস এস – বিজেপি , তাদের কমন্ডুল রাজনীতিকে এতোটা তীব্র করে তুলতে শুরু করেছিল?

রাজীব বিরোধিতার প্রশ্নে অতীতে ইন্দিরা বিরোধিতা ঘিরে আর এস এসের যে সামাজিক অগ্রাধিকার পাওয়া, তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে কিনা- এই প্রশ্নে বামপন্থীদের মূল্যায়ন কতোটা সঠিক ছিল, ভারতকে তথা গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে আজ রাজনৈতিক হিন্দু আধিপত্যের বিনদের মুখে ঠেলে দেওয়ার প্রশ্নে কতোখানি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছে, কী করেনি- এই প্রশ্নে বিতর্ক থেকেই যাবে। আসলে ভারতের অবিজেপি রাজনৈতিক দলগুলি স্বাধীনতার পর থেকেই কি হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ওয়াকিবহাল ছিল? সিপিআই (এম) তাদের যাবতীয় কর্মসূচিতে আর এস এস – জনসঙ্ঘ- বিজেপির বিপদের কথা বলেছে। কিন্তু সেই বিপদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং সামাজিক লড়াইয়ের প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, স্বৈরাচার বিরোধিতা, হাল আমলের নয়া উদার অর্থনীতির বিরোধিতার মতো কোমর বেঁধে লড়াই কি তারা করেছে? নাকি বিবৃতি, মিছিল আর মিটিংয়ের কথোপথনেই তারা সীমাবদ্ধ থেকেছে? ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদ, জ্যোতি বসু, হরকিষাণ সিং সুরজিৎ দের প্রজন্মের পর হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বামপন্থিদের সর্বাত্মক প্রতিবাদ, প্রতিরোধের জায়গাতে কি কিছুটা শিথিলতা এসেছে? বামপন্থী নেতৃত্বের একটা বড় অংশ সাবেক পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বলে, তাদের কারো কারো ভিতরে কি সুপ্ত মুসলমান বিদ্বেষ থেকে গেছে, যা আজ সংখ্যাগুরুর আধিপত্য বিস্তারের এই নয়া যুগে হিন্দু সাম্প্রদায়িকদেরই কোনো না কোনো রকম ভাবে সাহায্য করছে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)