চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ভাইরাসের কোনো আদর্শ নেই: কন্টেজিয়ন নির্মাতা

সুইডিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক স্টিভেন সোডারবার্গ ২০১১ সালে নির্মাণ করেছিলেন ‘কন্টেজিয়ন’। যে ছবিতে তিনি দেখিয়েছিলেন, চীন থেকে একটি ভয়াবহ এবং রহস্যময় ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কাহিনি। মোটাদাগে সেই ভাইরাস মোকাবেলা করাই ছিলো ছবির মূল গল্প। সেসময় ছবিটি বক্স অফিসে মোটামুটি সফলতা পায়। কিন্তু মুক্তির প্রায় নয় বছর পর সেই ছবিটি এখন সবার মুখে মুখে! কেন? কারণ, এই সময়ের আতঙ্ক মহামারী করোনা ভাইরাস! কন্টেজিয়নের গল্প আর বাস্তবতার সঙ্গে করোনা ভাইরাসের অবিশ্বাস্য মিল!

বর্তমান করোনা ভাইরাসের সঙ্গে ‘কন্টেজিয়ন’-এর এমন সাদৃশ্যের পরও এ নিয়ে কোথাও মুখ খুলেননি সোডারবার্গ। তবে ২০১১ সালে গার্ডিয়ান পত্রিকায় ছবিটি নিয়ে একটি সাক্ষাতকারে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। এই সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক থাকায় কন্টেজিয়ন নির্মাতার সেই সময়ের সাক্ষাৎকারটি চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য থাকলো:

রাজনৈতিক এবং স্যাটায়ারভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ উদার দৃষ্টিভঙ্গির জন্য আমেরিকাতে কি কঠিন ছিল? তারপরেও অবশ্য ‘ওসেন’ বা আপনার ‘কন্টেজিয়ন’ এর মতো চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হল?
‘উদার’ শব্দটি আমেরিকায় একটা নোংরা শব্দ। এটি এক ভয়াবহ মাত্রায় চলে গেছে। এটি বামদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা – তারা এটি হতে দিয়েছে, তাই তারা ডানপন্থীদের মতো হতাশ হয়ে পড়েছে। কীভাবে তারা ‘উদারপন্থী’ শব্দটিকে এতোটা মূল্যহীন হতে দিয়েছে? প্রগতিশীল বা উদার দৃষ্টিভঙ্গি বছরের পর বছর ধরে বিশ্বকে পরিবর্তিত করেছে, তবে এখন এটি এমন একটি পর্যায়ে যা মানুষ এবং তাদের ধারণাগুলির উপর আলকাতরা মেখে দিচ্ছে। এটি একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি। এর অর্থ শিল্পীরা দুর্গন্ধযুক্ত এবং বরখাস্ত হয়ে যাচ্ছে।

শিল্প আদতে সমস্যা সমাধানের ভেতর দিয়েই সৃষ্টি হয়। এর অর্থ আপনাকে উদার মন-মানসিকতার হতে হবে এবং আপনার কল্পনার দ্বার উন্মুক্ত থাকতে হবে। তো চলচ্চিত্র ব্যবসা এখন এই ধরনের মানুষকে টার্গেট করছে এবং এদের চলচ্চিত্র এখন কলঙ্কিত হচ্ছে। এমনকি মুক্ত চিন্তাবিদরাও যদি আসে তারাও যা-তা নিয়ে আসছে।

মার্কিন রাজনীতি কি একই পথে চলে গেছে?
রাজনৈতিক কথোপকথন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ভয় প্রদর্শন, উল্লাস এতোটা তীব্র হওয়া উচিত নয়। সংবিধান যারা বানাতো তারা এটাই চাইত না।

বিজ্ঞাপন

যদিও ‘কন্টেজিয়ন’ ভয়ের উপরই নির্মিত?
হ্যাঁ এই চলচ্চিত্রে মানুষেরা ভয় পাচ্ছিলো একটা ভাইরাসের কিন্তু সেটা প্রতীকী ব্যাপার ছিল না।  আপনার হৃদয়ের ভাইরাসটি হ’ল, আপনি জানেন, এটা কেবল একটি ভাইরাস। কনজিউমারিজম-এর উপর এটি কোনো জম্বি স্যাটায়ার নয়। ‘ইনফার্নো’র মতোনও কিছু না। এটি কেবল একটি মারাত্মক ভাইরাস, এবং ভাইরাসগুলির কোনও আদর্শ নেই। আপনার প্রতিপক্ষ যার সাথে আপনি কথা বলতে পারেন না এবং যার সাথে আপনার কোন যুক্তি তর্ক চলবে না।

আপনার ছবিতে দাঙ্গা এবং লুটপাটের দৃশ্যাবলী রয়েছে যা লন্ডনের দাঙ্গার অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়?
হ্যাঁ, আমি এই সমস্ত সংবাদে দেখেছি এবং এটি আসলেও কাকতালীয় ঘটনা যে এগুলো ‘কন্টেজিয়ন’ এর দৃশ্যের সাথে মিলে গেছে। তবে ঐ ঘটনা ঘটার আগেই আমরা চলচ্চিত্রটি শুট করেছি।

১৯৭০ সালের দুর্যোগ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো কি আপনি পছন্দ করেন? যেমন – ‘দ্য টাওয়ারিং ইনফার্নো’ বা ‘দ্য পসেইডন এডভেঞ্চার’?
ওহ মাই গড, আমার অত্যন্ত পছন্দের চলচ্চিত্র এগুলো। এই চলচ্চিত্রগুলি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ছিল এবং কুশীলবরা তাদের ৩০-৪০ বছর বয়সে তখন। স্টুডিওতে কেউ যাচ্ছিল না: ‘আমরা কীভাবে ১৬ বছর বয়সী মার্কেটকে টার্গেট করবো?’ সেই কালচার তখনও গড়ে উঠেনি, তারা আশঙ্কাহীন ছিল, কীভাবে দর্শকরা নিবে সিনেমাকে এটা নিয়ে তারা ভাবতো না। প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টের ধারেকাছেও তাদের যেতে হয়নি। এরকম ক্লান্তিকর জঞ্জাল যেগুলোকে আমরা এখন প্রতি মুহূর্তে প্রতি মিটিং এ ফেস করতে হয় তা তাদের ছিল না।

সিনেমা বানাতে বানাতে কি আপনি ক্লান্ত?
আমি এখনো ১৭ বছরের মন নিয়ে চলি মাঝে মাঝে। এটা সে সময় যখন আপনি দেখতে পান সবে দুর্দান্ত জিনিস যা আপনি দেখতে চাইছেন। তো সেভাবেই এখনো আমি চলচ্চিত্র নির্মাণ করি। সেই কিশোরের আত্মা বয়ে বেড়াই যে মুক্ত মনে সমস্ত অবলোকন করে আর উড়ে চলে যায় উচ্ছ্বাসে যখনই প্রথমবারের মতো কিছু দেখে। যেমন ‘এ হার্ড ডে’স নাইট’ – এ চলচ্চিত্র যেদিন প্রথম দেখি উড়ে গিয়েছিলাম, উফ, এরকম কিছু এখন খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এটা আমাকে বিরক্তি এনে দেয়। আমি ক্লান্ত না তবে আমি হতাশ।

এটা কি সত্য আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণ ছেড়ে দিতে চাইছেন?
একটা ব্রেক দরকার আমার নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে। ব্যবসায়িক ব্যাপার নয় এটা। আমার মনে হচ্ছে গল্পটা এমনভাবে বলা যেটা অন্য কোন আর্ট ফর্মে অন্য কোনভাবে আর বলা যায় না সেই জিনিসটা কী আমি জানি না – তাই আপাতত আমার একটা ব্রেক নেওয়া উচিৎ।

বিজ্ঞাপন