চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনাল: ইতিহাস-পরিসংখ্যান কী বলছে?

খুব বেশি দেরি নেই। চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়। বাংলাদেশে আসতে থাকা রাতটার ভোরের আভা ফোটার সময় শুরু হবে মহারণ। মাঠে গড়াবে লাতিন সুপার ক্ল্যাসিকো। হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ, কোপা আমেরিকায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনাল।

আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফির অপেক্ষা ঘোচানো, ১৬ বছর ধরে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়খরা কাটানো, ক্যারিয়ারের অন্তিমলগ্নে থাকা লিওনেল মেসির হাতে দেশের জার্সিতে প্রথম কোনো মেজর শিরোপা ওঠা, নেইমারের প্রথম কোপা আমেরিকা জয়, প্রত্যাশা-উপলক্ষের শেষ নেই।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

রোববার বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টায় রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে শিরোপার মঞ্চে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ও স্বাগতিক ব্রাজিলের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা। ৯ বারের কোপা চ্যাম্পিয়ন সেলেসাওদের মুখোমুখি হবে ১৪ বারের শিরোপাধারী আলবিসেলেস্তেরা।

বার্সেলোনার হয়ে সব জিতেছেন, কিন্তু আর্জেন্টিনাকে কোনো ট্রফি এনে দিতে পারেননি। ২০১৪ সালে এই মারাকানাতেই বিশ্বকাপের ফাইনালে ১-০তে জার্মানির বিপক্ষে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়েছে মেসির।

কোপার ফাইনালে গত চার আসরে তৃতীয়বার উঠল আর্জেন্টিনা। গত আসরে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তার আগের দুই আসরে চিলির বিপক্ষে শিরোপা হাতছাড়া করেছেন মেসিরা। এবার আরও কঠিন পরীক্ষা। অন্যদিকে ব্রাজিলের টানা দ্বিতীয় শিরোপার সুযোগ।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে আগে চারবার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। একবার জিতেছে আর্জেন্টিনা, তিনবারই জয় তুলেছে সেলেসাওরা। যার মধ্যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুদেশ তিনবার মুখোমুখি হয়েছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে।

কোপা আমেরিকার ১৯৩৭ আসরের ফাইনালে ব্রাজিলকে টাইব্রেকারে হারিয়ে শিরোপা জেতে আকাশী জার্সিধারীরা। হলুদ সাম্বারা ২০০৪ সালে এবং ২০০৭ সালে মেসির বিপক্ষেই ৩-০ গোলের জয়ে শিরোপা নিয়ে মাঠ ছেড়েছে। সঙ্গে ২০০৫ সালে ফিফা কনফেডারেশন্স কাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারায় ব্রাজিল।

এ তো গেল কোপা ও অন্যান্য ফাইনালে মুখোমুখির হিসাব। এমনিতেই ১৬ বছর ধরে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে জয়হীন আর্জেন্টিনা। এমনকি ২০০৫ সালের কনফেডারেশন্স কাপের ফাইনালের পর আর কোনো ফাইনালে প্রতিপক্ষের জালের দেখা পায়নি আর্জেন্টিনা।

প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ২০০৫ সালের জুনের পর ব্রাজিলের বিপক্ষে জয় নেই আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারের সেই ম্যাচে বুয়েন্স আয়ার্সে হুয়ান রিকেলমের নৈপুণ্যে ৩-১ গোলে জিতেছিল আলবিসেলেস্তেরা। তারপর কেটে গেছে ১৬ বছর। সেসময় কেবল প্রীতি ম্যাচেই কিছু জয় মিলেছে।

দুদল এপর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে ১০৭ বার। জয়ের পাল্লাটা ব্রাজিলের দিকেই ভারি, তাদের ৪২ জয়ের বিপরীতে আর্জেন্টিনার জয় ৪০টি, ২৫ ম্যাচে শেষ হয়েছে ড্রয়ে। ব্রাজিলের জালে এপর্যন্ত ১৬১ বার জাল জড়িয়েছে আর্জেন্টিনা, সেলেসাওরা পাল্টা জড়িয়েছে ১৭৭ গোল।

বিশ্বকাপে ৪ বার মুখোমুখি হয়েছে দুদেশ, আর্জেন্টিনা জিতেছে ১ বার, ব্রাজিল ২ বার ও একটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। কনফেডারেশন্স কাপে একবার মুখোমুখি হয়ে একবারই জিতেছে ব্রাজিল।

কোপা আমেরিকায় সর্বোচ্চ ৩৩ বার মুখোমুখি হয়েছে দুদেশ, আর্জেন্টিনার ১৫ জয়ের পিঠে ব্রাজিলের জয় ১০টি, ৮ ম্যাচে হয়েছে ড্র। বিশ্বকাপ কোয়ালিফায়ারে ৮ বার মুখোমুখি হয়ে আর্জেন্টিনার জয় ২টি, ব্রাজিলের জয় ৪টি, ২ ম্যাচে হয়েছে ড্র।

বিজ্ঞাপন

এর বাইরে রোকা কাপে ২১ বার লড়ে আর্জেন্টিনার ৯ জয়ের পিঠে ব্রাজিলেরও সমান জয়, ৩ ম্যাচ হয়েছে ড্রয়ে সমাপ্তি। রোকায় ৮ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল, ৪ বার আর্জেন্টিনা। বাকি ম্যাচগুলো প্রীতি ম্যাচ ও অন্যান্য টুর্নামেন্টে লড়েছে দুদল।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ট্রফির সংখ্যাটাও কাছাকাছি। ব্রাজিল জিতেছে ২০ আন্তর্জাতিক ট্রফি, আর্জেন্টিনার ১৯টি। ব্রাজিল ৫ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, কনফেডারেশন্স কাপ জিতেছে ৪ বার, কোপা আমেরিকা ৯ বার, প্যানামেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে ২ বার।

আর্জেন্টিনা সেখানে ২ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, কনফেডারেশন্স কাপ জিতেছে ১ বার, কোপা আমেরিকা ১৪ বার, প্যানামেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছে ১ বার ও আর্তেমিও ফ্রাঞ্চি ট্রফি জিতেছে ১বার।

চলতি আসরে সর্বোচ্চ ৪ গোল মেসির। নেইমার ও লুকাস পাকুয়েতার পাশে দুটি করে গোল। সঙ্গে সতীর্থদের দিয়ে ৫ গোল করিয়েছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফাইনালে আলাদা করে চোখ থাকবে দুই বন্ধু মেসি-নেইমারের দিকে। দুজনে আগে বড় ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছেন কেবল ক্লাব প্রতিপক্ষ হয়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে মেসির বার্সেলোনার বিপক্ষে খেলেছেন পিএসজির নেইমার। আর ১০ বছর আগে খেলেছেন ক্লাব বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ হয়ে, তখন ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসের ছিলেন নেইমার। পেপ গার্দিওলার সেই সর্বজয়ী বার্সা ৪-০ গোলে হারিয়েছিল নেইমারের কোপা লিবার্তাদোরেস জয়ী সান্তোসকে।

আন্তর্জাতিক ম্যাচে বেশকবার মুখোমুখি হয়েছেন মেসি ও নেইমার। ২০১০ সালে প্রথমবার মুখোমুখি হয়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে জিতিয়েছিলেন মেসি, সেটা ছিল নেইমারের ব্রাজিলের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ।

২০১২ সালে আরেক প্রীতি ম্যাচে নেইমারের ব্রাজিলের বিপক্ষে মেসির আর্জেন্টিনা জিতেছিল ৪-৩ গোলের রোমাঞ্চে, হ্যাটট্রিক করেছিলেন মেসি। বন্ধু মেসির বিপক্ষে ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের প্রথম জয় ২০১৪ সালে, সেটিও প্রীতি ম্যাচ ছিল, দুঙ্গার ব্রাজিলের বিপক্ষে হারে আর্জেন্টিনা।

দুই বন্ধুর শেষ দেখা হয়েছে ২০১৬ সালে, বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার ম্যাচে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথম গোলের দেখা পান নেইমার, ৩-০ গোলে জেতে ব্রাজিল।

খেলোয়াড়দের পাশাপাশি দুই কোচ টিটে ও লিওনেল স্কালোনির দিকেও নজর থাকবে সমানভাবে। ৬০ বছর বয়সী ব্রাজিল কোচ একটি কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে বেশ এগিয়ে আছেন।

পাঁচ বছর আগে ব্রাজিলের দায়িত্ব নিয়ে টিটে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সেলেসাওদের ৬০ ম্যাচে খেলিয়ে ৪৫ জয় এনে দিয়েছেন, সেখানে ১১ ড্রয়ের পিঠে হার ৫ ম্যাচে। সবশেষ ১৩ ম্যাচে অপরাজিত ব্রাজিল, ১২ জয় ও ১ ড্র নিয়ে। ব্রাজিলকে সবশেষ হারিয়েছিল আর্জেন্টিনাই, ২০১৯ সালে প্রীতি ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে, আর্জেন্টিনার কোচ তখন এই স্কালোনিই। ব্রাজিলের কোচ হিসেবে কোপায় দুই আসর মিলিয়ে অপরাজিত আছেন টিটে, পথে ১২ ম্যাচে ৯ জয় নেইমারদের।

অন্যদিকে স্কালোনি, আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নিয়ে ৩৩ ম্যাচে ১৯ জয়ের পিঠে ১০ ড্র ও ৪ হার দেখেছেন। আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসে টানা অপরাজিত থাকার রেকর্ডে দুইয়ে আছেন তিনি। স্কালোনির আর্জেন্টিনাকে আবার সবশেষ হারিয়েছিল ব্রাজিলই, ২০১৯ কোপার সেমিতে, ২-০ গোলে। কোপায় ১২ ম্যাচে ৭ জয়, ৩ ড্র ও ২ হার দেখেছেন স্কালোনি।

মুখোমুখি দেখায় অবশ্য টিটে এগিয়ে স্কালোনির চেয়ে। ৩ ম্যাচে ২ জয় ব্রাজিলের, আর্জেন্টিনার জয় একটি। সেই ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ রোববার সকালে।