চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিদ্যুতে ঋণ!

বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি বা রিজার্ভ থেকে ঋণ চায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তারা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এতে এখনও সম্মতি দেয়নি। বিদ্যুৎ উদ্যোক্তরা বলছেন, এভাবে ঋণ দিলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা হবে বিপদজনক।

বিজ্ঞাপন

বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি থেকে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রর জন্য ঋণ পেতে ইতিমধ্যে আবেদন করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপপা)। এভাবে ঋণ দেয়া যায় কিনা তা খতিয়ে দেখতে কমিটি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা সঞ্চিতি থেকে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। শুধু সরকারি প্রকল্পে বিনিয়োগ নিয়ে পর্যালোচনা চলছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মো. হুমায়ুন কবিরকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি ব্যবহারের বিষয়ে পর্যালোচনা করবে। এই অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি এবং সুবিধা উভয় দেখবে। একই সাথে অন্য দেশের ব্যবহার পর্যালোচনা করে সুপারিশ করবে।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি থেকে সরকারি প্রকল্পে ঋণ দেয়া যায় কিনা তা বিশ্লেষণ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এর আগে বলেছিলেন, আগামী বাজেটের আগেই এবিষয়ে চূড়ান্ত সিন্ধান্ত নেয়া হবে।

সরকারি প্রকল্পে ঋণ দেয়ার উদ্যোগের মধ্যেই বেসরকারি উদ্যোক্তারাও এই ঋণ নিতে আবেদন করেছে। স্থাপন করা হয়েছে এমন কেন্দ্রর জন্য যে বিদেশি ঋণ নিয়েছে তাও শোধ করতে চান সঞ্চিতির ঋণে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, যে নীতিমালা করা হচ্ছে সেখানে শুধু সরকারি প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি থেকে ঋণ দেয়ার বিষয় আছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার বিষয় নেই।

বিপপা এই ঋণ পাওয়ার জন্য বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছে। আবেদনে বলা হয়েছে, রিজার্ভ থেকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের অবকাঠামো নির্মাণে ঋণ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এমন ঋণ পেতে বিদ্যুৎখাত অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। কারণ এই খাতের সব প্রকল্প সরকারি জামিনদারের নিশ্চয়তা পায়। এ খাতের আয় বৈদেশিক মুদ্রায় হয়। আবার বিদেশ থেকে ঋণও নেয়। বর্তমানে প্রায় তিন থেকে চারশ’ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ আছে। আগামি কয়েক বছরে আরও প্রায় তিনশ’ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণের বিনিয়োগ হবে এই খাতে। রিজার্ভ থেকে ঋণ পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতির অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ঠ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঞ্চিতির অনেকটাই অলস পড়ে থাকে। পাঁচ-ছয় মাসের আমদানি খরচ মেটানোর অর্থ রেখে সরকার চাইলে বাকিটা উন্নয়ন কাজে খরচ করতে পারে। এই অর্থ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। কোনোভাবেই যাতে অপচয় না হয়, তা দেখেই প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে। এজন্য এমন প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে, যার সুশাসন সর্বোচ্চ মাত্রায় নিশ্চিত হবে এবং নিশ্চিতভাবেই মুনাফা আসবে। এই অর্থ ফেরত পাওয়াটা যে কোনোভাবেই হোক, নিশ্চিত করতে হবে। ৩৫/৩৬ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ খুব বেশি নয়। এখন আমদানি খাতে কম খরচ হচ্ছে ঠিক। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, তখন এই রিজার্ভ খুবই মূল্যবান হয়ে উঠবে।

বিজ্ঞাপন

রিজার্ভ থেকে ঋণ নিতে এককভাবে আবেদন করেছে ওরিয়ন গ্রুপ। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করার জন্য অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৯০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা সাত হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে ওরিয়ন গ্রুপ। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে এটাই ছিল রিজার্ভ থেকে প্রথম ঋণ আবেদন।

তবে এই ঋণের বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র। ওরিয়ন পাওয়ার প্ল্যান্ট-২ ঢাকা লিমিটেড নামক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মেঘনা নদীর তীরে স্থাপন করার কথা। এতে খরচ ধরা হয়েছে ১১৩ কোটি ডলার বা ৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা। মোট খরচের ৮০ শতাংশ ঋণ চায় ওরিয়ন।

বিপপার সভাপতি ইমরান করিম বলেন, খুব সর্তকতার সাথে এবিষয়ে সিন্ধান্ত নিতে হবে। সব বিষয় পর্যালোচনা করতে হবে। রিজার্ভের অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বন্ড বা জামিনদার হয়ে বা অন্য উপায়ে যে বিনিয়োগ করে তাতে এক শতাংশের বেশি আয় হয় না। কিন্তু যদি দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে ঋণ দেয় তবে এক শতাংশের বেশি সুদ নিতে পারবে। এতে সরকারের আয় বেশি হবে। অন্যদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে সবমিলে প্রায় ৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। এই ঋণের অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় শোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যদি ৬ শতাংশের কম সুদে ঋণ পাওয়া যায় তবে উভয়ের লাভ।

বিপপা সভাপতি বলেন, সরকার রিজার্ভ থেকে ঋণ দিতে চায়। এই ঋণে আমরা অগ্রাধিকার চাই। কারণ, বিদ্যুৎখাত অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, সঞ্চিতির অর্থ ব্যবহার করতে গেলে সরকারকে ঋণের নিশ্চয়তা দানকারী হতে হবে। তবে এখনই সরকারি প্রকল্পের বাইরে এই অর্থ ব্যবহারের পক্ষে না অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এর আগে ২০১৫ সালে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের জন্য পরামর্শ চেয়ে করা কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, শুধু সরকারের বড় বড় প্রকল্পে বা পাবলিক প্রাাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প বাস্তবায়নে এ তহবিল থেকে অর্থায়ন করা যেতে পারে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ দীর্ঘ হতে পারবে না। পুরো সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে মুনাফা পাওয়ার বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

এখন বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি ৩৫ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এই অর্থে বাংলাদেশের প্রায় এক বছরের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

দেশে বৈদেশিক মুদ্রা থেকে ঋণ বা বিনিয়োগ করার কোনো নীতি নেই। শুধু রিজার্ভের অর্থ কোথায়, কীভাবে অন্তর্বতীকালীন বিনিয়োগ করে রাখা হবে, সেই ব্যাপারে একটি সংক্ষিপ্ত নীতিমালা আছে। এর আলোকে রিজার্ভের অর্থ বিভিন্ন হারে বিভিন্ন দেশের মুদ্রায় বা সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করে রাখা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয় ডলারে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, রিজার্ভ থেকে সরাসরি ঋণ দেয়া ঠিক হবে না। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঝুঁঁকিতে পড়বে। রিজার্ভ রাখাই হয় সংকট মোকাবেলার জন্য। কম সুদে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার নানা সুযোগ আছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ নিলেও এর বিপরীতে চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দিচ্ছে। এটিই আন্তর্জাতিক রীতি। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে অর্থ বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রায় বিভিন্ন তহবিল আছে। এগুলো থেকে সরাসরি ঋণ দেয়া হয়। এসব ঋণের সুদের হার দেড় থেকে ৩ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ), পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে ২০ কোটি ডলার তহবিল এবং ২০ কোটি ইউরো তহবিল। এ ছাড়া শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতে আরও একটি তহবিল আছে।

সাধারণত বড় ধরনের ঋণপত্র বা এলসি’র দেনা শোধ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেয়।