চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বেশি দামে আলু বেচতে ব্যবসায়ীদের নানা বাহানা

সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে চান তারা

নানা বাহানায় বেঁধে দেওয়া দামে  আলু বিক্রি করতে নারাজ ব্যবসায়ীরা। উল্টো ‘যৌক্তিক দাম’ ঠিক করতে সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে চান তারা।

বৃহস্পতিবার কয়েকজন আলু ব্যবসায়ী ও কোল্ডস্টোরেজের মালিক চ্যানেল আই অনলাইনকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা বেঁধে দেয়া দামে আলু বিক্রি করতে পারছে না।

বিজ্ঞাপন

ওই ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার আলুর যে দর বেঁধে দিয়েছে তা এ খাতের ব্যবসায় জড়িত সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনা করে ঘোষণা দেয়া উচিত ছিল। তখন ব্যবসায়ীদেরও কিছু যুক্তিতর্ক, পরামর্শ বা চাওয়া-পাওয়া থাকতো। এতে নতুন দরের নির্দেশনা সব স্তরের ব্যবসায়ীরা পরিপালন করতো স্ব প্রণোদিত হয়ে।

বিজ্ঞাপন

আলুর অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ অক্টোবর ভোক্তা, আড়ত ও কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে আলুর সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দিয়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে চিঠি পাঠানো হয়। প্রায় এক সপ্তাহ পর ১৪ অক্টোবর। বিষয়টি জানাজানি হয়।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর বলছে, ভোক্তা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা, কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ের সর্বোচ্চ ২৩ টাকা এবং আড়তে (পাইকারি) ২৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হবে। এর বাইরে বেশি দামে কেউ বিক্রি করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তবে সরকারের এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না কোনো পর্যায়েই। ফলে বাড়তি দামেই ভোক্তাদের আলু কিনতে হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার খুচরা, পাইকারি ও কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকায়। আর কোল্ডস্টোরেজে বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়।

খুচরা পর্যায়ে এই অস্বাভাবিক দাম দেখে কারওয়ান বাজারে বাজার করতে আসা শামসুল ইসলাম বলেন, শুধু দাম বেঁধে দিলেই কী বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে? নিয়মিত তদারকি করতে হবে। তা নাহলে দাম কমবে না। গরীবের কষ্টও দূর হবে না।

তবে কোল্ডস্টোরেজের মালিকেরা বলছেন, সরকার দাম বেঁধে দেয়ার পর দুদিন ধরে আলু বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ কোল্ডস্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোশারফ হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, দাম বেঁধে দেয়ায় গতকাল থেকে আলু বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। আলুর ক্রেতা আসছে না। সর্বশেষ ৪০ টাকা কেজি আলু বিক্রি হয়েছে।

তিনি বলেন, আলুর দর নির্ধারণ করার আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। এতে একটা যৌক্তিক সমাধান হতো। কিন্তু এটা করা হয়নি।

তবে আলুর বর্তমান দর যে অস্বাভাবিক তা স্বীকার করে এই আলু ব্যবসায়ী বলেন, সরকার যে দাম বেঁধে দিয়েছে সেই দামও যৌক্তিক না। খুচরা পর্যায়ে আলুর কেজি ৪০ টাকা এবং পাইকারিতে ৩৫ টাকা করা উচিত। আর কোল্ডস্টোরেজ পর্যায়ে ৩২ থেকে ৩৩ টাকা করা উচিত।

অতিরিক্ত দাম বাড়ার কারণ হিসেবে মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রতিবছর সেপ্টেম্বরে যে আগাম আলুর চাষ হয় তা ডিসেম্বরে উঠে। কিন্ত অতি বৃষ্টি আর বন্যার কারণে এবার তা হয়নি। এবার তা হবে অক্টোবর-নভেম্বরে ফলে নতুন আলু ডিসেম্বরের বদলে এবার জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে আসবে। অর্থাৎ আলুর মৌসুম দুই মাস পিছিয়েছে। এটাও দাম বাড়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া করোনা সংক্রমণের কারণে এবার ত্রাণ হিসেবে অনেকে চাল-ডালের সাথে আলু বিতরণ করেছে। অন্যদিকে সবজির দাম বেশি থাকায় বাজারেও আলুর পর্যাপ্ত চাহিদা রয়েছে। এসব কারণে দাম এমন অস্বাভাবিক হয়েছে।

অতীতে আলু ব্যবসায়ীরা লোকসান করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন ব্যবসায়ীরা একটু লাভ করছে। কিন্তু গত দুই বছর তারা যে লোকসান করেছে তা কেউ বলে না।

“কিন্তু দেখেন এখন বেশিরভাগ সবজির কেজি একশ টাকার কাছাকাছি। ৬০ টাকার কমে কোনো সবজি নাই। কিন্তু তা নিয়ে কেউ কিছু বলে না। সবাই আলুর দাম নিয়ে ব্যস্ত। ব্যবসা না হলে চাষীরাও আগ্রহ হারাবেন।”

হিমাগারগুলোর মালিকদের এই সভাপতি বলেন, সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ- ৫ জন কোল্ডস্টোরেজের মালিক,  বিভিন্ন জেলার ৫ জন প্রান্তিক আলু চাষী, কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারের ৪/৫ জন আলুর পাইকারি ব্যবসায়ীকে নিয়ে সরকার এক টেবিলে বসুক। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে একটা যৌক্তিক সমাধান বের হয়ে আসবে। সংশ্লিষ্টদের যুক্তি বা পরামর্শ সরকারের কাজে লাগতে পারে। এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিলে সেরা সহজেই সবাই মেনে নিবে। বাজারেও আর হৈ চৈ থাকবে না।

তিনি বলেন, আমাদের প্রায় ৪শ কোল্ডস্টোরেজ রয়েছে। সেগুলোতে গত বছর ৫৫ লাখ টন আলু মজুত ছিল। কিন্তু এবার মজুত ছিল ৪৫ লাখ টন। অর্থাৎ বৃষ্টিতে আবাদ নষ্ট হওয়ায় এবার ১০ লাখ টন আলু কম মজুত রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে।

কারওয়ান বাজারে দুলাল নামের একজন আলুর পাইকারি ব্যবসায়ীও একই রকম কথা বলেছেন। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসে আলুর দর ঠিক করা উচিত ছিল। কী পরিমাণ মজুত আছে, কবে নতুন আলু আসতে পারে এসব বিবচনা করে দাম নির্ধারণ করা দরকার ছিল। এখন হ-য-ব-র-ল হয়ে গেছে। বেশি দামে কিনে বেঁধে দেয়া কম দামে বিক্রি করবো কিভাবে?