চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বেলজিয়ামের হ্যাজার্ড ভ্রাতৃদ্বয়ের গল্প

ফুটবল ইতিহাসে আপন দুই ভাই-এর গল্প উঠলে প্রথমেই বন্দনা করতে হয় ইংল্যান্ডের জ্যাক চার্লটন এবং ববি চার্লটনকে। এই ফুটবল ভ্রাতৃদ্বয় ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই ইতিহাস এখনও উজ্জ্বলতরো হয়ে আছে। এই ভ্রাতৃদ্বয়-এর পরে আরও যারা ফুটবল দুনিয়ায় জোড়া বেধে উজ্জ্বলতা ছড়ান তারা হলেন-জার্মাানির জেরম ও কেভিন ভ্রাতৃদ্বয়।

স্কটল্যান্ডের ফ্র্যাংক- রোনালদ্ ভ্রাতৃদ্বয়, ইতালির ক্যানাভ্যারো-পাওলো ভ্রাতৃদ্বয়, নেদারল্যান্ডের এরউইন কোয়েম্যান-রোনালদ্ ভ্রাতৃদ্বয়। এরকম আরও আছে। তবে নব্বই-এ বিশ্বকাপে একটু বেশি উজ্বলতা ছড়িয়ে ফুটবলমোদীদের নজর কেড়েছিলেন ডেনমার্কের মাইকেল-লাউড্রপ ভ্রাতৃদ্বয়।
বর্তমান সময়ে বিশ্বময় আলোচিত ফুটবল ভ্রাতৃদ্বয় বেলজিয়ামের এডেন হ্যাজার্ড এবং থরগ্যান হ্যাজার্ড।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সম্পর্কসূত্রে আপন দুই ভাই, একই মায়ের পেট থেকেই দুজনের আর্বিভাব। মায়ের নাম কারিন হ্যাজার্ড। বাবাও এক, বাবার নাম থিয়েরি হ্যাজার্ড। এই ভ্রাতৃদ্বয়ের আরও ছোট যে দুই ভাই আছে কাইলিয়ান হ্যাজার্ড এবং এথেন হ্যাজার্ড এ দুজনও ফুটবলার। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো চার ভাই-ই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার পজিশনে খেলে থাকেন। এই চারজনের মা-বাবার কথা না বললেই নয়। মা-বাবাও ফুটবলার ছিলেন। বাবা থিয়েরি হ্যাজার্ড বেলজিয়াম প্রফেশনাল লীগে খেলতেন রক্ষণভাগে। আর মা কারিন প্রমীলা ফুটবলার হিসেবে যথেষ্ট পরিচিত ছিলেন। নিজদেশের প্রথম বিভাগ উইমেন ফুটবলে খেলতেন। বড় ছেলে এডেন হ্যাজার্ড যখন তিন মাসের পেটে তখন তিনি ঘোষণা দিয়ে ফুটবল ছাড়েন, আর মাঠে ফিরেননি। পরবর্তীতে সন্তান ও সংসার নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন।

এডেন হ্যাজার্ড কত বড় মাপের ফুটবলার তা নতুন করে বলা অনর্থক। গত বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে শীর্ষের দিকে নেওয়ার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনবদ্য। তবে এর চেয়ে বড় বিষয় ছিল বিশ্বের ফুটবলমোদীদের হ্নদয় জয় করতে পারা। বিশ্বকাপে ফুটবল সৌন্দর্যকে তিনি প্রষ্ফুটিত করতে পেরেছিলেন আপন দক্ষতায়। বিশেষ করে তাঁর অনবদ্য ড্রিবলিং ফুটবলমোদীদের হ্নদয়কে তুমুল আনন্দে সিক্ত করেছিল। সেই স্মৃতি এখনও সবার কাছে ঝড় তোলে। চলমান ইউরো কাপে এডেন হ্যাজার্ড আগের মতোই স্বরুপে উদ্ভাসিত। এবার ছোট ভাই থরগ্যান হ্যাজার্ডকেও যেনো সাথে রেখেছেন। সেও যাচ্ছে না। ফলে এই ভ্রাতৃদ্ধয় সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

বড় ভাই-এর মতো একই পজিশনে খেলেন থরগ্যান। গত ১৭ জুন তা ফুটবল পারফরমেন্স খাতায় যোগ হয়েছে আরেকটি নতুন দিন। এদিন ডেনমার্কের বিপক্ষে প্রথমেই অসাধারণ এক গোল উপহার দেন তিনি। বেলজিয়াম ও ডেনমার্কের লড়াই-এ শুরুতেই এগিয়ে যায় ডেনমার্ক। কিন্তু ৫৪ মিনিটে এক দর্শনীয় গোল উপহার দিয়ে সমতা ফেরান এডেনের তনয়। থরগ্যান হ্যাজার্ড এর আগে বড় ভাই এর সাথে বেলজিয়ামের পক্ষে একাধিক ম্যাচ খেললেও এবার যেনো তিনি বেশি আলোচনায় উঠে এসেছেন।

থরগ্যান হ্যাজার্ড বর্তমানে জার্মান ক্লাব ব্রুশিয়া ডর্টমুন্ডে পাঁচ বছরের চুক্তিতে খেলছেন। বড় ভাই এর মতো তিনিও অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার-যা আগেই বলেছি। প্রফেশনাল ফুটবলে থরগ্যানের আগমন ২০১০ সালে। ২০১২ সালেই অবশ্য যোগ দেন চেলসিতে। ২০১৩ সালে বেলজিয়াম জাতীয় দলে ডাক পান। ২০১৪ সালের ২৯ মে আমেরিকার সাথে একটি প্রীতি ম্যাচে প্রথম দ্বিতীয়ার্ধে খেলার সুযোগ পান। ২০১৪ বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত হলেও খেলার সুযোগ পান নি। তবে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেই নিজেকে মেলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

এর আগে ১৭ সালের ১০ অক্টোবর জাতীয় দলের হয়ে প্রথম সাইপ্রাসের বিপক্ষে একটি গোল করেন। ২০১৮ বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথম খেলার সুযোগ পান পানামার বিপক্ষে। ১৮ জুন মাত্র সাত মিনিট খেলার সুযোগ পান। কিন্তু সু-সময় আসে দ্রুতই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পুরো ম্যাচ খেলেন তিনি।

হ্যাজার্ড- এর তারকা খ্যাতির বিস্তৃতি আর বাজার দর এখন কতোটা তা বলা অনাবশ্যক। দীর্ঘসময় চেলসি হয়ে এখন রিয়েলমাদ্রিদে আছেন তিনি। প্রফেশনাল ফুটবলে তাঁর সংযুক্তি ছিল ২০০৭ সালে। এরপর ২০১২ সালে বেলজিয়াম ছেড়ে তিনি ইংল্যান্ড ফুটবল লীগে চেলসিতে যোগ দেন। চেলসির পক্ষে আলো ছড়াতে শুরু করেন দ্রুত। তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে ভীষণ সমাদৃত হন। ২০০৮ সালে এডেন হ্যাজার্ড বেলজিয়ামের জাতীয় দলের হয়ে খেলা শুরু করেন। তবে জাতীয় দলের অভিষেক হওয়ার পর গোলের জন্য তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়। প্রথম গোল পান কাজাখাস্তানের বিপক্ষে ২০১১ সালের জুনে। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের লড়াই-এ এডেন হ্যাজার্ড নিজেকে মেলে ধরেন।

ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে ‘এইচ’ গ্রুপের সবকটি খেলায় (রাশিয়া, আলজেরিয়া, দক্ষিন কোরিয়া) জয়লাভ করে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে বেলজিয়াম। দ্বিতীয় রাউন্ডে বেলজিয়াম আমেরিকাকে পরাজিত করে। তবে কোয়াটার ফাইনালে আর্জেন্টিনার মেসির কাছে হার মানতে হয়। তবে আপামর জনগণের কাছে এডেন হ্যাজার্ডের পরিচিতির বিস্তৃত হয় মূলত সর্বশেষ বিশ্বকাপ ফুটবলে। বিশ্বকাপের শুরুতে বেলজিয়ামের শক্তিমত্তা নিয়ে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা উচ্চ ধারণা পোষণ করলেও সেটা আমজনতার কাছে অজ্ঞাতই ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের রঙ্গমঞ্চে যখন এডেন হ্যাজার্ড নামক ফুটবলার রীতিমতো কাঁপাতে শুরু করেন তখন দ্রুত তিনি আলোচ্য হয়ে উঠেন। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে প্রতিটি ম্যাচেই চমৎকার নৈপুন্য প্রদর্শন করে দলকে উচুঁতে নিতে থাকেন।

ফুটবলের বড় সৌন্দর্য হলো ড্রিবলিং। বলতে দ্বিধা নেই গত বিশ্বকাপে সেই নৈপুণ্যে তিনিই ছিলেন ‘রাজার রাজা’। হ্যাজার্ডের অসামান্য নৈপুণ্যে বেলজিয়াম সেমিফাইনালে উঠে। কিন্তু সেমিফাইনাল গিয়ে চলার গতি থমকে যায়। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় স্থান নিয়েই খুশি থাকতে হয়। এক বাক্যে বললে গত বিশ্বকাপ ছিল হ্যাজার্ড ময়। বিশ্বকাপের পর পরই ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রিয়েল মাদ্রিদে তার অভিষেক ঘটে। ২০০৬ সাল থেকে সব মিলিয়ে দেশের পক্ষে হ্যাজার্ডের মোট গোল সংখ্যা ৩২।

আজ ইউরোর দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলায় বেলজিয়ামের প্রতিদ্বন্ধী পর্তুগাল। মানে রোনালদো বনাম হ্যাজার্ড এর মধ্যে এক অনবদ্য লড়াই হবে। নিশ্চিত বেলজিয়ামের পক্ষে এডেন হ্যাজার্ড এবং থরগ্যান হ্যাজাড দুই ভাই-ই আজ থাকবেন মাঠের লড়াই। স্পেনের এস্তাদিও লা কাতুর্জাতে হবে লড়াই। দুই ভাই হয়তো নতুন এক ইতিহাসের সারথী হবেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন