চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বেতন-ভাতা কমানোর উদ্যোগের খবরে ফুঁসে উঠছেন ব্যাংকের কর্মীরা

করোনাভাইরাসের সঙ্কট দেখিয়ে ব্যাংকিং খাতে বেতন-ভাতা কমানো ও ইনক্রিমেন্ট বন্ধের উদ্যোগের খবরে ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তারা বলছেন, কর্মীদের বেতন কমানোর চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে। বরং খেলাপি হয়ে যাওয়া হাজার হাজার কোটি আদায় ও ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

করোনার কারণে ব্যয় কমিয়ে আনতে কর্মীদের বেতন-ভাতা কমানো, ইনক্রিমেন্ট ও ইনসেনটিভ বন্ধসহ বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। সংগঠনটি ৪০ হাজার টাকার বেশি বেতনধারী সব গ্রেডের কর্মকর্তা ও নির্বাহীদের বেতন ১৫ শতাংশ কমানোর ‘বুদ্ধি’ দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

রোববার সংগঠনের সব সদস্য ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এই চিঠির বিষয়টি জানাজানির পর ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। চ্যানেল আই অনলাইনকে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাংক কর্মকর্তারা তাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন।

বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মীরা বলেন, ব্যাংকে সমস্যা কিছু হয়ে থাকলে সেগুলো হচ্ছে ঋণ বিতরণে মালিকদের হস্তক্ষেপ, যোগসাজশের মাধ্যমে এক ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ, পর্যাপ্ত জামানত না থাকা সত্ত্বেও পছন্দের গ্রাহককে ঋণ দিতে বাধ্য করা ইত্যাদি। এসব কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, মালিকদের অনাচারের কারণে বিভিন্ন ব্যাংক সংকটে পড়লেও সব সময় মাশুল গুণতে হয় কর্মীদের। বছরের পর বছর এমন অন্যায্য ও অনৈতিক চর্চা চলছে ব্যাংকগুলোতে। বিএবির চিঠির মধ্য দিয়ে আবারও সেটি প্রমাণিত হলো।

তিনি বলেন, চিঠিতে খেলাপি ঋণ আদায় কিংবা বর্তমানে খেলাপি হওয়া ঠেকাতে করণীয় সম্পর্কে একটি পরামর্শও দেয়া হয়নি। ব্যয়বহুল বিলাসী শাখাগুলোর ব্যয় কমিয়ে কম খরচের ভবনে স্থানান্তরের কথাও বলা হয়নি।

প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের কর্মীদের বেতন কমানোর চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু মালিকেরা যে অবৈধভাবে নানা সুযোগ-সুবিধা নেন, ব্যাংকের টাকা বিলাসী গাড়িতে চড়েন, বিদেশ গিয়ে সবচেয়ে দামী হোটেলে থেকে ব্যাংককে তার বিল পরিশোধে বাধ্য করেন-এসব অনাচার বন্ধ করতে পারবে কি বিএবি?

গত সপ্তাহে সিটি ব্যাংক লিমিটেড তাদের সব কর্মীর বেতন ১৬ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেয়। এছাড়া এবি ব্যাংক লিমিটেডও তাদের কর্মীদের বেতন ৫ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বলে জানা গেছে। এই দুই ব্যাংককে দেখে অন্য ব্যাংকগুলোও বেতনভাতা কাটছাঁটে উৎসাহী হয়ে উঠতে পারে, এমনিতেই এমন আশংকা করছিলেন ব্যাংক কর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে বিএবির চিঠিকে বেতন কমানোর ক্ষেত্রে উস্কানি হিসেবে দেখছেন তারা।

বিএবির চিঠিতে ১৩ দফা পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এসব পরামর্শের মধ্যে রয়েছে-

০১. মাসিক ৪০ হাজার টাকার বেশি গ্রস বেতনধারী কর্মকর্তাদের বেতন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো।

০২. ব্যাংকে সব ধরনের প্রমোশন, ইনক্রিমেন্ট ও ইনসেনটিভ বোনাস বন্ধ রাখা।

০৩. ব্যাংকে চলমান নিয়োগসহ সব ধরনের নিয়োগ বন্ধ রাখা।

বিজ্ঞাপন

০৪. নতুন শাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং ও সাব-ব্রাঞ্চ বন্ধ রাখা।

০৫. সকল প্রকার Fixed Asset কেনা বন্ধ রাখা।

০৬. সব ধরনের স্থানীয় ও বিদেশি প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখা।

০৭. সব বিদেশ ট্যুর বন্ধ রাখা।

০৮. সব ধরনের সিএসআর, অনুদান ও চ্যারিটি বন্ধ রাখা।

০৯. পত্রিকা (প্রিন্ট ও অনলাইন) ও টেলিভিশনে সব ধরনের বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখা।

১০. সকল কাস্টমার গেট টুগেদার বন্ধ রাখা।

১১. অফিসার এক্সিকিউটিভ গেটটুগেদার ও ম্যানেজার কনফারেন্স বন্ধ রাখা।

১২. বড় ধরনের ব্যয়, যেমন-হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ইত্যাদি কেনা সীমিত পর্যায়ে রাখা।

১৩. অন্যান্য ব্যয় সীমিত পর্যায়ে রাখা।

বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং খাত নানা সমস্যার মুখে পড়ায় এসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চিঠিতে বেশ কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে-ব্যাংকের বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, বিনিয়োগের উপর সুদের হার কমে যাওয়া, রিকভারি শূন্য অবস্থায় চলে আসা, ওভারডিউ বাড়তে থাকা, এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট কমে যাওয়া ইত্যাদি।

চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে এপ্রিল ও মে মাসে ব্যাংক কর্মীদের দেয়া প্রণোদনা এবং করোনায় আক্রান্ত ব্যাংক কর্মীদের চিকিৎসার ব্যয়, মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া ইত্যাদি বিষয়কেও ব্যাংকের বর্তমান সংকটের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

চিঠিটি সংগঠনের নিজস্ব লেটারহেড প্যাডে দেওয়া হলেও, পরামর্শগুলো দেয়া হয়েছে সাদা কাগজে। এছাড়া সংগঠনের নির্বাহী কমিটির কোনো বৈঠকের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এসব পরামর্শ দেয়া হয়েছে, না-কি সংগঠনের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার নিজের এখতিয়ার বলে দিয়েছেন, তার কোনো উল্লেখ নেই চিঠিতে। অবশ্য চিঠিতে তার স্বাক্ষর নেই। তবে সংগঠনটির বেতনধারী সেক্রেটারি জেনারেলের সই রয়েছে।