চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বেঁচে থাক আমাদের আড্ডা

আড্ডাকে অন্য কোন শব্দ দিয়েই বোঝানো যায় না! অভিধানে এর অর্থ বলা হয়েছে- ঠিকানা, বাসা, মিলনের স্থান, সাম্প্রদায়িক আখড়া ইত্যাদি। যদি একে সভা বলা হয়, তবু এর আসল অর্থটা অপ্রকাশিতই রয়ে যায়।

ইংরেজিতে যদি পার্টি বলা হয় তবে সবই কেমন যেন হয়ে গেল! ‘আড্ডা’ এই বাংলা শব্দটির আসলে উপযুক্ত কোন সমার্থক শব্দ চোখে পড়ছে না। বরং নানা জায়গায় আড্ডাকে একটু নেতিবাচক ভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। থাক অভিধানের কথা, আমরা তো জেনে গেছি আড্ডা আমাদের এক অফুরান প্রাণ শক্তির উৎস!

বিজ্ঞাপন

আড্ডার ইতিহাস সুপ্রাচীন। সেই মহাভারতের কাল থেকে চলছে। রোমানরা না কি সাংঘাতিক আড্ডাবাজ ছিল। প্রাচীন গ্রীস ও রোমে মূল বাজার এলাকায় ফোরাম বলে একটি জায়গা থাকত। এই ফোরামই ছিল গ্রীক ও রোমানদের মূল আড্ডার জায়গা! প্রতিটি রোমান শহরের মূল কেন্দ্রে একটি করে ফোরাম থাকত।

বাঙালির জীবনের সাথে আড্ডা জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে। বাঙালির এক চলমান সংস্কৃতি হল এই আড্ডা। তবে তা এখনো স্বীকৃত শিল্পকলা নয়। বিশ্ববিখ্যাত বাঙালী চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন অবশ্য চেয়েছেন, আরও অনেক ধরণের মেলার মত আড্ডা মেলাও হোক। ছবির মেলা, বইয়ের মেলা, কবিতার মেলা, বাণিজ্য মেলা, শিক্ষা মেলা- ঠিক তেমনই ‘আড্ডা মেলা’। এ থেকেই জন্ম নিতে পারে ভীষণ ভালো কিছুর। যীশু খৃষ্টের জন্মের চার, পাঁচশ বছর আগে প্লেটো করতেন- অ্যাকাডেমিক, সিনকোজিম, ব্যাংকেটিং, সেও আড্ডার মত করেই হত। প্লেটোর বিখ্যাত ডায়লগ; কেউ প্রশ্ন করছে, কেউ উত্তর দিচ্ছে। তা গিয়ে পৌঁছেছে দার্শনিক স্তরে!

বাঙালি জীবনে, বাংলাদেশে বা পশ্চিম বাংলায়ও জাঁহাবাজ সব আড্ডাবাজ ছিলেন,- বুদ্ধদেব বসু, কমলকুমার মজুমদার, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সত্যজিৎ রায়, কবিতা সিংহ আরও মত!

এই আড্ডায় বসেই সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালির’ ভাবনার সূত্রপাত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডি এল রায়, কাজী নজরুল ইসলাম- এরাও ছিলেন আড্ডাপ্রিয় মানুষ।

ঢাকার বাংলাবাজারে বিউটি বোর্ডিং এ, হাসান হাফিজুর রহমানের সমকাল অফিসে, বা পুরানা পল্টনে কবি শহীদ কাদরীর বাসায় ছিল এই বাংলার সেরা কিছু মানুষের আড্ডা। এসব ছিল মূলত সাহিত্য আড্ডা। এক সময় বাংলা একাডেমীতে রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, ফরহাদ খান, মুহম্মদ নুরুল হুদা, এঁদের প্রত্যেকের রুমে ঘিরে থাকত আড্ডাবাজেরা।

আর শুধু কি বড় বড় লেখক, শিল্পীরই আড্ডা; বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, চায়ের দোকানে আড্ডা, পাড়ায় পাড়ায় রকে (বারান্দা, ব্যাল্কনি) আড্ডা, বাড়িতে আড্ডার ইতিহাস অনেক পুরনো। এসব আড্ডা থেকে মানুষ তার মনের খোরাক পেয়েছে যুগে যুগে। এ যেন এক উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়! বিষয়ের নানা দিক, অভূতপূর্ব সব ব্যাখ্যা, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি- এ সব মিলিয়ে এক অসাধারণ ব্যাপারই বটে!

আড্ডা হতে পারে নানা ধরণের। রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, গানের, কবিতার, সিনেমার- এমনই আরও অনেক কিছুর। যে আড্ডায় যত বহুবর্ণ মানুষ সে আড্ডা তত আকর্ষক। তবে বাস্তবে দেখা যায়, সাধারণত এক ধরণের বিষয়ে আগ্রহীরা এক সাথে বসে আড্ডা দিতে ভালবাসেন। নির্মল আড্ডার কিছু নিয়মও থাকা চাই। যেন সবাই অংশগ্রহণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন শুরুতে। কোন একজন ‘অতি জ্ঞানীর’ এক তরফা বক্তব্য একটি সুন্দর আড্ডার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এমন ক্ষেত্রে নির্দোষ ও গঠনমূলক আড্ডাকে বাঁচাতে হলে কোন একজনকে দায়িত্ব নিয়ে কৌশলে সব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কাউকে না চটিয়ে, সবার কথা বলার মত পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। নইলে আড্ডা দীর্ঘজীবন পাবে না, কোন ইতিবাচক ফলও বয়ে নিয়ে আসবে না!

বর্তমান কালের এই ডিজিটাল যুগে সেসব বিখ্যাত আড্ডাগুলো অনেকটাই যেন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’।

কলকাতার কফি হাউজে বসেই জহির রায়হান বাংলাদেশের উপর ডকুমেন্টারি তৈরির পরিকল্পনা করেন। তারপর সদ্য স্বাধীন স্বদেশে গিয়ে চির নিখোঁজ হয়ে যান। কফি হাউজের আড্ডাতেই সিকান্দার আবু জাফর, আহমদ ছফা, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ তাদের কত কবিতা রচনা করেছেন। কতজন এতে অনুপ্রাণিত হয়েছেন!

এখন মানুষ তার অনেকটা সময় ব্যয় করে স্মার্ট ফোনে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্রাউজ করে। স্মার্ট ফোনে যে আড্ডা (চ্যাট) হয়, তা কি কখনো এই সরাসরি চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে, মুড়ি মাখা খেতে খেতে যে বিতর্ক হয় তার সমতুল্য! বন্ধুকে ছুঁয়ে দেখা বা পাশে বসে যে অনুভূতি, ফোনের স্ক্রিনে তার ছবি ভেসে ওঠায় বা নানা বর্ণের ইমো দিয়ে কি তার সত্যিকারের প্রতিস্থাপন হয়? বেঁচে থাক ভালো মানুষের সৃজনশীল আড্ডা। মানুষ হোক মানবিক, সৃজনশীল, সংবেদনশীল। ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে’- নিঃসঙ্গ মানুষের মন সব সময় আকাঙ্ক্ষা করে বসে থাকে উপযুক্ত মানুষের সঙ্গ। এই সু-সঙ্গই তো সেই প্রাণের আড্ডা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।