চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বৃত্ত ভাঙ্গার সাহস দেখিয়ে অর্থমন্ত্রীর বাজেট পেশ

বহু বছর পর জাতীয় বাজেট দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রীকে সাহসী হতে হলো। করোনা মোকাবেলার নানা ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থের যোগাড় করতে গিয়ে বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের বৃত্ত ভাঙ্গার সাহস দেখাতে হয়েছে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে। আয় কতো হবে সেটা নিয়ে খুব বেশি না ভেবে, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও যোগান ঠিক রাখতে জিডিপির ৬ শতাংশ অর্থাৎ ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ধার-দেনার প্রস্তাব করেছেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর আশা: কর-রাজস্ব এবং অনুদান থেকে আয় হবে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৩ কোটি টাকা। এই দুই খাতের প্রাপ্তি থেকে আগামী অর্থবছরে তার ব্যয় পরিকল্পনা ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি।

মহামারী করোনা গোটা দুনিয়ার চেনা-জানা অনেক কিছুই পাল্টে দিয়েছে। বাদ যায়নি বাংলাদেশে বাজেট উত্থাপন প্রক্রিয়াও। বাজেট পেশকে ঘিরে যে উৎসব তার রঙ কিছুটা ফিকে বৈকি। মন্ত্রিসভায় বাজেট অনুমোদন থেকে শুরু করে সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে সংসদে প্রবেশ, সবখানেই বাড়তি সতর্কতা। এমনকি সংসদের ফ্লোরে সদস্যদের উপস্থিতিও অনেক কম, কেবল কোরাম পূরণ করা।

বিজ্ঞাপন

অর্থমন্ত্রী হিসেবে ২য়, আর দেশের ৪৯ তম বাজেট তৈরি করতে গিয়ে ব্যয় এবং আয়ের হিসাব মেলানো অতো সহজ ছিলো না এবার। কারণ, করোনাভাইরাস। গত ৩ মাস ধরে অর্থনীতির চাকা থেমে আছে বলা যায়। কাজেই চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২ বার সংশোধনের পরও পূরণ হচ্ছে না বলাই যায়। কিন্তু খরচতো আর থেমে নেই, সুতারং ধারদেনাই ভরসা। আগামী অর্থবছরে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় পরিকল্পনার শুরুতেই তাই দক্ষ হিসাববিদ আ হ ম মুস্তফা কামালকে ভাবতে হয়েছে আয় নিয়ে।

বিজ্ঞাপন

আয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী দেখেছেন, সব মিলে আয় হতে পারে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৩ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয়ের হিসাবটাতো আরো অনেক বেশি, ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি। বাকি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার জন্য তাকে ভর করতে হয়েছে দেশের ব্যাংক থেকে ধার-দেনার ওপর। আর এ কারণেই ঘাটতি ছাড়িয়েছে ৫ শতাংশের বৃত্ত।

বাজেটে আয়ের অন্যতম ভরসার জায়গা কর রাজস্ব। এর মধ্যে সিংহভাগ যোগান দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর। এর সঙ্গে ট্যাক্সের বাইরের প্রাপ্তি এবং বিদেশী অনুদান সব মিলে আয় ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৩ কোটি টাকা। অনুদান বাদে ঘাটতি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকাকেও আয় হিসেবেই দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এর বড় অংশ নেয়া হবে ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে। ব্যাংক বহির্ভূত ঋণও আছে ২৫ হাজার কোটি, যার উৎস সঞ্চয়প্রকল্প। ৫ হাজার ৩ কোটি টাকা আসবে বিভিন্ন খাত থেকে।

বিজ্ঞাপন

৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অনুন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৮০ কোটি টাকা, আর উন্নয়ন ব্যয় ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এডিপি ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, এডিপি বহির্ভূত প্রকল্পে ৪ হাজার ৭২২ কোটি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন স্কিমে ২ হাজার ৫২২ কোটি টাকা।

উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয়ের সব মিলে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে অর্থমন্ত্রী সবচে বেশি টাকা খরচ করবেন জনপ্রশাসন অর্থাৎ সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে। সহজ করে এভাবে বলা যায়, মোট ব্যয় অর্থাৎ বাজেট যদি ১০০ টাকা ধরা হয়, তবে তার ১৯.৯ টাকাই যাবে জনপ্রশাসনে। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে যাবে ১৫.১ টাকা। এরপর সবচে বেশি অর্থ দরকার হবে সুদ পরিশোধে ১১ টাকার বেশি। পরিবহন যোগাযোগ খাতে ১১ দশমিক ৪, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন ৭, প্রতিরক্ষায় ৬.১, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ বাবদ ৫.৬, কৃষিতে ৫.৩, স্বাস্থ্যে ৫.১, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে ৪.৭, জনশৃংখলা ও নিরাপত্তায় ৫, গৃহায়নে ১ দশমিক ২, বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম বাবদ ০.৯, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিসে ০.৭ এবং বিবিধ ব্যয়ে ০.৮ টাকা।

৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতের নাজুক অবস্থা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে করোনা। রাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী হিসেবে এই অব্যবস্থাপনা বড় পীড়া দিয়েছে তাকে। কাজেই দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দিয়ে। বরাদ্দও বাড়িয়েছেন প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে আরেক গুরুত্বের জায়গা কৃষি। করোনাকালে কৃষিকে আরো গুরুত্ব দিতে কৃষিতে শতভাগ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ কমাতে চান অর্থমন্ত্রী।

অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব কি হবে তা এখনই বলতে পারছেন না কেউ। তবে অনুমান করা যায় বেশ ভোগাবে। কাজেই দেশের ভেতরে চাহিদা ও যোগান চাঙ্গা রেখে ২০০৮ সালের মতো মন্দা মোকাবেলা করতে চায় বাংলাদেশ। এজন্য সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ব্যবহার করবেন প্রত্যাশা অর্থমন্ত্রীর। আর পাশে চান গোটা দেশের মানুষকে। আজীবন সংগ্রামী মানুষ আ হ ম মুস্তফা কামাল। দারিদ্র্য, প্রতিকূল পারিপার্শ্বিকতা সবকিছুকে মোকাবিলা করে একের পর এক সাফল্যকে হাতের মুঠোয় পুরেছেন তিনি। সৃষ্টিকর্তার রহমত আর দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই মহামারীর কবল থেকে অর্থনীতি বাঁচানোর চেষ্টায়ও সফল হবেন, আশাবাদ অর্থমন্ত্রীর।

করোনার এই ক্রান্তিকালে সবার প্রতি অর্থমন্ত্রীর অনুরোধ ভীত বা আতংকিত না হওয়ার। বিভ্রান্তি এড়িয়ে ধৈর্য্য এবং সাহসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহবান জানিয়ে বাজেট বক্তৃতা শেষ করেন আ হ ম মুস্তফা কামাল।