চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বৃক্ষমানব, ফেলুদা ও একজন আহমেদ রুবেল

...

গাছের ভাষা বুঝেন, গাছের সাথে আনমনে কথা বলেন। গাছের অনুরোধে গেয়ে শোনান, ‘সত্তুরটা হুর পরীতে বন্ধু, আমারতো কাম নাই/আমি দোজখে যাবো/আমি দোজখে যাবো’।  তিনি আহমেদ রুবেল। বৃক্ষমানব হিসেবে যার পরিচিতি! অভিনয় আর ব্যক্তিত্বের পারফেকশনে জুড়ি নেই তার। ছোট ও বড় পর্দায়, সবখানেই সফল! দীর্ঘদিন ধরে অভিনয়ের কোনো মাধ্যমেই পাওয়া যাচ্ছিলো না তাকে। বহুদিন পর তিনি ফিরলেন, সঙ্গে মস্ত চমক!

বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রথম কোনো অভিনেতা, যিনি ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করলেন! হ্যাঁ, তৌকীর আহমেদের পরিচালনায় ওয়েব সিরিজ ‘নয়ন রহস্য’-তে ফেলুদা রূপে হাজির হয়েছেন আহমেদ রুবেল। আলফা আই মিডিয়ার প্রযোজনায় ‘নয়ন রহস্য’র প্রথম অ্যাপিস্যুডটি বায়োস্কোপ.কম-এ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর অভিনয়ে ফেরা, ফেলুদা, নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই অভিনেতা কথা বলেছেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে:

বাংলাদেশের প্রথম ফেলুদা আহমেদ রুবেল। এমন খবর যারাই শুনেছেন, তারাই বলেছেন যে এটা পারফেক্ট সিলেকশান! ফেলুদার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন?
আসলে ফেলুদা প্রজেক্ট নিয়ে প্রথমে আমাকে বলেন ‘নয়ন রহস্য’-এর প্রডিউসার শাহরিয়ার শাকিল। তার প্রযোজনায় আমি একটা লম্বা ধারাবাহিক করেছিলাম, যার নাম ‘লোটা কম্বল’। তখনই তিনি আমাকে বলেছিলেন যে ফেলুদার সত্ত্ব কিনেছেন তিনি, সামনে বাংলাদেশে ফেলুদাকে নিয়ে কাজ করতে চান। তারপর এ বছরের জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারির দিকে আমাকে বলেছিলেন যে খুব ইমিডিয়েটলি ফেলুদা নিয়ে কাজ করতে চান। প্রথমে অন্য একটা করার কথা ছিলো, যা পরিচালনা করার কথা ছিলো গিয়াস উদ্দিন সেলিমের। কিন্তু পরে সম্ভবত উনার সিডিউল এর সাথে মিলেনি কিংবা তিনি অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন বলে হয়ে ওঠেনি। এরপর ‘নয়ন রহস্য’ মার্চের দিকে ঠিক হয়। তখন আমাকে জানানো হয় যে, প্ল্যান চেঞ্জ হয়েছে। এটা পরিচালনা করবেন তৌকীর আহমেদ। ফেলুদা হিসেবে প্রথমে আমাকে পছন্দ করেন প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল, এরপর তৌকীর ভাই।

বিজ্ঞাপন

আগে ফেলুদা দেখেছেন, পড়েছেন। কিন্তু এবার নিজেই ফেলুদা বনে গেলেন, কেমন লাগলো বিষয়টি?
সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার লেখাগুলো ছবির মত সুন্দর। তার লেখা ‘নয়ন রহস্য’টাও একেবারে ছবির মত, স্ক্রিনপ্লে করা। খুবই ভালো। অসাধারণ ব্যক্তিত্বের লেখা, যা অসংখ্যবার পর্দায়ও হয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় লেখা হয়েছে মানুষ পড়েছে, কলকাতায় অসংখ্য গুণী অভিনেতারা এই চরিত্রটি পর্দায় রূপদান করেছেন। সৌমিত্র, শশী কাপুর, সব্যসাচী থেকে শুরু করে আবির-পরমব্রত পর্যন্ত। ওপার বাংলার এই যে এতো বিখ্যাত বিখ্যাত মানুষেরা ফেলুদা করেছেন, সে জায়গায় পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কেউ ফেলুদা করলো এবং সেটা আমি। এটাতো পরম পাওয়া, সৌভাগ্যের। নিঃসন্দেহে ভালো লাগার অনুভূতি।

কিন্তু এখানে আমার একটু কথাও আছে। আমরা যেভাবে কাজ করি, যে প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করি, যে বাজেট নিয়ে করি, যে টাইম ফ্রেমের মধ্যে আমাদেরকে কাজ করতে হয়, সেটা নিয়ে একটু খটকা আছে। কারণ ফেলুদা মানুষের জানা গল্প এবং চেনা একটা চরিত্র। মানুষ রেডিমেড একটা প্রিপারেশন নিয়ে ফেলুদাকে দেখতে বসবে, ইমেজ তার মাথার মধ্যে গেঁথে আছে, মাইন্ড সেট-আপে আছে। ফলে একটু দুঃচিন্তা আছে যে এটা কতোটুকু ভালো করা গেল, আর কতোটুকু ভালো করা গেল না। ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করে নিঃসন্দেহে অনুভূতি ভালো কিন্তু পাশাপাশি মানুষ কীভাবে নিবে এই চিন্তাটাও কাজ করছে আমার।

ফেলুদা পড়ে কিংবা ফেলুদাকে দেখে আপনার কি আগে কখনো মনে হয়েছে যে, এই চরিত্রে যদি অভিনয় করতে পারতাম?
সত্যজিৎ রায়ের লেখা ফেলুদা টেক্সট আকারে আমরা আগেই পড়েছি। সে কারণে আলাদা একটা অ্যাট্রাকশনতো ছিলোই। কিন্তু আমাদের এখানে ফেলুদা নিয়ে কাজ হবে, প্রথমত এটাই আমার মাথায় ছিলো না। কিন্তু শাকিল (প্রযোজক) যখন আমাকে বললো যে তিনি সত্ত্ব কিনেছেন বাংলাদেশে ফেলুদাকে নিয়ে কাজ করার জন্য। তখন থেকে আসলে ফেলুদাকে নিয়ে একটু ভাবছি নিজের মত কিন্তু তার আগে ফেলুদা করবো কিংবা ফেলুদা কখনো আমাদের করার সুযোগ আসবে বিষয়টি আমার মধ্যে ছিলো না। আর নিজে থেকেও এমনটা মনে করিনি, প্রযোজক-পরিচালক কী কারণে মনে করেছেন যে এটা আমাকে দিয়ে হবে! সে অর্থে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। কাজটির প্রোডাকশন লেভেল যাই হোক না কেন, ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করাটা ইতিহাসে নাম লেখানোর মতো ব্যাপার হয়ে গেল। মানে ভবিষ্যতে যখন কথা হবে যে বাংলাদেশে ফেলুদা নিয়ে কারা কাজ করেছেন, তখন নিশ্চয় হয়তো আমার নামটাও আসবে; যেহেতু বাংলাদেশি হিসেবে আমি প্রথম করলাম এই চরিত্রটি। অনেকদিন পর কাজ করতে আসছি আর এমন একটি চরিত্রে কাজ করলাম, এটা সত্যি সৌভাগ্যের। ফেলুদা চরিত্রটি আমার নিজেরও পছন্দ, আর সেই চরিত্রে কাজ করতে পেরেছি এর জন্য প্রডিউসার এবং ডিরেক্টরের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমি মনে করি আমাদের এখানে ফেলুদা করার মতো অনেকেই হয়তো আছেন।

বহুদিন পর অভিনয়ে, কোথায় ছিলেন?
নিজের ব্যক্তিগত কিছু কারণেই অভিনয় করিনি। মাঝখানে বিরতি পড়ার এটাই কারণ। তবে ৬ মাস ধরে মোটামুটি রেগুলার কাজ করছি। এই যেমন মাঝখানে একটা ফিল্ম করলাম। অনুদানের ছবি, হাবিব নামের একজন আহমদ ছফার ‘অলাতচক্র’ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করছেন। ওই ছবির প্রথম লটের শুটিং শেষ হয়েছে। আগামী মাসের ২০ তারিখ থেকে আবার ওই ছবির শুটিং। নুরুল আলম আতিকের একটি ছবি করেছি, ছবির নাম ‘পেয়ারার সুবাস’। শুটিং মোটামুটি কমপ্লিট হয়ে আছে। তো এরকম টুকটাক কাজ করছি, আমি তো এমনিতেই প্রচুর কাজ করতাম না কখনো। তুলনামূলকভাবে খুব অল্প পরিমাণে কাজ করতাম।

আপনাকে তো সবাই হুমায়ূন আহমেদের নাটকে দেখেই বেশী অভ্যস্ত?
হুমায়ুন স্যারের কাজ আমি খুব নিয়মিত করতাম, এজন্যই হয়তো। একসময় ফারুকীর কাজ করেছি, তার কাজই সবচেয়ে বেশী করেছি। এছাড়া টুটুল ভাই, অনিমেষ আইচ, সুমন আনোয়ার, এস এ হক অলিকের শুরুর দিকের অনেক কাজ করেছি। তবে হুমায়ূন স্যারের কাজ নিয়মিত করতাম, তার মারা যাওয়ার আগেও দুটি কাজ করেছি।

আপনাকে তো আমরা খল অভিনেতা হিসেবেও দেখেছি?
আমি সব ধরনের চরিত্রে করেছি। প্রোটাগনিস্ট, অ্যান্টাগোনিস্ট সমস্ত কিছুই করেছি। চরিত্রকে চরিত্র হিসেবে দেখি আসলে। কিন্তু তার আগে চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড, হিস্ট্রিগুলো দেখি। যেমন ‘নয়ন রহস্য’ করেছি, তার আগে ক্যারেক্টারের জন্য প্রচুর টেক্সট পড়তে হয়েছে। কারণ অনেকদিন আগে এটা পড়েছি, ভুলে গিয়েছিলাম। টেক্সটের মধ্যে আউটলাইনসহ তার বাইরেও অনেক ইনার বিষয় থাকে, ইন্টার কানেকশন, চরিত্রের মনস্তাদ্বিক বৈশিষ্ঠ্য, একটা ক্যারেক্টারকে ফাইন্ড আউট করতে যে পয়েন্টগুলো লাগে সেগুলো দেখে তারপর চরিত্রের জন্য প্রস্তুত হই। একজন অভিনেতার কাছে সব চরিত্রই সমান গুরুত্বের।

বিরতির পর কাজে ফেরার অভিজ্ঞতা কেমন?
আমাদেরতো স্ক্রিপ্টের আকাল চলছে এখন। স্ক্রিপ্ট বলতে কিছুই এখন আর নাই। এখন প্রায় কোনো নাটকেইতো স্টোরি নাই বলতে গেলেই চলে, কোন্ ক্যারেক্টার কী করছে না করছে তার কোনো ধারাবাহিকতা নাই, আর্টিস্ট আসছে আর বের হয়ে যাচ্ছে এরকম একটা বিষয় মনে হয়। এজন্য স্টোরি খুব গুরুত্বপূর্ণ, ভিজুয়াল মিডিয়ামে স্টোরি ছিলো না, তা কিন্তু না। এই সময়ে ফেলুদার মতো গল্প নিয়ে কাজ করাকে আমার সত্যিই সাহসিকতা মনে হয়েছে। আমার মনে হয়, ভিজ্যুয়াল মিডিয়ামে প্রচুর স্টোরি দরকার। সেটা সত্যজিতের হোক কিংবা হোক অন্য কোনো গল্পকারের। ভালো স্টোরি টেলার হলে এই মিডিয়ামের মান ও পরিবেশটা সুন্দর হয়, ভালো কিছু গল্প হলে অন্তত মানুষের একটা অ্যাট্রাকশন কাজ করবে। স্টোরি আছে বলেই আমরা যে ‘নয়ন রহস্য’ খুব অসাধারণ করে ফেলেছি তা কিন্তু নয়, যতোটুকুই করেছি একটা স্টোরি অন্তত পাবেন। সাধ্যের মধ্যে যতোটুকু করা যায় সেটা করার চেষ্টা আছে ‘নয়ন রহস্য’তে। এখন দর্শকরা দেখেই বলতে পারবেন, কী হয়েছে।

তাহলে ছোট ও বড় পর্দায় নিয়মিত আমরা আহমেদ রুবেলকে পাচ্ছি?
হ্যাঁ, আমি তো আশা করছি এখন থেকে নিয়মিত অভিনয় করব।

আপনি কি এখনো বৃক্ষের ভাষা বোঝেন?
এটা তো বুঝতেই হয়। যে লোক বোবা তার ভাষা কি বোঝা যায় না? নিশ্চয়ই বোঝা যায়। গাছেরও ভাষা আছে, নিশ্চয় আছে! (হাসলেন কিছুক্ষণ…)

Bellow Post-Green View