চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বুদ্ধিজীবী দিবসের সর্বজনীনতা

লেখার শুরুতেই মহান মুক্তিসংগ্রামে স্ব স্ব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং একই সাথে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করছি জাতির ঐসব কুলাঙ্গারদের প্রতি যাদের তথ্যের বদৌলতে পাকিস্তানীরা আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের গ্রেফতার ও নৃশংসভাবে হত্যা করে থাকে।

মুজিববর্ষের বুদ্ধিজীবী দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রের কাছে নিবেদন রইলো; জাতির ঐসব কুলাঙ্গারদের পরিচয় বর্তমান প্রজন্মের সামনে প্রকাশ করার মাধ্যমে কিছুটা হলেও দায়মুক্তির অবকাশ ঘটবে। পাশাপাশি দেশীয় দোসরদের যারা পরবর্তীতে অর্থাৎ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন দায়িত্বশীল জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছে সেখান থেকে তাদের নামফলক চিরতরে মুছে ফেলতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষভাবে একটি কমিশন গঠন করতে হবে যাদের মূল দায়িত্ব হবে নাম না জানা অনেক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যাদেরকে আমরা এখনো সঠিকভাবে জানতে পারিনি তাদের নাম পরিচয় জাতির সামনে তুলে ধরা এবং তাঁদের স্মরণে মনুমেন্ট স্থাপন করা। মনুমেন্ট এ কারণেই স্থাপন করতে হবে যার প্রেক্ষিতে প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কিছুটা হলেও জানার সুযোগ পাবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এবং তৎসাপেক্ষে নিজেরা দেশের তরে ভাল কাজ করার তাগিদ অনুভব করবে।

এখন আসা যাক, লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে। এই যে আমরা বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করি; তার মর্মার্থ কি হতে পারে? আমরা কি প্রকৃত অর্থেই বৃদ্ধিজীবী দিবসের চেতনাকে অনুশীলন করছি কিংবা যাদের নিকট দায়িত্ব সমর্পণ করা হয়েছে তারা কি আদৌ দায়িত্ব পালন করছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশব্যাপী বুদ্ধিজীবী দিবস পালনের নিমিত্তে বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে দেশের নানা প্রান্তে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে এবং সেই সব আলোচনা সভায় আলোচকদের তালিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে যদি আলোকপাত করা হয় তাহলে দেখা যাবে আলোচকদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখা শেয়ার করে থাকে।

তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায়, এই শ্রেণির মানুষজনদের বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠানে যারা আমন্ত্রণ জানায় তাদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ভাবতে জ্ঞানী না হলেও চলবে। যে সকল ব্যক্তিবর্গ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ভিন্ন মত প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই বিরুদ্ধাচরণ করে থাকে সচরাচর তাদের কাছ থেকে বুদ্ধিজীবী দিবসের ভাবার্থ উঠে আসা প্রায় অসম্ভব। আবার এঁও স্বীকার করতে হবে এ সকল হেয় লোকদের যারা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে এ জাতীয় প্রোগ্রামে আলোচক হিসেবে আমন্ত্রণ জানান তাদের মসনদ সম্বন্ধেও তদন্ত করা উচিত বলে মনে করি। এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কোন কিছুকে ছাড় দেওয়া কোনভাবেই ঠিক হবে না কেননা ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো উৎপেতে আছে, যে কোন সময় তাদের ভয়ংকর থাবায় ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসতে পারে বাংলাদেশে। কাজেই ষড়যন্ত্রকারীদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলা ব্যতিরেকে দ্বিতীয় কোন চিন্তা মাথায় আনা নিশ্চিতভাবেই অবিবেচকের ন্যায় কাজ হবে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যথাযোগ্য মর্যাদায় বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করা হয়ে থাকে। প্রকৃত অর্থেই কি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়ে থাকে? সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকার প্রজ্ঞাপন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠানগুলো সম্পন্ন হয়ে থাকে। বিশেষ করে দেখা যায়, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও পুষ্পস্তবক অর্পনের পর পরই তড়িঘড়ি করে অনুষ্ঠান শেষ করে দেওয়া হয়। উপজেলা, জেলা, শহরের প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনুষ্ঠানের নিয়মাবলী মানা হলেও গ্রাম গঞ্জের অবস্থা শোচনীয়। মাঝে মধ্যে এমনটা মনে হয় সরকার প্রজ্ঞাপন ঘোষণা না করলে হয়তো অনুষ্ঠান পালন করা হতো না। সুতরাং বলা যায়, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করা হয়ে থাকে। আবার কোন কোন প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, যারা দায়িত্বে রয়েছেন তারাই শুধুমাত্র বাধ্যবাধকতার কারণে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকে, প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ সংখ্যকই কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী আলোচনা সভায় আসেন না।

কাজেই বোঝা যাচ্ছে বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠান সহ জাতীয় অনেক অনুষ্ঠানই সার্বজনীনতা পায় নি। সার্বজনীনতা না পাওয়ার কারণগুলো কিন্তু অনুসন্ধান করা উচিত, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে কারণগুলো জানা রয়েছে। বিশেষ করে বলা যায়, ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর সামরিক সরকারের শাসনভার গ্রহণের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির সংস্কৃতি চালু হয়, পরবর্তীতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতি করার অনুমতি প্রদানসহ সংবিধানে ১৯৭২ এর মূলনীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসকে মুছে ফেলার জঘন্য পায়তারা করার কারণে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলো সার্বজনীনতা পাচ্ছে না। কেননা একটা প্রজন্ম কিন্তু ভুল ইতিহাসকে জেনে বড় হয়েছে, সুতরাং তাদের কাছে জাতীয় অনুষ্ঠানগুলো সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।

জাতীয় দিবস ও অনুষ্ঠানগুলো কিভাবে সার্বজনীনতা পায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে কাজ করার মনোবাসনা পোষণ করতে হবে। কারণ দেশকে ভালবেসে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা মানুষদের যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা যে কোন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব মনে করি। আর এ জন্য দেশ গঠনের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। বিশেষ করে মহান মুক্তিসংগ্রামসহ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পিছনে যে সকল মানুষের অসামান্য অবদান রয়েছে তাদের সম্বন্ধে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে হবে এবং মহান ব্যক্তিদের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য রাষ্রেলের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তাদের নামে স্থাপনা তৈরিসহ বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থা তুলে ধরতে হবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পেছনের ইতিহাসের পটভূমি তুলে ধরতে পারলেই এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের বোধোদয় হবে; কিভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছে এবং দেশগঠনের প্রাক্কালে মহান মানুষদের ভূমিকার সচিত্রও শিক্ষার্থীদের মানসপটে জাগরুক হবে। অত্যন্ত দুঃখের সহিত বলতে হয়, বুদ্ধিজীবী দিবসসহ অনেক জাতীয় অনুষ্ঠান পালন নিয়ে অনেককে কটাক্ষ করতে শোনা যায়। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী নিধনে এ দেশীয় দোসরদের ভূমিকাকে জনসন্মুখে প্রকাশ করতে হবে। এ জাতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দেশবিরোধী চক্র কিছুটা হলেও পদদলিত হবে; রাষ্ট্র তার ইতিহাস নির্মাতাদের যথাযোগ্য মর্যাদায় সর্বসময়ে স্মরণ করবে মুজিববর্ষে বুদ্ধিজীবী দিবসে এমনটাই প্রত্যাশা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)