চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত : কবি ও চলচ্চিত্রকার

আমাদের অতি প্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার স্থান খুব গুরুত্ব বহন করে। সহজ ও ন্যারেটিভ ধারার গল্প বলার যে ঐতিহ্য বাংলা চলচ্চিত্রের প্রাণ বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সেখান থেকে প্রথম নিজেকে মুক্ত করেছেন। বিমূর্ত ও আধা বিমূর্ত ধারার চিত্রায়ণের মাধ্যমে তার নির্মিত চলচ্চিত্র এখনো আমাদের বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলচ্চিত্রের শিরোনামগুলো একটি তুলে ধরতে চাই। দূরত্ব, নিম অন্নপূর্ণা, শীত গ্রীষ্মের স্মৃতি, আন্ধগলি, ফেরা, বাঘ বাহাদুর, তাহাদের কথা, চরাচর, লাল দরজা, উত্তরা, মন্দ মেয়ের উপাখ্যান, স্বপ্নের দিন, কালপুরুষ, আমি ইয়াসিন আর মধুবালা, জানালা এইসব চলচ্চিত্রের দর্শক মাত্রই জানেন যে, পরিচালক কি পরিমাণ ম্যাজিক তৈরি করেন। ভালো কবিতা পাঠের যে ঘোর লাগা অনুভূতি থাকে তার চলচ্চিত্রের প্রতি ছত্রে সেই উপলব্ধি থাকে।

বিজ্ঞাপন

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চরম ভক্ত আমি। ঘটনাচক্রে তার সঙ্গে গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা, কথোপকথনের বিরল সৌভাগ্য হয়েছে আমাদের। তারই কিছু মনিমুক্তো এই লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করা যাক।

এক সন্ধ্যায় গোলাম রব্বানী বিপ্লব দাদাকে নিয়ে এলেন আমাদের ছোট্ট পরিসরের বাড়িতে। বিপ্লব খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ভক্ত। বিপ্লবের মনে হয়েছে দাদাকে নিয়ে আমাদের সাথে আড্ডা দিলে আন্তরিকভাবে খুশি হবে। আড্ডার সঙ্গীত খুব সীমিত পরিসরে। খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক আবু সাইয়ীদ, প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার এবং বুদ্ধদেব দার বন্ধু ও সমালোচক প্রেমেন্দ্র মজুমদার। সন্ধ্যা থেকে পান ও আহার ও কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে আড্ডা জমে উঠল। অসাধারণ সুন্দর ও যুক্তিপূর্ণ কথা বলেন তিনি। খ্যাতিমান কবি তাই বাক্য গঠনে কবিত্ব থাকে। তার আলোচনা-সমালোচনা ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও কাব্যিকতা প্রাণ পায়। লঘু ও কথা থেকে গভীর কথা কিংবা গভীর রস থেকে লঘু রস সব মিলিয়ে আমাদের মতো আড্ডাবাজদের কাছেও সেই সন্ধ্যার আড্ডা স্মরণীয় হয়ে রইল।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের দুএকটা কথা তুলে ধরার চেষ্টা করি। একেবারে প্রবাদ বাক্যের মতো কথা। তিনি অবশ্য কথা বলেন কম। শোনেন বেশি। মৃদু বঙ্কিম হাসির রেখা থাকে ঠোঁটের কোণে। পরিহাস ও কৌতুক তার চোখে মুখে। আর খুব সহজ সরলভাবে মিশে যেতে পারেন। খাবার ব্যাপারে খুব বাছ বিচার আছে। নিয়মিত পান করেন না। শিভাস রিগ্যাল তার পছন্দের পানীয়। প্রত্যেকদিন সকালে যোগ ব্যায়াম করেন। সত্তরোর্ধ শরীর। ব্যাধি যেন বাসা বাঁধছে।

চলচ্চিত্রে সাদামাটা ভাবে কাহিনি বর্ণনা করা একেবারে পছন্দ করেন না। দৃশ্যের ম্যাজিক তৈরি করতে চান। যেন ভালো মনের দর্শকেরা বারবার তার ভিজ্যুয়ালের কাছে ফিরে আসে। কাব্যিক চোখ দিয়ে তিনি সৌন্দর্য নির্মাণ করেন। বিপ্লবের এক প্রশ্নের জবাবে দাদা বললেন,

আমি তো একটা ফ্রেমের মধ্যে অনেক কথা বলতে চাই। একটা শটে একটা লোক হেঁটে যায়। শুধুই লোকটা হেঁটে যায় এটা আমি কখনোই দেখাতে চাই না। আমি বোঝাতে চাই লোকটা হেঁটে যায়। অনেক শীত গ্রীষ্ম হেঁটে যায়। ভালো মন্দ হেঁটে যায়। যেন একটা জীবন হেঁটে যায়।
আমরা মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনছি।
ইন বিটুইন টু লাইন্স অনেক কথা থাকে। আমরা তা বুঝি না।

এই বলে দাদা হাসতে লাগলেন বললেন,
এবার টরেন্টো ফিল্ম উৎসবে হোটেলে বসে বসে আমার নতুন ছবির স্ক্রিপ্ট করেছি। নারায়ণ গঙ্গোপাধায়ের গল্প। বিখ্যাত গল্প। টোপ। প্রায় তিরিশ বছর ধরে গল্পটা মাথায় ঘুরছে। হঠাৎ করেই অলৌকিক ভাবে টোপের চিত্রায়ণ আমার কাছে ধরা দিলো। এক টানে বারো পৃষ্ঠার স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললাম। যারা আমার সঙ্গে এই ফিল্মে কাজ করবে তারা সংক্ষিপ্ত এই স্ক্রিপ্ট দেখে হতবাক। শ্যুটিং করলে মাত্র পনের মিনিট হবে। ওরা খুব চিন্তিত। কিন্তু আমি ওদের কি করে বোঝাই বারো পৃষ্ঠার আড়ালে বারো হাজার পৃষ্ঠার কথা লুকিয়ে আছে। অনেক অবলা-অদেখা বিষয় থেকে যায়। সেটাই তো আমি ফিল্মে ধারণ করতে চাই।

খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার আবু সাইয়ীদ হঠাৎ করে আবেগতাড়িত হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
দাদা আপনি কবিতার মতো দৃশ্যায়ন কি করে করেন? বিশাল বড় ক্যানভাস।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত হাসলেন। বললেন, নীরব হয়ে যেতে চেষ্টা করবে। যত মৌনতা ততো দৃশ্য নির্মাণের ক্ষমতা বাড়বে। ফিল্মের কাজ শুরুর আগে আমি তো কথা বলা কমিয়ে দেই। একা থাকি। যখন শ্যুটিং চলে তখন আমি আরও বেশি একা হয়ে যাই। মৌনতাই ভিজ্যুয়াল নির্মাণের শক্তি তৈরি করে।

দাদা খুব দার্শনিকতায় পূর্ণ কথা বলেন। আহমাদ মাযহার আলাপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলেন,
দাদা, বাংলা চলচ্চিত্রের একঘেঁয়ে, ক্লিশে অবস্থা যখন, চলচ্চিত্রের সীমাবদ্ধতা যখন প্রকট, চলচ্চিত্রে যখন শুধু গল্পের চিত্রায়ণধর্মীতা তখন আপনি প্রায় এককভাবে চলচ্চিত্রে বিমূর্ততা নিয়ে এসেছেন। আমরা আবার জোরালো কণ্ঠে দাদার কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ি।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত শিভাস রিগ্যালে চুমুক দিয়ে বলেন,
ন্যারেশন এক ধরনের স্টাইল গল্প যে সবসময় বর্ণনাত্মক হবে তা নয়। গল্পের ভেতর অনেক অতিগল্প থাকে। সব মিলিয়ে গল্পটাকে কিভাবে চিত্রায়িত করলাম! বিমূর্ত কীভাবে মূর্ত হয়ে উঠল কিংবা মূর্ততা কিভাবে বিমূর্ত হয়ে উঠল সেটাই বিচেনার সময়।

বুদ্ধদেব দার কথাও জাদু বাস্তবতার মতো। কিছু তার বুঝি আভা। কিছু বুঝি অনুমানে। দাদা পূর্বসুরীদের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল। আড্ডায় কথা শুনে বুঝতে পেরেছি দাদার প্রিয় পরিচালক ঋত্বিক ঘটক। সত্যজিৎ রায়ের পুরানো ঢঙে গল্প বলার রীতি তার পছন্দ নয়। সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্রে মূল পাঠ থেকে রায় বাবু একটুও স্বাধীনতা নেন না। এই ব্যাপারটিকে দাদা তেমন গুরুত্ব দেন না। কারণ তিনি মনে করেন সাহিত্য একটি মাধ্যম। চলচ্চিত্র আরেকটি মাধ্যম। দুই মাধ্যমের দুই রকম শক্তি। চিরায়ত সাহিত্য নিশ্চয়ই চলচ্চিত্রের জন্য লেখা হয়নি। তাই সাহিত্য থেকে যখন চলচ্চিত্র হবে সেটাকে চলচ্চিত্রই হতে হবে।

এই নিয়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নিজের জীবন অভিজ্ঞতাও কম নয়। কমলকুমার মজুমদারের কাহিনি অবলম্বনে ‘নিম অন্নপূর্ণা’ নির্মাণ করেন। কিন্তু কমলকুমার মজুমদারের স্ত্রী তখন আদালতে মামলা করেন, মেধাস্বত্ব নিয়ে। মূল গল্পের অনেক দূরবর্তী অবস্থান থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। ছবিটির রিলিজ আটকে যায়। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক এক অসাধারণ জবানবন্দি দেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের দুটি পথ। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দিয়ে তিনি সেটা বুঝিয়ে দেন।

বুদ্ধদেব দার চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে তার স্বাক্ষর আমরা উজ্জ্বল ভাবে পাব। লাল দরজা, চরাচর, টোপ, স্বপ্নের দিন, উত্তরা সাহিত্যের দূরবর্তী ছায়া নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র।

দাদা খুব উদ্যমী, জেদী ও গভীর শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষ। দেরি করে আসার জন্য মিঠুন চক্রবর্তীকে তিনি পাথরখণ্ড নিয়ে ধাওয়া করেছিলেন। মিঠুন নাকি সেই ধাওয়া খাওয়ার পরে আর কোনোদিন কোনো শ্যুটিংয়ে দেরি করে আসেননি। শ্যুটিং চলাকালে তিনি অন্য মানুষে রূপান্তরিত হন। ক্যামেরায় লুক থ্রু নিজে করেন। শট নির্বাচন নিজে করবেন। এডিটিং-এর সময় কোন শর্টটা ফাইনাল হবে সেটাও নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন। হয়তো পুরুলিয়া গেছেন শ্যুটিং করতে। চেনা প্রকৃতি, চেনা পরিবেশ তার ক্যামেরার চোখে অন্যরকম হয়ে যাবে। আশ্চর্য নির্মাণ কুশলতা তার। লুই বুনুয়েল তার প্রিয় পরিচালক। তিনি বিস্তারিত দৃশ্যপটের মধ্যে পরাবাস্তব সুরে কথা বলেন। তবে দাদা হেসে হেসে এক আসরে বললেন,
‘সালভাদর দালির ছবিতে অতি চমৎকৃত করার প্রবণতা থাকে। সুররিয়ালিস্টিক ধারার শিল্পীদের মধ্যে এই প্রবণতা থাকে।’

দাদা আরও বললেন,
‘শিল্পের সহজ শর্ত হচ্ছে সরলতা। আরোপিত কোনো কিছু বড় শিল্প নয়। ফিল্মেও আরোপিত শট কিংবা আরোপিত কোনো ডায়ালগ পরিচালকের দুর্বলতাকে তুলে ধরে।’

আমাদের দেশের পরিচালক আবু সাইয়ীদ এবং গোলাম রব্বানী বিপ্লব এবং শবনম ফেরদৌসী দাদার একান্ত অনুরক্ত।

শবনম দাদার বিমূর্ত পৃথিবীকে অনেক ভালোবাসেন। দাদার চলচ্চিত্রের মুগ্ধ দর্শক তিনি। বিপ্লব দাদাকে শ্রদ্ধা করেন। আবার দাদার কাজকর্মের বড় সমালোচকও তিনি। সাইয়ীদ ভাই দাদার শ্যুটিং এর বিস্ময়কর দিকগুলো সম্পর্কে জানতে খুব আগ্রহী। যেমন- উত্তরায় শত শত বামনের দৃশ্য। বামনদের গ্রাম। এটা কিভাবে সম্ভব? কিংবা ‘জানালা’ চলচ্চিত্রে হাসপাতালে হাজার হাজার ইঁদুর ছুটে বেড়াচ্ছে সেই দৃশ্য।

দাদা এসব প্রশ্ন শোনেন। আর মিটিমিটি হাসেন।
দাদা সেই দীর্ঘ আড্ডার মধ্যে আমাদের বারবার বললেন,
‘ভালো ছবির কাছে ফিরে আসতে হয়। যে ছবি বারবার দেখা হয় সেটাই প্রকৃত চলচ্চিত্র। কিছুটা বাস্তবতা আর কিছুটা ম্যাজিক মিশিয়ে আমার চলচ্চিত্র।’

আমরা স্তম্ভিত। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ম্যাজিকের মতোই কথা বলেন। এবং তিনি ল্যাটিন সাহিত্যের জাদু বাস্তবতার চরম ভক্ত। আমাদের আড্ডা গড়িয়ে চলে।

কোনালের কণ্ঠে গভীর মনোযোগ দিয়ে গান শোনেন। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। চোখ বন্ধ করে সম্মোহিত হয়ে তিনি গান শুনতে শুনতে কোনালকে আশীর্বাদ করেন। আর কোনালের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন,
‘তোমার বাবাকে দেখে রেখো। ও শুধু-সন্ন্যাসী ধরনের মানুষ। অসম্ভব ভালো মনের মানুষ। এই যুগে এরকম মানুষ পাওয়া যায় না। আমার সৌভাগ্য যে তোমার বাবার মতো মানুষের দেখা পেয়েছি। ও ভালো মনের মানুষ না হলে কেউ আমার চলচ্চিত্রের গভীরে প্রবেশ করবে না।’

‘কোনালের চোখে তখন অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে।
সেই আড্ডার আরও কিছু টুকরো নির্যাস স্থানান্তরে বলা যাবে।

\ দুই \
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বাংলা ভাষার একজন শক্তিমান কবি। সুনীল শক্তির পরেই শ্রদ্ধার সঙ্গে তার নাম উচ্চারিত হয়। কবিতার কাব্যময় অনিন্দ্য পৃথিবীকে তিনি চলচ্চিত্রে রূপায়িত করেন।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক তিনি। পৃথিবীর বড় বড় উৎসবে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। ভেনিস, টরেন্টো, লুকার্নো, কার্লো বি ভেরি, এথেন্স, চীন, ইরান এইসব বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে বারবার অংশগ্রহণ। বারবার পুরস্কার পেয়েছেন। তার চলচ্চিত্র পৃথিবীর সেরা সেরা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পাঠ্য।

তাকে বলা হয় চলচ্চিত্রের কবি। পয়েট অব ফিল্ম। এই উপাধি আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ভারতবর্ষের ফিল্ম আন্দোলনের সঙ্গে তিনি জড়িত স্কুল জীবন থেকে।

তার ফিল্ম বহুবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। পরিচালক হিসাবেও বহুবার ভারত সেরা জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। অবশ্য এসব তাকে স্পর্শ করে না। একজন সচেতন দর্শক যদি তার ছবিকে ভালোবাসে সেটাকেই তিনি সাফল্য মনে করেন।

লেখাপড়া করেছেন অর্থনীতি নিয়ে। কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। কিন্তু চলচ্চিত্রই তার নেশা, পেশা ধ্যান-জ্ঞান। চার্লি চ্যাপলিন, ইনগ্রিড বার্গম্যান, আকিরা কুয়োশুয়া, ভিত্তোরিও ডি সুকা, রবার্টো, রোসালিনির ছবি দেখে দেখে অনুভব করে তিনি বেড়ে উঠেছেন।

প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই তার চলচ্চিত্রের হাতেখড়ি হয়। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে তিনি কবিতার গন্ধ মেশাতে পারেন। জটিল জীবনের গল্পও তিনি। কবিতার অন্তর্চেতনার মতো দর্শক হৃদয়ে মিশিয়ে দিতে পারেন।

শব্দে ছন্দে বাক্যে হাজার হাজার বছর ধরে কবিতা রচিত হচ্ছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাস মাত্র শতবর্ষের। এই মাধ্যমটি সাবালকত্ব পেয়েছে যুগ স্রষ্টা কিছু পরিচালকের আগমনে। এই মাধ্যমটি ভিন্নতা পেয়েছে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তদের মত অসামান্য পরিচালকদের হাত ধরে।

সবার জানা আছে। তবুও তার বিখ্যাত কিছু চলচ্চিত্রের একটা তালিকা দিচ্ছি। চোখ বুলাতে বুলাতে আমরা তার ভক্তকুল উপলব্ধি করব কতো বড় মাপের পরিচালক তিনি।

দূরত্ব (১৯৭৮), নিম অন্নপূর্ণা (১৯৭৯), গৃহযুদ্ধ (১৯৮২), আন্ধিগলি (১৯৮৪), ফেরা (১৯৮৮), বাঘ বাহাদুর (১৯৮৯), তাহাদের কথা (১৯৯২), চরাচর (১৯৯৩), লাল দরজা (১৯৯৭), উত্তরা (২০০০), স্বপ্নের দিন (২০০৪), আমি ইয়াসিন আর আমার মধুবালা (২০০৭), কালপুরুষ (২০০৮), জানালা (২০০৯), আনোয়ার কা কিসলা (২০১৩), টোপ (২০১৭) ইত্যাদি। এছাড়া ডকুমেন্টারি ও টিভির জন্য নির্মিত শর্টফিল্মও আছে অনেক।

গণেশ গাইনের ওপর নির্মিত অসাধারণ তথ্য চিত্রের কথা ফিল্ম উৎসাহী সবাই জানেন।
সাহিত্যের একজন গভীর ও অনুরাগী পাঠক তিনি। আর অসাধারণ তার দৃষ্টিভঙ্গি। যে কোনো বিষয় তিনি অতি স্বচ্ছভাবে উপলব্ধি করেন। ল্যাটিন সাহিত্য তার খুব প্রিয়।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত খুব সঙ্গীত প্রিয় ব্যক্তি। বাংলার গান তার আত্মস্থ। লৌকিক সুর তার চেতনায় ঝংকার তোলে। বীরভূম, পুরুলিয়া কিংবা রাজশাহী, রংপুরের সুর তিনি সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেন। তার ফিল্মে বাঁশির কোনো ঘন সুর এমনভাবে ব্যবহার করেন যে শরীর মন উচাটন হয়ে ওঠে। তার চলচ্চিত্রে আবহ সঙ্গীতও কবিতা হয়ে ওঠে। কথাচ্ছলে বুদ্ধদেব বলেছিলেন, আমার মা আমার শিক্ষাগুরু। তিনি কিছুটা সময় ঢাকার পল্টনে ছিলেন। আমার চিকিৎসক পিতার বদলির চাকরির সূত্রে।

মা পুরাতন বাংলা গান খুব ভালো জানতেন। মা বলতেন, ‘চোখ বন্ধ করে গান শুনতে হয়। তাহলে ছবি দেখা যায়। গানের কথা, গানের সুরে অনেক ছবি থাকে।’

মা পুরানো গান ধরতেন। আমরা চোখ বন্ধ করে গান শুনতাম। অনেক ছবি ভেসে উঠত গানের সুরে। এইভাবে ছবি দেখতে শুরু করলাম। সেই শৈশবেই সিনেমা তৈরির ভিডিও স্থাপন হলো। এখনও আমি গান শোনার সময় চোখ বন্ধ রাখি।’

পরবর্তী জীবনে কতো অসাধারণ দৃশ্যই না তৈরি করেছেন তিনি সেলুলয়েডে। বিশাল ক্যানভাস, আকাশ এবং নদী একাকার। পাখিদের নিয়ে শ্যুটিং, মানুষ যখন বাঘ সাজে, দৃশ্যের শেষ নেই। অবিশ্বাস্য জাদু বাস্তবতার মুখোমুখি তিনি দাঁড় করিয়ে দেন আমাদের। আমরা আশ্চর্য হয়ে এক গভীর অনির্বচনীয় জগতে প্রবেশ করি তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

বুদ্ধদেব দা’ নিজেই বলেন, যে শিল্পী অনুভূতির উচ্চতম স্থানে নিয়ে যেতে পারে না তা শিল্প হিসাবে ব্যর্থ।
তার ফিল্ম আমাদের উচ্চতম অনুভূতির সন্ধান দেয়।

\ তিন \
জীবনে বেশ কয়েকবার বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে একান্ত আড্ডা দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এ আমাদের সামান্য জীবনের পরম প্রাপ্তি। বুদ্ধদেব দা’র মত শিল্পবোধসম্পন্ন ব্যক্তির সান্নিধ্য পাওয়া অনেক বড় ব্যাপার।
২০১৬ সাল।
বৃষ্টিমগ্ন কলকাতা।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, চলচ্চিত্র সমালোচক প্রেমেন্দু মজুমদার, দাদার সহকারী মোহিনী দাশগুপ্ত, আমি, সাচ্চু, বিপ্লব এবং রোকেয়া প্রাচী। পার্ক স্ট্রিটের এক চীনা রেস্তোরাঁয় ব্যাপক আড্ডায় মত্ত হলাম।
আরেকবার ঢাকায়। ঝটিকা সফরে দাদা মোহিনী এবং প্রেমেন্দু মজুমদার এসেছেন ঢাকায়। উঠেছেন গুলশান ক্লাবে। টোপের প্রিমিয়ার শো হয়েছে সেখানে। পরদিন দাদা বললেন,
আমীরুলের বাসায় আমি আড্ডা দিতে চাই। নিরিবিলি। শুধু আমরা কয়েকজন।
দাদা অনাবশ্যক আড্ডা পছন্দ করেন না। ভিড়, অকারণ স্তুতি, অভিনয়ের সুযোগ, টিভির সাক্ষাৎকার, চাটুকারিতা এসব ভীষণ অপছন্দ তার। খুব রিক্ত হন। সন্ধ্যার পর আমাদের গরীব পল্লীতে এলেন। হৃদয়ের উষ্ণ আন্তরিকতার কাছে তিনি পরাজিত হন। আমরা সামান্য হলেও আমাদের কাছেই তিনি ফিরে ফিরে আসেন। মহা কেউকেটাদের কাছে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। কেতাদুরস্ত পরিবেশ তার পছন্দ নয়।

আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মত প্রাণখোলা আড্ডা তিনি খুব উপভোগ করেন।
সেদিনের আড্ডায় ছিলেন আসর রঙিন করে বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত স্বয়ং। পাশে প্রেমেন্দু মজুমদার এবং অসাধারণ ফিল্মবোদ্ধা, বুদ্ধদেব-ভক্ত মোহিনী দাশগুপ্ত। আমরা মুখোমুখি কয়েকজন সাইয়ীদ ভাই, বিপ্লব, রোকেয়া প্রাচী, শিরীন বকুল, আহমাদ মাযহার। আমার স্বহস্তে রান্না। বিভিন্ন রকম মাছ। কালোজিরের ফোড়ন। বেশি কিছু খাননি। তার তখন কিডনি সমস্যা। পান বন্ধ। প্রতি সকালে তিনি যোগ সাধনা করেন। বেশি রাত জাগেন না। কিন্তু আমাদের প্রতি তার ভালোবাসার কারণে দীর্ঘরাত পর্যন্ত আড্ডা চললো। কত কথা যে হলো!

চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, সাহিত্য, চিত্রকলা সকলকিছু ভ্রমণ করে নতুন দেশে পৌছে যাচ্ছি। এতো সুন্দর স্মৃতি জীবনে খুব বেশি হয় না।

দাদা খাবার টেবিলেও গভীর মনোযোগী। খুব সাধারণ খাবারই তার পছন্দ। পোশাক আশাকও পরেন খুব সাধারণ। ঢিলেঢালা প্যান্ট, হাওয়াই শার্ট। পায়ে আরামদায়ক কেডস। মাথায় কোন ক্যাপ। অন্তর্ভেদী চোখ। পুরো ফ্রেমের চশমা। ছোটখাট গড়ন। রহস্যময় হাসি। দাতগুলো ঝকঝক করে। গভীর আয়ত নয়নে মৃদুভাবে হাত তুলে কথা বলেন। তার হাতের তর্জনী তুলে দৃঢ় প্রত্যয়ে নিজের মতামত ব্যক্ত করেন। কথার মধ্য কবিতার গন্ধ মিশে থাকে।

তীব্র রসিকতাবোধ আছে। তার ফিল্মের চিত্রনাট্যেও তার অসংখ্য উদাহরণ লুকিয়ে আছে। চ্যানেল আই কার্যালয়ে বসে একদিন হাসতে হাসতে বললেন, বাঙালির অনেক সংকট। বাঙালি মাত্রেই বিশ্বাস করে রবীন্দ্রনাথের পরে কোন কবি নেই। অর সত্যজিৎ রায়ের পর কোন চলচ্চিত্রকার নাই, বুঝলে?

আমরা হো হো করে হেসে ফেললাম। এই বাক্যের পরিহাসটুকু যে কেউ বুঝতে পারবেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের লেখালেখির পরিমাণও বিপুল। খুব বিমূর্ত ধরনের কবিতা লিখেন। তার কবিতা তার মতোই নিজস্ব। মৌলিক কাব্যভঙ্গি। কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে বারোটা।

চলচ্চিত্র বিষয়ে বিপুল পরিমাণ লেখালেখি। তার চলচ্চিত্র ভাবনা একান্তই তার মতো। চলচ্চিত্রের নির্মাণ কৌশল, ভালো ছবির বাজার, চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিকতা, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অগ্রযাত্রা, অগ্রজ চলচ্চিত্রকারদের মূল্যায়ন, প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্রের রক্তক্ষরণ নানা বিষয়ে তার অনুসন্ধানী প্রবন্ধ, স্মৃতিগদ্য। ফিল্ম নিয়ে আমাদের নানা প্রশ্ন থাকে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, সে সবের সরল উত্তর খুঁজে বেড়ান বিদগ্ধ হৃদয় দিয়ে। অতি সম্প্রতি তার চিত্রনাট্য সমগ্রের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের বিপুল কর্মযজ্ঞের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। বিশ্ববিখ্যাত তিনি। কিন্তু খুব বিনয়ী। যাদের ভালোবাসেন তাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পারেন। যাদের পছন্দ করেন না তাদের প্রতি সীমাহীন ঔদাস্য।

নিজের ভেতরে নিজের মতো করে থাকতে ভালোবাসেন। যত নির্জনতা ততবেশি সৃষ্টিশীলতা।
কবিতা ও চলচ্চিত্রকে তিনি একসূত্রে মালা গেঁথেছেন। পৃথিবীর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল সাফল্য। তার প্রতি আমাদের নিরন্তর অভিবাদন।

করোনা মহামারিতে বহুদিন কলকাতা যাওয়া হয়নি। বুদ্ধদেব দা’এর সাথে দেখাও হয়নি। সবসময় ভাবতাম, এই তো যাব কলকাতা। দাদার সঙ্গে কবিতা ও শিল্প নিয়ে আড্ডা হবে। সোহিনীদি’র ফেসবুকে তার খবর পেতাম।

১০ জুন সকালে দীপ মুখোপাধ্যায় ফোনে দুঃসংবাদ দিলেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে আর দেখা হবে না। তার কবিতা, গদ্য রচনা ও চলচ্চিত্রের মধ্যে তিনি বেঁচে থাকবেন। শেষ অভিবাদন দাদা।

বিজ্ঞাপন