চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিশ্বের দীর্ঘতম বিরতিহীন বিমানে ভ্রমণ

বিশ্বের দীর্ঘতম বিরতিহীন যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্যারিয়ার কান্তাস এয়ারওয়েজ। কান্তাসের ৭৮৭-৯ বোয়িং বিমানটি ৪৯ জন আরোহী নিয়ে সরাসরি নিউইয়র্ক থেকে সিডনির পথে ১৯ ঘণ্টা ১৬ মিনিটে ১৬ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছে। শনিবারে রওনা হয়ে ফ্লাইটটি রোববার সকাল ৭টা ৪৩ মিনিটে সিডনি পৌঁছায়।

বিমানটির পরীক্ষামূলক যাত্রায় সঙ্গী হয়েছেন ব্লুমবার্গের সাংবাদিক অ্যাঙ্গাস হুইটলি। তিনি ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় বলেছেন, একবার জ্বালানী ভরে এ বিমান টানা ১৬ হাজার কিলোমিটার যাত্রা করতে সক্ষম। দীর্ঘ সময়ের যাত্রায় বিমানচালক, ক্রু ও যাত্রীদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে তা নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে এই বিমানের উড়াল। ভরা যাত্রী নিয়ে এ ধরনের দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমের ক্ষমতা এখনও বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত কোনো উড়োজাহাজের দেখা যায়নি আগে। পুনরায় জ্বালানি ভরার বিড়ম্বনা এড়াতে কান্তাসের এ নিউইয়র্ক-সিডনি ফ্লাইটটি ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ জ্বালানি নিয়ে রওনা দিয়েছিল। আরোহীদের ব্যাগের ওজন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং উড়োজাহাজটিতে কোনো কার্গো নেয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

দুর্দান্ত এই বিমান ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় ওই সাংবাদিক লিখেন, ‘আমি সবেমাত্র ১৬,২০০ কিলোমিটার (১০,১০০ মাইল) এর বিশ্বের দীর্ঘতম নতুন বিমান ভ্রমণ শেষ করেছি। এটি ছিলো সুদূর নিউইয়র্ক থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি পযন্ত বিরতিহীন  ম্যারাথন যাত্রা। এই যাত্রা ছিলো প্রায় সাড়ে ১৯ ঘণ্টা। অভিজ্ঞতা ছিলো দুর্দান্ত। বিশ্ব রেকর্ড করে কান্তাস এয়ারওয়েজ লিমিটেডের ফ্লাইটটি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবতরণ করে রোববার ভোরে। বোয়িং ড্রিমলাইনার তার যাত্রীদেরকে অক্ষত অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে। আমরা প্রথম দিকে নিশ্চিত ছিলাম না যে আসলে আমাদের কি হতে চলেছে!

“মূলত কান্তাস ২০২২ সালে বাণিজ্যিকভাবে তার নিয়মিত চলাচল শুরু করার অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলক ভ্রমণটি করেছে। সঠিক সময়ে এই যাত্রা কিভাবে সম্পন্ন হলো সেই চিন্তা করাটা ছিলো অবিশ্বাস্য ব্যাপার”!

তিনি জানান, তখন ছিলো নিউয়র্ক সময় সকাল ৯টা। বিমানটি সবেমাত্র জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে গেছে। এটি ইতোমধ্যে একটি উড়ন্ত পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। যেহেতু বিরতিহীন গন্তব্যে যেতে হবে। দীর্ঘ এই যাত্রার সঙ্গে আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। শুরুতে আমাদের ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে সিডনির সময়ে চলে যেতে হয়। জেটল্যাগ কমাতে পূর্ব অস্ট্রেলিয়ায় যতক্ষণ রাত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত জাগিয়ে রাখার চেষ্টাও হয়। উড্ডয়নের ছয় ঘণ্টা পর বেশি কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার দেয়া হয়। এরপর ভেতরকার আলো কমিয়ে ঘুমানোর পরিবেশ তৈরি করা হয়। এ যাত্রায় শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হয়েছে আমাদেরকে। বিমানের ভেতরে ব্যায়ামের ক্লাস এবং বিভিন্ন টাইম জোন পার হওয়ার সময় শরীরে কী ধরনের প্রভাব পড়ে সেটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। বিমানের ভেতরের খাওয়া-দাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অ্যালকোহলকে সীমিত করা হয়। ব্যায়াম ও ঘুমের জন্য পূর্ব পরিকল্পিত সময়সূচি অনুসরণ করা হয়।

দুই ঘণ্টা পর ছিলো খাবারের।বিশেষ ব্যবস্থা। বিশেষভাবে রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হয়। এর মধ্যে সুস্বাদু চিংড়ি রান্না। তিলের বীজযুক্ত মশলাদার চাইনিজ স্টাইলের একধরনের খাবার ছিলো দারুন।

বিমানে ভ্রমণের আগে একজন ট্রাভেল ডাক্তারের সাথে কথা বলার পর আমি আমার রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করার জন্য সরঞ্জাম সজ্জিত করি এবং আমার হৃদযন্ত্র ও অক্সিজেন লেভেল পরিমাপ করি। এছাড়াও আমার স্মৃতি পরীক্ষা এবং মেজাজ বিষয়ে তদারকি করি। আমি দেখতে চেয়েছি যে, এই দীর্ঘ যাত্রাটি আমার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করে কিনা! বিমান ভ্রমণের প্রথম তিন ঘণ্টায় আমার সেসব পরীক্ষাগুলি প্রতিফলিত হতে দেখেছি। আমার রক্তচাপ কিছুটা উচ্চ হয় এবং আমার হার্টবিট বেড়েছে। আমার মেজাজ ঠিক ছিলো। তবে ধীরে ধীরে তা চড়াও হয়েছে। এই পরীক্ষার শারীরিক চাপ স্পষ্ট দেখা গেলো। আমার চারপাশে যাত্রীরা সজাগ থাকার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যায়াম করছেন। বিমানের ক্রুরা যাত্রীদের ক্লান্তি দূর করতে নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

“যাত্রীবাহী গবেষণার তদারকি করছেন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেরি ক্যারল, বিমানের যাত্রীদের সবকিছু দেখাশোনা করছেন। একসময় দেখা যায়, সবাই খাবার ট্রলির দিকে ঝুঁকছেন।

হুইটলি বলেন, বিমানের সাত ঘণ্টার সময় দ্বিতীয়বার খাবার আসে। আমার জন্য এটি সময় পাস করতে সত্যি দারুণ সহযোগিতা করেছে। এবারের মেনুটা দারুণ। এই খাবারের ঘুমাতে উদ্বুদ্ধ করে। শর্করাযুক্ত খাবার, ক্রিম ফ্রেচযুক্ত মিষ্টি আলুর স্যুপটি ঘন করা। বিলাসবহুল টোস্টযুক্ত পনির স্যান্ডউইচ। বিমানের শেফ আমাকে বলেন যে, তিনি তিন দিন ধরে আমাদের এই খাবার প্রস্তুত করছেন।

“এবার লাইটগুলো ম্লান হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আমি মুক্ত হয়েছি।  ছয় ঘণ্টা ঘুমে তলিয়ে গেলেন সবাই”!

চতুর্দশ ঘণ্টায় আমার পরীক্ষাগুলি কাজ করছে। আমি মোকাবিলা করতে পেরেছি। আমার ব্লাড প্রেসার যা সিডনির চিকিৎসায় বলেছেন, মানসিক চাপ ও ক্লান্তি ঠিক আছে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। আমার হৃদকম্পন্ন ধীরে সুস্থে কাজ করছে, আমার স্মৃতিশক্তি ও মেজাজ ঠিক হয়েছে।

“সতেরতম ঘণ্টায় সকালের খাবারের সময় এসেছে ভেষজ খাবার, যা স্বস্তিদায়ক ও সন্তুষজনক”।

হুইটলির বর্ণনা মতে, সিডনি ভিত্তিক বিনিয়োগকারী নিক মোল নিয়মিত বিমানযাত্রী, তিনি আমাকে  বলেছেন যে, প্রায় আট ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন এবং বেশ ভালো লাগছে তার।

হুইটলি আরো জানান, দীর্ঘ যাত্রা শেষে সিডনিতে অবতরণের পর আমার ভালো লাগছে।  গন্তব্যে পৌঁছার পর কান্তাসের গ্রুপ সিইও অ্যালান জয়েস বললেন যে, ফ্লাইটটি তাকে আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছে।

“বিমানের যাত্রা ভালো ছিলো। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে সিডনি-নিউইয়র্ক যাত্রায় একবার বিরতি থাকাকে প্রাধান্য দিব। বিমানের প্রথমার্ধে নিদ্রাহীন থাকার বিষয়টি অনেককে ভোগাতে পারে। তবে বিরতিহীন ও দ্রুত গন্তব্যে যেতে এই বিমান দারুণ সুযোগ’।

Bellow Post-Green View