চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিশ্বকাপের অংশ হতে চাইনি: এবি

বিশ্বকাপের ঠিক আগেই অবসর ভেঙে সাউথ আফ্রিকা দলে ফিরতে চেয়েছিলেন এবি ডি ভিলিয়ার্স। তার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ড (সিএসএ)।

বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে ফেরার আবেদন করেছিলেন এবি। দলের অধিনায়ক ফ্যাফ ডু প্লেসিস, কোচ ওটিস গিবসন এবং নির্বাচক প্রধান লিন্ডা জোন্ডির কাছে এই আবেদন করেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান হয়ে যায় সেই আবেদন।

বিজ্ঞাপন

এই খবর বের হতেই ক্রিকেট বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। তবে সাউথ আফ্রিকার সাবেক তারকা ব্যাটসম্যান তখন মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। প্রোটিয়াদের বিশ্বকাপ অভিযানে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অবশেষে মুখ খুলেছেন ডি ভিলিয়ার্স।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে পোস্ট দিয়ে পুরো ঘটনা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন এবি। জানিয়েছেন, বিশ্বকাপে স্কোয়াডে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো রকম দাবি বা প্রস্তাব তিনি রাখেননি। সমালোচনা তৈরির উদ্দেশ্য নিয়েই তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও মনে করছেন তিনি।

তিনি লিখেছেন, ‘আমি যেদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেই (২০১৮ সালের মে মাসে), সেদিন আমাকে ব্যক্তিগতভাবে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “বিশ্বকাপের দরজা আমার জন্য খোলা আছে কি-না’। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। আমি প্রস্তাব দেইনি। আমি উত্তরে বলেছিলাম, ‘হ্যাঁ’। পরে মনে হয়েছিল, আমার না বলা উচিত ছিল।’

তবে প্রোটিয়া ক্রিকেট বোর্ডের যে ব্যক্তি তাকে প্রশ্নটি করেছিলেন, তার নাম উল্লেখ করেননি ডি ভিলিয়ার্স। আর প্রশ্নের জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলার মাধ্যমে এবি বোঝাতে চেয়েছিলেন, যদি প্রয়োজন হয় তবে আবার খেলবেন তিনি।

ভিলিয়ার্স যোগ করেছেন, ‘এরপর সপ্তাহ গড়িয়ে গেল। মাস গড়িয়ে গেল। আমার এবং সাউথ আফ্রিকা বোর্ডের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি। আমি তাদেরকে ফোন করিনি। তারাও আমাকে করেনি। আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম (অবসরের) এবং প্রোটিয়ারা তাদের মতো করে এগিয়ে গেছে।’

খবর ছিল দলের অধিনায়ক ফ্যাফ ডু প্লেসিস, কোচ ওটিস গিবসন এবং নির্বাচক প্রধান লিন্ডা জোন্ডির কাছে এই আবেদন করেন তিনি। কিন্তু এবি বলছেন, ‘ফ্যাফ (দু প্লেসি) ও আমি স্কুলজীবন থেকে বন্ধু। বিশ্বকাপ স্কোয়াড ঘোষণার দুদিন আগে আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম, হালকা আলাপের জন্য। তখন আমি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) ভালো ফর্মে ছিলাম। কথায় কথায় এক বছর আগের ওই ঘটনাটা তাকে বলি যা আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- যদি প্রয়োজন হয়, তবে আমাকে পাওয়া যাবে। যদি কেবলই প্রয়োজন হয়।’

ইএসপিএন ক্রিকইনফো তখন জানিয়েছিল, দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান হয়ে যায় মিস্টার ৩৬০ ডিগ্রির আবেদন। এবিডির আবেদন খারিজ করতে নাকি বেশি ভাবতেই হয়নি প্রোটিয়া বোর্ড ম্যানেজমেন্টের। এখন এবি জানাচ্ছেন, ‘আমি কোনো দাবি করিনি। প্রতিযোগিতা মাঠে গড়ানোর শেষ মুহূর্তে আমি জোর করে বিশ্বকাপ দলে ঢুকতে চাইনি আর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রত্যাশাও করিনি। আমার দিক থেকে জোরালো কোনো দাবি ছিল না, অন্যায্য কিছুও ছিল না।’

‘তারপর, হঠাৎ করে, যেদিন ভারতের কাছে সাউথ আফ্রিকা হেরে গেল, সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের (দু প্লেসির সঙ্গে) ওই আলাপের বিষয়টি গণমাধ্যমে ফাঁস হল আর এমনভাবে বিকৃত করা হল যেন আমাকে সবচেয়ে বাজেভাবে উপস্থাপন করা যায়। ঘটনাটা আমি বা আমার সঙ্গের কেউ ফাঁস করিনি। ফ্যাফও করেনি। সমালোচনা তৈরির উদ্দেশে সম্ভবত কেউ এটা করেছে। আমি জানি না’-যোগ করেন ডি ভিলিয়ার্স।

তিনি আরও বলেন, ‘এর ফলে আমাকে অন্যায্যভাবে অহংকারী, স্বার্থপর, দ্বিধাগ্রস্ত বলা হয়েছে। কিন্তু আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, আমার বিবেক পরিষ্কার। আমি যুক্তিসঙ্গত কারণেই (পরিবারকে সময় দেয়া) অবসর নিয়েছিলাম। আর যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বিশ্বকাপে আমাকে পাওয়া যাবে কি-না, তখন ফেরার দরজা খোলা রাখতে রাজি হয়েছিলাম। আমাকে ছাড়াই প্রতিযোগিতায় (বিশ্বকাপে) গেছে দল। তাতে কোনো সমস্যা নেই। আমি কারও ওপর রেগে নেই।’

দলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে এবি লিখেছেন, ‘এই অপ্রীতিকর ও অপ্রয়োজনীয় কাহিনীতে আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করার শেষে বলতে চাই, দলকে প্রবলভাবে সমর্থন দেয়াটা আমি চালিয়ে যেতে যাই। এই খেলাটা আমার জীবনকে একটা সুনির্দিষ্ট রূপ দিয়েছে এবং অনেক চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব প্রদান করেছে ও অবিশ্বাস্য সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

খবরে বলা হয়েছিল, প্রাথমিকভাবে দুটি কারণে এবি ডির আবেদন খারিজ হয়ে যায়। প্রথম কারণ, ২০১৮’র মে, অর্থাৎ ঠিক এক বছর আগে অবসর নিয়েছিলেন ডি’ভিলিয়ার্স। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করার জন্য সাউথ আফ্রিকা দলের মাপকাঠি পূরণ করেননি তিনি। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে হলে, এই এক বছরে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে হত তাকে।

দ্বিতীয় কারণ, এবিকে দলে নিতে গেলে তার অনুপস্থিতিতে খেলা ক্রিকেটারদের একজনকে বাদ দিতে হত, যেটা অন্যায়। সাউথ আফ্রিকা দলে এবির জায়গায় এখন ব্যাট করেন ভ্যানডার ডুসেন। যথেষ্ট ভালোও করেছেন তিনি। এবিকে নিতে গেলে কোপ পড়ত ডুসেনের উপরই।

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম তিন ম্যাচেই হারে সাউথ আফ্রিকা। ৯ ম্যাচে মাত্র তিনটিতে জিতে দশ দলের বিশ্বকাপে সাতনম্বর হয়ে শেষ করে প্রোটিয়ারা। মিডলঅর্ডারে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা বারবার মনে করায় ডি ভিলিয়ার্সের কথা। ওই অবস্থাতেই আবার এবির ফেরার আবেদন প্রত্যাখ্যানের খবর আসে। কিন্তু বোর্ড তখন জানায় এনিয়ে বোর্ডের কোনো আক্ষেপ নেই

তখন বিবৃতিতে সিএসএ’র প্রধান নির্বাচক জোন্ডি বলেন, ‘এক বছর আগে অবসর নিয়ে তিনি (এবি) নিজেই নিজেকে নির্বাচনের বিবেচনার বাইরে নিয়ে গেছেন। আমাদের স্কোয়াড চূড়ান্ত এবং নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার একদিন আগে যখন আমার কাছে খবরটা এল, তখন কিছুই করার ছিল না।’

এরপর জোন্ডি বলেন, ‘এবি নিঃসন্দেহে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম, তবে সর্বোপরি, আমাদের নৈতিকতা এবং নীতিগুলোর প্রতি সত্য থাকতে হবে। এই সিদ্ধান্তে আমাদের কোনো দুঃখ বা অনুশোচনা নেই।’

সিএসএ মনে করে, ডি ভিলিয়ার্সের পক্ষ থেকে এটা (বিশ্বকাপ) এখন সুযোগ-সুবিধাজনক বলে অনুভূত হয়েছে, যিনি এই ইভেন্টের আগেই সাউথ আফ্রিকার সঙ্গ ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু শেষমুহূর্তে আবার অংশ হতে চেয়েছিলেন।

জোন্ডি বলেন, ‘২০১৮ সালে অবসর না নেয়ার জন্য এবি ডি ভিলিয়ার্সের সঙ্গে আমি জোরাজুরি করেছিলাম। যদিও তখন একটি ধারণা ছিল যে, তিনি কোন ম্যাচগুলো খেলবেন বা খেলবেন না, এ নিয়ে একটা মতপার্থক্য আছে। কিন্তু কথাটা সত্য না। বরং আমি তাকে বিশ্বকাপে তরতাজা এবং ভালো জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মৌসুম ধরে ধরে পরিকল্পনা এবং পর্যবেক্ষণ করার বিকল্প বাতলে দিয়েছিলাম।’

ক্ষুব্ধ প্রধান নির্বাচকের আরও সংযোজন, ‘আমরা এটা পরিষ্কার করছি যে, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে তাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি সেটা না করে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে সই করেন। তিনি আমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, অবসর নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি সুখে আছেন।’

জোন্ডি স্বীকার করছেন, ডি ভিলিয়ার্সের অন্তর্ভুক্তির অনুরোধে তারা অবাক হয়েছেন এবং দলটির অন্যান্য খেলোয়াড়দেরও বিষয়টি একইরকম অবাক করেছে। বিশেষ করে যারা বিশ্বকাপের অংশ হিসেবে দলের সাথে থাকার জন্য কাজ করেছে।

জোন্ডি কথায়, ‘অধিনায়ক ফ্যাফ ডু প্লেসিস এবং কোচ ওটিস গিবসন ১৮ এপ্রিল আমাদের বিশ্বকাপ দল ঘোষণার দিনটিতে যখন এবির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ইচ্ছার কথা সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করেন, তখন সেটা আমাদের সকলের জন্য একটি ধাক্কা ছিল।’

‘এবি অবসরে যাওয়ায় একটা বড় শূন্যস্থান দেখা দেয়। আমরা সেই ফাঁকা পূরণ করতে একটা বছর ধরে ফ্র্যাঞ্চাইজি স্তরে খেলোয়াড় খুঁজেছি। আমাদের খেলোয়াড়দের কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে, যারা তখন তাদের হাত বাড়িয়ে ছিল এবং তারাই বিশ্বকাপে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার যোগ্য ছিল।’

গত বছরের মে’তে সবধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন ডি ভিলিয়ার্স। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি স্তরে বিশ্বজুড়ে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট খেলে যাচ্ছেন। ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রোটিয়াদের অধিনায়ক ছিলেন এবি, ওই আসরের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেয় তার দল।

Bellow Post-Green View