চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিবেক থেকে প্রশ্নটা অনেকেরই আসছে!

গাড়ি-ঘোড়ায় আমাদের মেয়েরা কতটা নিরাপদ? প্রশ্নটা দেশের মানুষকে খুবই ভাবিয়ে তুলছে। আজকাল পত্র/পত্রিকায় কিংবা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে চোখ ফেললেই দেখা যায়, পরিবহনে অর্থাৎ গাড়ি-ঘোড়ায় প্রায়ই ড্রাইভার, হেলপার কিংবা সুপারভাইজার দ্বারা মেয়েরা হয় ধর্ষণের শিকার হচ্ছে কিংবা যৌন হয়রানীর সম্মুখীন হচ্ছে। এমন কী পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়ে অনেক নিরীহ মেয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কিংবা দেশের সচেতন মানুষের মধ্যে আজ একটা প্রশ্ন জাগ্রত হচ্ছে যে, পরিবহনে মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের নেতারা কিংবা রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরা কতটা সচেতন আছেন? আবার এমন প্রশ্নও আসছে মানুষের মধ্যে আর কতদিন এমনভাবে মেয়েদেরকে পরিবহনের ড্রাইভার, হেলপার কিংবা সুপারভাইজার দ্বারা ধর্ষণের শিকার হতে হবে কিংবা যৌন হয়রানীর শিকার হতে হবে কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হতে হবে?

আজকাল আমাদের দেশে নারীদেরকে মানুষ রূপে গণ্য করা হয় কি না, প্রশ্নটা অনেকেই করছেন। সবার মনের মধ্যে একটা আশংকা কেউ না কেউ কিংবা কোন না কোনো পক্ষ সন্ত্রাসী এবং ধর্ষকদের হাতে আমাদের সকল ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন। তা না হলে আমাদের জীবন যাপনকে দুর্বিষহ করে তোলার সাহস সন্ত্রাসী কিংবা ধর্ষকরা কোথা থেকে পায়। পত্র/পত্রিকা খুললেই আমরা দেখতে পাই আমাদের সমাজে সমাজ বিরোধী সন্ত্রাসী গুন্ডা-পান্ডা কিংবা ধর্ষক ভূমিখেকো থেকে শুরু করে সমাজের যত রকম নষ্ট মানুষ আছে, তাদের সাহস এতটাই বেড়েছে যে, যা দেখলে বা শুনলে মানুষ চিন্তা করে পায় না কিভাবে তার সামনের দিনগুলো কাটাবে। সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষের রাতের ঘুম বিনষ্টকারী সন্ত্রাসী, ধর্ষকসহ সমাজ বিরোধীরা প্রতিনিয়ত সমাজের নিয়ম নীতি কিংবা রাষ্ট্রের আইন-কানুনকে বৃদ্বাঙ্গুলী প্রদর্শন করে নিরীহ মানুষের জায়গা জমি দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বুক উঁচু করে চালিয়ে যাচ্ছে। এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে ধর্ষণ হচ্ছে সমাজের নিরীহ মানুষের কাছে এখন এক মূর্তিমান আতংক। কেউ কেউ আবার বলেন, যারা নিরিবিলি সুখে শান্তিতে অন্য দশজনের মতো নিরাপদ জীবন-যাপন চালিয়ে যেতে চান কিংবা যারা কারো ভালো মন্দ নিয়ে কথাবার্তা না বলে নিরাপদে কারো সাতে পাঁচে না থেকে জীবন যাপন করে যেতে চান, বিপদটা তাদেরই বেশি। নিরাপদ জীবন যাপনকারী লোকজনেরা মনে করে থাকেন তারা যদি কারো ভালো মন্দে কিংবা সাতে পাঁচে না থাকেন, তাহলেই হলো। তাতেই তারা বিপদমুক্ত হয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। এই শ্রেণীর লোকেরা এ কথা বুঝেন না, আজ যারা নিরাপদ দূরত্বে থেকে কারো ভালোমন্দে এবং সাতেপাঁচে না থেকে সমাজ থেকে বিছিন্ন হয়ে স্বার্থপরের মতো একাকি জীবন যাপন করতে চান, বিপদ আপদ আজকাল তাদের পিছনেই বেশি করে ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ বলেন সন্ত্রাসীরা খুবই ভীতু প্রকৃতির হয়ে থাকে। কথাটা ঠিক নয়। ধর্ষক, সন্ত্রাসীরা বিকারগ্রস্থ হয়ে থাকে। তাদের চোখের সামনে ছোট বড় নারী পুরুষের কোনো কিছুর হিসাব থাকে না। সন্ত্রাসীরা মনে করে তারা যা করছে তাই ঠিক। তাই সমাজের শান্তি প্রিয় মানুষের রাত্রির ঘুম বিনষ্টকারী সন্ত্রাসী সমাজ বিরোধীরা বিশ্বাস করে, লোকালয়ের মানুষকে চোখ রাঙ্গিয়ে অবৈধ অস্ত্র ও ধর্ষণসহ খুনাখুনীর মতো কর্মকাণ্ড চলিয়ে করতলগত করে রাখতে হবে। তাই দেখা যায় আজকাল সমাজ বিরোধী সন্ত্রাসীদের বাড় এতটাই বেড়েছে যে, যা দেখে সমাজের শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষ প্রতিনিয়ত আতংকের মধ্যে বসবাস করে। আবার অনেকে বলে থাকেন সমাজ বিরোধী সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে হলে সামাজিক ঐক্যের প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক কার্যকলাপ সকল সময় ক্রিয়াশীল থাকায় সামাজিক ঐক্যের জায়গাটা তৈরি হয় না। আজকাল আমরা সব কিছু বিচার করে থাকি রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা ও ধ্যান ধারণা থেকে। আমাদের মধ্যে সামাজিক ঐক্য তৈরি হয় না বলেই সমাজ বিরোধী সন্ত্রাসীরা আমাদেরকে সকল ক্ষেত্রে সকল সময় পদানত করে রাখতে চায়। অনেকেই বলে থাকেন একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, সমাজ বিরোধী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বুক উঁচু করে যারা রুখে দাঁড়ায়, সমাজ বিরোধী সন্ত্রাসীরা তাদেরকে ঘাটাতে চায় না। আমাদের সমাজে দেখা যায় যেসব নারীরা সাহস করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় সেই সব নারীদের নষ্ট মানুষেরাও ভয় পায়। কথাগুলো ঠিক নয়। যারা সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায় কিংবা যেসব নারীরা সাহস নিয়ে চলতে চায়, দেখা যায় বিপদটা তাদেরই বেশি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বলছিলাম পরিবহনে আমাদের দেশের নারীরা কতটা নিরাপদ? আমাদের দেশে নারীরা কোথাও নিরাপদ নয়। পথে ঘাটে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাসে সিএনজিতে মাইক্রোবাসে সর্বত্র নারীরা অসভ্য বর্বর শিক্ষিত অশিক্ষিত সন্ত্রাসী ধর্ষক দ্বারা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আজকাল বাসের ড্রাইভার হেলপার থেকে শুরু করে স্কুল কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত নারী ধর্ষণকারী রূপে নারীদের সামনে অবতীর্ণ হচ্ছেন। বাসের ড্রাইভার হেলপার সুপারভাইজার তার মহিলা যাত্রীদের ওপর ধর্ষণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ছে, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ছাত্রী শিক্ষকের মধুর স্নেহের সম্পর্কের কথা ভুলে আজকাল ছাত্রীদেরকে পড়ানোর বদলে নোট বা সাজেশন দেয়ার লোভ দেখিয়ে কন্যাসম ছাত্রীদেরকে ধর্ষণে করার জন্য উদ্যত হচ্ছেন। আবার এমন অভিযোগও আছে, বিভিন্ন অফিসের বড় কর্তারা নিজের মান সম্মানের কথা ভুলে তার অধস্তন নারী কর্মচারী বা কর্মকর্তাকে যৌন হয়রানী বা ধর্ষণে করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছেন। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয় যে, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে এক কলেজ ছাত্রীকে চলন্ত বাসের মধ্যে ধর্ষণে করার চেষ্টা করে বাসের ড্রাইভার, হেলপার। যৌন হয়রানীর শিকার কলেজ ছাত্রীটি নিজেকে ধর্ষকরূপী বাসের ড্রাইভার ও হেলপারের যৌন হয়রানী থেকে রক্ষা করার জন্য চলন্ত বাস হতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পেয়ে আহত হয়। শেষে গ্রামবাসী আহত কলেজ ছাত্রীটিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য প্রথমে দিরাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তাররা আহত কলেজ ছাত্রীটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। আমরা যদি বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিদিনের সংবাদগুলোর একটি পরিসংখ্যান করি, তাহলে দেখা যাবে সংবাদপত্রের সংবাদগুলোর মধ্যে নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা, কন্যা শিশুসহ বয়স্ক মহিলাদের ওপর যৌন হয়রানীর জঘন্য সংবাদ, যৌতকের জন্য গৃহবধূদের ওপর অত্যাচার কিংবা যৌতুকের জন্য গৃহবধূদের জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলা এবং ধর্ষণের মতো সংবাদ পত্রিকার পাতা জুড়ে রয়েছে। চলন্ত বাসে একাকী যাত্রী নারীদের ওপর যৌন হয়রানীর কিংবা ধর্ষণের পর মেরে ফেলার সংবাদ নতুন নয়।

বিজ্ঞাপন

পাঠক/পাঠিকা আমার আপনাদের মনে আছে কি না জানিনা, ২০১৮ সালে এক নারীকে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে ড্রাইভার হেলপারের লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। আগেই বলেছি এসব ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ধামরাই, মধুপুর, মানিকগঞ্জ, সাভার, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলন্ত বাসে, মাইক্রোবাসে মহিলা পোশাক শ্রমিক ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এসব জঘন্য ঘটনার বিচার হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকার নারীরা মান সম্মানের ভয়ে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ না করে সহ্য করে বসে থাকেন। কিছু কিছু ধর্ষণের শিকার নারীরা মান সম্মানের ভয়ে বিচার প্রার্থী না হয়ে সহ্য করে বসে থাকলেও, তারা কিন্তু শান্তিতে থাকেন না। অপমানের যন্ত্রণায় ভিতরে ভিতরে নিজেদেরকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে তাদের কাছে অর্থাৎ ধর্ষণের শিকার নারীদের বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই আমরা অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা জানতে পারি ধর্ষণের শিকার নারীরা আত্মহত্যার মাধ্যমে তাদের সুন্দর জীবনের ইতি ঘটান। ধর্ষণের শিকার নারীরা আত্মহত্যার মাধ্যমে তাদের সুন্দর জীবনে ইতি ঘটান এই জন্য যে, আমাদের সমাজের সিংহভাগ মানুষ ধর্ষণের শিকার নারীদের ভালো চোখে দেখেন না। আবার আমাদের সমাজে এমন সব মানুষও আছেন, যারা অসভ্য বর্বর ধর্ষকদের দোষারোপ না করে ভুক্তভোগী ধর্ষণের শিকার নারীদেরকেই দোষারোপ করে থাকেন। আমাদের সমাজে এমন সব মানুষও আছেন, যারা নির্লজ্জের মতো অপরাধে কিংবা অপরাধীর বিরুদ্ধে কথা না বলে অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধেই কথা বলে থাকেন। যার জন্য আজ আমাদের দেশে চলন্ত বাসের ড্রাইভার হেলপারের কাছে নারী যাত্রী, স্কুল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্টানের শিক্ষকের সামনে তার ছাত্রী কিংবা অফিস পাড়ার বড় কর্তার সামনে তার অধস্তন নারী কর্মচারী কিংবা কর্মকর্তা আজ নিরাপদ নয়।

তাই বলছিলাম, নারীদের বাসে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা অফিস পাড়ায় নিরাপত্তা দিতে হলে সমাজের সিংহভাগ মানুষকে অপরাধকে অপরাধ বলতে হবে এবং অপরাধীর সকল অপরাধের বিচারের জন্য সোচ্চার হতে হবে। ধর্ষণ কিংবা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত নারীদের পাশে আন্তরিকভাবে দাঁড়াতেই হবে। তবেই নারীদেরকে আমরা একশভাগ নিরাপত্তা না দিতে পারলেও কিছুটা হলেও নিরাপত্তা দিতে পারব।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)