চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন ও রাজনীতি

গণতান্ত্রিক ভাব ধারার রাজনীতিতে যে কোন দেশেই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অর্থাৎ ভোটের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার রীতি প্রচলিত এবং এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। ভোটের রাজনীতিতে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ করাও নান্দনিকতার পরিচায়ক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রের পরিপূরক। রাজনীতিতে পক্ষে বিপক্ষে মতামত থাকতেই পারে এবং থাকার ফলেই প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের মতামতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে যৌক্তিকতায় উপনীত হয়।

বিরোধপূর্ণ ও বৈরী পরিবেশ হলেই যে নির্বাচন বয়কট করতে হবে সেটা কোনভাবেই মানানসই নয়। তবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের ম্যান্ডেট সাথে নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমরা দেখেছি, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিল অর্থাৎ জনগণকে সার্বিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে স্বাধীনতার স্বপক্ষে ব্যাপক প্রচার প্রচারণাও চালিয়েছিল। কাজেই, আন্দোলন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ একই সাথে হতে পারে। অর্থাৎ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিদ্যমান সংকট, সমস্যায় জনগণকে একাত্ম করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাও রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে সেজন্য নির্বাচন কমিশন, সরকারি দল এবং বিরোধী দল প্রত্যেককেই স্ব স্ব জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনে প্রার্থীতা বয়কট একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সহনশীল রাজনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ যে দলটি কিংবা যে গ্রুপটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না সে দলের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ ও নেতারা ক্রমশই কর্মী সমর্থকদের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর যে কোন দলের জন্য কর্মী সমর্থকরাই হচ্ছে দলের অন্তঃপ্রাণ। কেননা, কর্মী সমর্থক ছাড়া কোন দলের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

আমি যতটুকু মানুষের সাথে কথা বলে জেনেছি: প্রত্যেক দলের সমর্থকরা চায় তাদের সমর্থনকারী দল যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে কর্মীরা উজ্জীবিত হয় এবং দলের আহবানে সাড়া দিয়ে সভা সমাবেশে অংশগ্রহণ করে থাকে এবং নতুন নতুন সমর্থকও সংযুক্ত হয় উক্ত দলটিতে। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে বেশ কিছু রাজনৈতিক দল বিভিন্ন সময়ে দলীয় নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মী সমর্থকদের জমায়েত হতে আহবান করলেও সেভাবে সাড়া মিলছে না। তাহলে কি বোঝা যাচ্ছে, দলগুলোর জনসমর্থন নেই। অবশ্যই রয়েছে; কারণ দলগুলো রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল এবং তাদেরও বেশ ভালই সমর্থন রয়েছে সারা বাংলাদেশে। কিন্তু কর্মীদের সাথে নেতাদের নানাবিধ কারণে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় নেতাদের নির্দেশ তারা মানছেন না কিংবা নিজেদেরকে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোর স্থিতাবস্থা এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির ক্ষেত্র কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় ফলে জনগণের প্রতি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতা কতটুকু পালিত হবে সেটি সময়ই বলে দিবে। কারণ, অনেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনেও অনেককেই দেখেছি নির্বাচিত হতে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নির্বাচনি মেনিফেস্টো উপস্থাপন করে ভোট আহবান না করার ফলে জনগণের কাছে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি না থাকায় জনপ্রতিনিধি কতটুকু জনগণবান্ধব হয় সময়ই সেটা বলে দিবে। তবে ইস্যুগুলো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় বিরুদ্ধাচরণ করে থাকে। কাজেই, রাজনৈতিক দলগুলোকে ভবিষ্যতের ইতিবাচক রাজনীতির চর্চার পথ প্রশস্ত করত ব্যবস্থাগ্রহণকল্পে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে অনন্য গণতান্ত্রিক চর্চার রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলো যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেজন্য সরকারি দল বা বিরোধী দলের পারস্পারিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধাবোধ ও পেশাদারিত্বের বিকল্প নেই। সব দলগুলো একত্রিত হয়ে এমন একটা রাজনৈতিক মধ্যস্থতা করা প্রয়োজন যার উপর ভিত্তি করে নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হয়ে জনগণের সামনে উপনীত হয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। তবে সবকিছুই হতে হবে আমাদের প্রচলিত সংবিধান ও বিধি মোতাবেক। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের যথোক্ত ভূমিকা পালন ব্যতীত রাষ্ট্র কখনো কল্যাণকর রাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে না। সরকারি দলের কাজের ও উদ্যোগের রক্ষণশীল সমালোচনা করতে হবে এবং উন্নয়নমূলক কাজের প্রশংসা করতে হবে যার ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পারিক সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গ। নির্বাচন কমিশনের কার্যবিধি, গতিবিধি ও নিরপেক্ষতার উপর একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নির্ভর করে থাকে। তাই নির্বাচন কমিশনকে সব দলের যৌক্তিক মতামতের উপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণও আশ্বস্থ হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে সব দলের আস্থায় থেকে নির্বাচন পরিচালনা করা উচিত। অন্যথায় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে ধরনের প্রস্তাব দেওয়া হবে তার মধ্যে যেগুলো সাংবিধানিক ও বাস্তবসম্মত সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ সাপেক্ষে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা যায়।

নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দর কষাকষির চিত্র আমরা দেখতে পাই। তবে আমাদের সংস্কৃতিতে কেউ কাউকে সামান্য ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না, যার কারণে বিদ্যমান সংকট আরও ঘনীভূত হয় এবং একটি পক্ষ হয়তো রয়েছে যারা রাজনৈতিক দলগুলোকে উসকানি দিয়ে বিরোধকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করে থাকে। কারণ, মহান স্বাধীনতার পর থেকে পরাজিত গোষ্ঠী ও তাদের দোসররা বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশী বিদেশী গোষ্ঠী এবং চক্র মনে করে বাংলাদেশকে যদি অস্থিতিশীল রাখা যায় তাহলে জিডিপি রেট কমে যাবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ করা যাবে। আর বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার মুখ্য হাতিয়ার হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধপূর্ণ অবস্থান টিকিয়ে রাখা।

বিজ্ঞাপন

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকলে কিছুদিন পর পর হরতাল, অবরোধ ও জ্বালাও পোড়াও রাজনীতির সহিংস চিত্র আমরা দেখতে পাই এবং এর ফলে প্রতিদিন বাংলাদেশের বড় অংকের টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, হরতাল অবরোধ চলাকালে ঘরের বাইরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও করা দুস্কর হয়ে যায়। ঢাকাসহ সারাদেশে একশ্রেণির পশুবৃত্তি ধারণকারী মানুষের হিংস্র ও জঘন্য অত্যাচারে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। এ রকম বিরোধপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পারিক বিশ্বাস এবং আস্থার সংকট পরিলক্ষিত হয় এবং নির্বাচনের পূর্বে নানা বিষয় নিয়ে মতবিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।

মতানৈক্য না হলে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন বয়কট করে থাকে। নির্বাচন বয়কটের রাজনীতির ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য সুখকর নয়। পরস্পর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বি না হলে নির্বাচন জমে ওঠে না, নির্বাচনের আমেজও নষ্ট হয়ে যায়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে যে সকল ক্ষয়ক্ষতির সন্মুখিন হব আমরা, তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

মানুষ রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বে, রাজনীতিতে কোন অভিভাবক তাঁর ছেলেকে কিংবা মেয়েকে অনু্প্রেরণা দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করবে না। রাজনীতিতে যদি মেধাবী ছেলেমেয়েরা না আসে তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে একবার চিন্তা করা যায়! কেননা, আমরা যতই রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করি না কেন, এ কথাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশের আজকে যে অগ্রগতি তা কিন্তু রাজনীতিবিদদের হাত ধরেই এসেছে কিংবা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টিসহ অনবদ্য সব অর্জনই এসেছে রাজনীতিবিদদের হাত ধরে।

অনেক জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচন হওয়ায় ঐ এলাকার ভোটাররা ভোটাধিকার প্রদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। যেমন: উপজেলা চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ফলে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার জন্য ভোটাররা সহজে ভোটকেন্দ্রে যেতে চায় না। ফলস্বরূপ দেখা যায়, ঐসব এলাকায় ভোটারের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। এ রকম হলে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচন হলে দেশ পরিচালনা নিয়ে অনেকের আগ্রহ কমে যায়। অনেকেই জানেন না (যারা বাড়ির বাইরে থাকেন) তাদের এলাকায় কবে ভোট হচ্ছে এবং এ নিয়ে তাদের আগ্রহও দেখা যায় না। আবার কারা নির্বাচিত হয়ে আসছেন সেটাও অনেকেই খোঁজখবর নিচ্ছেন না এবং এর ফলে জনগণের সাথে প্রতিনিধিদের একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে আসছে এবং সেটি অবশ্যই গণতন্ত্রের জন্য নেতিবাচক।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ক্রমান্বয়ে কমে আসে। কেননা, নির্বাচনে পক্ষ বিপক্ষ থাকবে এবং প্রার্থীদের দল এবং তাদের ব্যক্তিগত কারিশমার যোগসাজশে ভোটাররা যাচাই বাছাই করে যোগ্য প্রার্থীকে ভোটাধিকার প্রদানের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন করে থাকে। প্রার্থীবিহীন নির্বাচনের ক্ষেত্রে এরকম কোন সুযোগ না থাকায় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ক্রমান্বয়ে কমে আসছে।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচনের কারণে দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে দেশ ক্ষয়ক্ষতির সন্মুখীন হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজকর্মের সমালোচনার জন্য হলেও একটি পক্ষ থাকতে হয় এবং এর ফলে জবাবদিহিতার জায়গায় একটি অবস্থান সৃষ্টি হয় এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সমন্বয়ে ভাল কাজ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন নির্বাচনের নজির দেখা যাচ্ছে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে এ সংস্কৃতি বহমান থাকলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য তা দুশ্চিন্তার উদ্রেকই বটে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)