চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিনা চিকিৎসার মৃত্যু উপত্যকা

আমরা এমন এক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলেছি যেখানে তরুণদের সর্বোচ্চ স্বপ্ন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ। কিন্তু, আমরা এমন অমানবিক এবং বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রও গড়ে তুলেছি যেখানে সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন সচিবকেও হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে শেষ পর্যন্ত বিনা চিকিৎসায় মরে যেতে হয়।

সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিবের দুঃখজনক মৃত্যু সংবাদ আমরা দেখেছি। বিষয়টি আরো মর্মান্তিক যখন আমরা জানলাম যে, তার কন্যা একজন চিকিৎসক এবং চিকিৎসককন্যা পিতাকে হাসপাতালে হাসপাতালে নিয়ে তিনি যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন সেটা বোঝানোর চেষ্টা করলেও কোথাও চিকিৎসা পাননি। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত যোগাযোগে একটি কোভিড হাসপাতালে তাকে ভর্তি করানো সম্ভব হলেও কয়েক ঘণ্টা পর ওই অতিরিক্ত সচিবের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসককন্যা বলেছেন, তার পিতা যদি যেকোনো হাসপাতালে একটি আইসিইউ সুবিধা পেতেন তাহলে হয়তো তাকে চলে যেতে হতো না।

Reneta June

করোনাকালে এই অতিরিক্ত সচিবের মৃত্যুই বিনা চিকিৎসায় প্রথম নয়, শেষও নয়। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই আমরা এরকম চিত্র দেখছি। অসুস্থ কাউকে চিকিৎসা দিলে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ঘটতে পারে এমন আশঙ্কায় বেশিরভাগ হাসপাতালে এক ধরনের চিকিৎসাহীনতা আমরা লক্ষ্য করছি। তাদের আশঙ্কা যে অমূলক সেটা বলা যাবে না। কারণ করোনা সংক্রমণ আছে, কিন্তু পরীক্ষা না হওয়ার জন্য শনাক্ত হননি, এমন রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে শত শত চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। বিপরীতে কোভিড হাসপাতালে কেউ আক্রান্ত হননি। এর মানে হচ্ছে, সাধারণ হাসপাতালগুলোতে শুরুতে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সেই সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়নি যেটা কোভিড হাসপাতালে নিশ্চিত করা হয়েছে। আবার যখন সব হাসপাতালেই বিশেষ করে পিপিই এবং এন-৯৫ মাস্কের মাধ্যমে সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তখন আগের ভীতি থেকে চিকিৎসকরা আরা স্বাস্থ্যসেবায় এগিয়ে আসছেন না।

বিজ্ঞাপন

মৃত্যুবরণ করা অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ

এই যে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা এর মূল কারণ পরিকল্পনাহীনতা। এটা আর নতুন করে বলার দরকার নেই যে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আমাদের মন্ত্রীদের বাগাড়ম্বর থাকলেও উপযুক্ত পরিকল্পনা ছিল না। থাকলে জানুয়ারি মাস থেকেই আমাদের সচেতনতা ও প্রস্তুতি থাকতো, কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা আছে এমন হাসপাতালকে কোভিড হাসপাতাল করা হতো, করোনাগ্রাসে পড়ার আগেই কোভিড এবং নন-কোভিড সব হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ হতো এবং যার ফলে শুরুতেই চিকিৎসকরা আক্রান্ত হয়ে পড়তেন না; এবং সব হাসপাতালে আলাদা রেড-অরেঞ্জ-গ্রিন জোন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদেরসহ সব ধরনের রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যেতো। তাহলে একজন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে একজন সচিব পর্যন্ত কাউকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হতো না।

এসবের যে অনেককিছুই হয়নি তার কারণ আমরা জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক একটা রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। মহল্লার ছিঁচকে মাস্তান থেকে শুরু করে শীর্ষ ব্যবসায়ী সবাইকে আমরা রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তুলেছি, কিন্তু তাদের বেশিরভাগই গড়ে উঠেছে উপহার হিসেবে পাওয়া পদ-পদবীর জন্য। তাদের নিজের কোনো অর্জন নেই, যা আছে সেটা হচ্ছে শীর্ষ থেকে পাওয়া উপহার। মন্ত্রী-এমপিরাও সেটা থেকে ব্যতিক্রম নন। নীতি-নির্ধারকরা প্রো-অ্যাকটিভ নন, যাদের মাধ্যমে তারা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন সেই আমলারাও না। রাজনীতিকরা আছেন নিজেদের আখের গোছানোর জন্য, আমলারা চাকরিজীবনটা কোনোভাবে কাটিয়ে দিয়ে অনেক ব্যক্তিগত সম্পদসহ অবসরে যাওয়ার জন্য। ব্যতিক্রম যে নেই তেমন নয়, তবে যেটা হওয়া ছিল স্বাভাবিক সেটা ব্যতিক্রম হয়ে গেছে, যে দুয়েকটা ব্যতিক্রমী ঘটনা হওয়ার কথা সেগুলো হয়ে গেছে নিয়মিত ঘটনা।

করোনাভাইরাস এসে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো আমরা কতোটা জবাবদিহিহীন ও অমানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলেছি যেখানে সবাই ব্যক্তিগত লাভালাভ এবং ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পেছনে ছুটছেন। এ রাষ্ট্র আমাদের মন্ত্রী-এমপি- সচিব হতে স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু তাদের যে দায়িত্ববান-উদ্যোগী-মানবিক হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা, সেটা শেখায় না বা শিখতে উৎসাহ দেয় না। সেটা হলে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। সচিবসহ কেউ বিনা চিকিৎসায় মারা যেতেন না, কোভিড হাসপাতালগুলোতেও রোগীদের উপযুক্ত চিকিৎসা হতো।

যে করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে এতো আলোচনা, সেই ভাইরাস কিন্তু আমাদের এ শিক্ষাও দিলো যে, ব্যক্তিগত সম্পদ খুবই তুচ্ছ যদি না সেটা সমষ্টির কল্যাণ নিশ্চিত করে। আমাদের প্রেক্ষাপটে এ মুহূর্তে এ কল্যাণ একটি সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং মানুষের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ।

করোনাউত্তরকালে তাই স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং সেটা নিশ্চিত করা যাবে যদি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করবেন জানি না, তবে করোনাকাল শেষ হলে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যে আরো বেশি কল্যাণকামী হবে সেটা ধারণা করা যায়।

আমাদের মতো দেশে এটা নিশ্চিত করতে হলে বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন লাগবে। নেতৃত্বের দূরদর্শিতা এবং বলিষ্ঠতা থাকলে বর্তমান কাঠামো নিজেদের বদলে সেটা করতে পারবে। তারা না পারলে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন ঘটবে কিনা, সেটা অবশ্য বলা যাচ্ছে না।

করোনাভাইরাস বিশ্ব অর্থনীতিকে যে ধাক্কা দিয়েছে এবং দেবে, তার উত্তরণে দীর্ঘ সময় লাগলেও সম্পদের সুষম বণ্টন কঠিন সময়েও প্রান্তিক মানুষকে তার ন্যূনতম চাহিদার যোগান দিতে পারে। সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা না গেলে মন্দা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি আবার রমরমা হয়ে উঠলেও সাধারণ মানুষ সেই আগের অবস্থাতেই থেকে যাবে।

হতে পারে করোনা শেষ পর্যন্ত বোধের জায়গায় কোনো পরিবর্তন না এনে শুধু মানুষের মৃত্যুতেই শেষ হতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরো বড় কোনো মৃত্যুমিছিলের রাজপথ খুলে রাখতে পারে। বোঝাবুঝিটা রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক শক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি নির্ভর করলেও সাধারণ মানুষেরও নিজেরটা বুঝে নেয়ার দায় থেকে যায়।

সেটা না বুঝলে আমরা ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে অনেক উপরে যেতে পারবো, কিন্তু বিপদে আশঙ্কার জায়গা থেকে কেউ বিশেষভাবে বাইরে থাকতে পারবো না।