চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিদ্রোহী প্রার্থীরাই কি উপজেলা নির্বাচনের মান রাখেনি?

বিএনপি, বামগণতান্ত্রিক জোট, ২২ দল, ঐক্যফ্রন্ট ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন প্রভৃতি দলের বর্জনের মধ্য দিয়েই দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। নির্বাচনটিতে ভোটার উপস্থিতি মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নির্বাচনের প্রতি ভোটারদের আস্থা ও দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি। সেজন্যই নড়েচড়ে বসেছে আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা।

দলীয় প্রতীক বাদ দেয়ার পক্ষেও তাদের অনেকেই মত দিচ্ছেন। কিন্তু সমস্যাটা কি কেবলই প্রতীকের? প্রতীকই কি ভোটারদের আগ্রহ কমিয়ে দিল? স্থানীয় সরকার (উপজেলা) (সংশোধন) বিল-২০১৫ এ বলা হয়েছে, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও দুটি ভাইস চেয়ারম্যান (সাধারণ ও সংরক্ষিত) পদের নির্বাচনের জন্য প্রার্থীকে রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তারই প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের মার্চে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ভোট হয় উপজেলায়। এর দুই বছর পর এবার পঞ্চম উপজেলা পরিষদের ভোট অনুষ্ঠিত হল। এখন বলা হচ্ছে এসব নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারী নেতাদেরকে আর ভবিষ্যতে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। শুধু তাই নয় তাদের বিরুদ্ধে শোকজ লেটারও (কারণ দর্শানোর নোটিশ) ইস্যু করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে আনা হবে দলীয়শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগ।উপজেলা

আবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চার বছর যেতে না যেতেই দলীয় প্রতীক বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে সরকার? তবে দলীয় প্রতীক দেয়ার সিদ্ধান্ত ভুল হলে এ প্রতীকের বাইরে যেসব দলীয় নেতা নির্বাচন করেছে তাদের নির্বাচন করাটা কেন ভুল হবে? উপজেলা পরিষদ ২০১৫ বিলটিতে লেখা আছে প্রার্থীকে রাজনৈতিক দল মনোনীত অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হবে৷ তবে অথবা অপশনের প্রার্থীরা কেন দায়ী হতে চললো? শোনা যাচ্ছে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের ইস্যুতে প্রায় ৮ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। অনেক প্রভাবশালী নেতা এবং মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। জাতীয় নির্বাচনে নৌকা নিয়ে জিতে মন্ত্রী এমপি হয়েছেন এমন অনেককেও দেখা গেছে উপজেলা পরিষদে নৌকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এসব অভিযোগ শুধু নৌকা বিরোধিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আরো রয়েছে মনোনয়ন সঠিকভাবে না দেওয়া ও আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপিদের মনোনয়নে প্রভাব বিস্তারের বিষয়ও। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী আওয়ামী লীগারদের মনোনয়ন না দেয়াটাও কি অন্যায্য হয়নি? ১১১টি উপজেলায় চেয়ারম্যানরা বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে গেছেন। আর যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে সেখানেও আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরাই। অনেক উপজেলায় দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীও ছিল।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন উন্মুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার রীতি বদল করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীকে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল৷আর তাই ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন- বিষয়ক নীতিমালার পরিবর্তনও করেছিল তারা। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সর্বপ্রথম শুরু হয়েছে সিটি ও পৌরসভার মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। পরে তা উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রয়োগ করা হয়। তবে এখন আবার নীতিমালা পরিবর্তন করে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছে সরকার।

কিন্তু কী হবে এই পরিবর্তনে? এমনটি হলে কি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসার আগ্রহ আবার ফিরে আসবে? শোনা যাচ্ছে বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে সংশোধনের পর তা কার্যকর করা হবে। কিন্তু তা কি বাহুল্য নয়? নীতিমালায় লেখা প্রার্থী হবে দল মনোনীত অথবা স্বতন্ত্র৷ সুতরাং আগের নীতিমালাতেইতো প্রতীক বাদ দেয়া যেতে পারে। জাতীয় সংসদে সেটা উত্থাপিত হয়ে পাস হল আর রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে আসলোনা৷ তখন কী লাভ হবে এতে? হলে কিভাবে হবে? দলীয় প্রতীক বাতিল করা হলেও সব দল যদি দলগত ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন বর্জন করে অবস্থা কি তথৈবচ থাকবে না তখন?

বিজ্ঞাপন

মানুষ ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়েছে দলীয় প্রতীকের জন্য নয়৷ তারা আগ্রহ হারিয়েছে নির্বাচনে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, দখলবাজী ও ভোটকেন্দ্রে রাতে সিল মারা ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে। দলীয় প্রতীককে সবদলই মেনে নিয়েছিল। মেনে না নিলে সব দল দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো না। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, বামগণতান্ত্রিক জোট, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ সকল রাজনৈতিক দল।

দলীয় প্রতীক দলগুলো রাখবে কি রাখবে না এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা দলগুলোরই। এজন্য সকল রাজনৈতিক দলের সাথে মতবিনিময় করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করাটাই কি সংগত ছিল না? দলীয় প্রতীক থাকলো না। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছাড়া কেউ গেল না ও মানুষের ভোটদানের আগ্রহও ফিরে এলো না তখন কী হবে? তখন আওয়ামী লীগ নেতারা সবাই নির্বাচন করতে পারবেন কেউ আর বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দলীয় শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন না। পরিবর্তনটা কি শুধু এ জায়গাতেই থাকবে না তখন?

গণতন্ত্রে নির্বাচন মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অংশগ্রহণ৷ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা অংশগ্রহণ না করলে কি প্রতিদ্বন্দ্বীতা শূন্যের কোঠায় যেতো না? তখন কি সবাই বিনাভোটে ও বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যেত না? এতে কি আরও মারাত্মকভাবে কমতো না ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি? যারা বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে তারা কি সবাই তখন ভোটকেন্দ্রে যেত? বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেসব উপজেলায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে সেখানে ভাইস চেয়ারম্যানদের ভোটের কাস্টিং দেখলেই তা বুঝা যাবে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনের মান রেখেছে বললে কি অযৌক্তিক বলা হয়?বিদ্রোহী প্রার্থীদের দায়ী করলে যেসব মন্ত্রী এমপি বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষ নিয়েছেন তাদের বেলায় কেন সংসদীয় ও দলীয় কোন ব্যবস্থা নেয়া হলো না তখন? এখনতো যা হবার হয়ে গেছে। তৃণমূলের অভিযোগের ভিত্তিতে তাদেরকে শোকজ করলে তাদের কি এসে যাবে তাতে? বিষয়টা তৃণমূলের অভিযোগভিত্তিক হল কেন? কেন সময়ে নীতিনির্ধারক ভিত্তিক হলো না?টাঙ্গাইল-ভোটকেন্দ্র-আইরে আমেজ ভেতরে ফাঁকা

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা না থাকলে নির্বাচনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলে কিছুই থাকতো না। বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যেত সবাই। ১৪ দল শরীক ও মহাজোট শরীকদের যে কয়জন প্রার্থী ছিলেন সেখানে নামকাওয়াস্তে কেবল ভিন্ন প্রার্থীতা থাকতো মাত্র। সেক্ষেত্রে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া সবাই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গেলে গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে নির্বাচনটি কোন পর্যায়ে পৌঁছাতো তখন? এটির কী ব্যাখ্যা দিবেন দলটির নীতিনির্ধারকরা?সংসদ নির্বাচন সবসময় দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে৷কিন্তু বিগত নির্বাচন গুলোতে দেখে আসছি এক দল নিজের প্রতীক বাদ দিয়ে অন্যদলের প্রতীকে নির্বাচন করেছে৷আবার নিজের দলের প্রতীকেও নির্বাচন করেছে৷ এজন্য কি কোন আইন করতে হয়েছে? দলীয় সিদ্ধান্তটাই কি যথেষ্ট ছিল না?

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বাতিলেই কি সমস্যার সমাধান? মূল কাজ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রমুখী করা৷ তাই নয় কি?পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ভাল থাকলে দলীয় প্রতীক বাতিলের চিন্তা করা হতো না নিশ্চয়ই৷

সুতরাং মূলকাজ ভোটার উপস্থিতি। আর সেটির জন্য প্রয়োজন দলীয় প্রতীক বাতিলে সংসদে আইন পাস নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মতবিনিময়। সেজন্য সরকার চাইলে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে দলীয় প্রতীক থাকা না থাকা ইস্যুতে মতবিনিময় করতে পারে। সকল দলের মতামত নিয়ে একটি ইস্যুভিত্তিক সর্বদলীয় সভায় এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা উচিত। আইন করে চাপিয়ে দিলে তার কোন সুফল নাও আসতে পারে তাতে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)