চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিদেশ ভালো?

অস্ট্রেলিয়াতে এখন চলছে শীতকাল। সময়ের হিসাবে অস্ট্রেলিয়াতে মোট চারটি ঋতু। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী গ্রীষ্মকাল, মার্চ থেকে মে শরৎকাল, জুন থেকে আগস্ট শীতকাল আর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর বসন্তকাল। অবশ্য সিডনিতে একটা কথা প্রচলিত আছে। সেটা হলো তিনটা ‘ডব্লিউ (W)’ কে বিশ্বাস করতে নেয়; সেগুলো হলো ওয়ার্ক (Work), ওমেন (Women) এবং ওয়েদার (Weather)। এখানকার আবহাওয়ার আসলেই কোন ঠিক ঠিকানা নেয়। বলা হয়ে থাকে এখানে একই দিনে চার ঋতুর দেখা মাইল হরহামেশা। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি এখানে আসলে ঋতু দুইটা – গ্রীষ্ম এবং শীত। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অনেক জায়গায় পঞ্চাশের উপরে উঠে যায় আবার শীতকালে তাপমাত্রা অনেকসময় শূন্যের নিচে নেমে আসে। আর শীত গ্রীষ্ম দু ঋতুতেই আবহাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলে গরম অথবা ঠান্ডা ঝড়ো বাতাস। গরমে এখানে ‘বুশ ফায়ার (বনে আগুন লাগা)’ খুবই সাধারণ ঘটনা। আর শীতকালে শীতের তীব্রতা বাড়াতে মাঝে মাঝেই শুরু হয় টানা বর্ষণ।
শীতকালে দিনের তাপমাত্রা যেমনই থাকুক রাতের তাপমাত্রা অনেক কমে যায়। শীতের পোশাক যেমন গরম পায়জামা জ্যাকেটের পাশাপাশি পায়ে গরম মোজা এবং মাথায় গরম টুপিও পড়তে হয়ে। আর শোয়ার সময় রুমে হিটার চালানো অবশ্যম্ভাবী হয়ে পরে। রাতের এই কম তাপমাত্রার জের সকাল পর্যন্ত থাকে। এরপর আবার সন্ধ্যা থেকে হঠাৎ তাপমাত্রা কমতে শুরু করে। আবার এপ্রিলের প্রায় শুরু থেকেই ডে লাইট সেভিংটা বন্ধ করে দেয়া হয়। সেটা আবার চালু হয় অক্টোবর থেকে। যারফলে ভোর ছয়টা সাড়ে ছয়টার সময়ও বাইরে থাকে রাতের আধার। মানুষ উঠে পড়লেও তখনও পাখিদের কলকাকলী শোনা যায় না। এই সময়ে উঠে বড়দের কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হয়। সেখানে কলের গরম পানিই ভরসা। এরপর পুরোপুরি শীতের পোশাকে আবৃত করে বাইরে বের হতে হয়। এভাবেই চলে শীতকালের সময়টা। আর মানুষ এতে অভ্যস্তও হয়ে গেছে।

আমাদের পরিবারে আমরা মোট চারজন সদস্য। আমাদের মেয়ে তাহিয়ার বয়স এগারো বছর আর ছেলে রায়ানের বয়স পাঁচ বছর। মেয়ে পড়ে ইয়ার সিক্সে, পরের বছর হাইস্কুলে যাবে। সে হিসেবে তাকে বড়দের কাতারেই ফেলে দেয়া যায়। আর রায়ান এ বছরই স্কুল শুরু করেছে। শুরুতে স্কুলে না যেতে চাইলেও এখন স্কুল বেশ উপভোগই করছে বোঝা যায়। আর আমাদের দুজনেরই ফুল টাইম জব তাই বাধ্যূতামূলকভাবেই ওদেরকে বিফোর এবং আফটার স্কুল কেয়ারে দিতে হয়। কেয়ার থেকে অন্য আরেকজন ওদেরকে স্কুলে নেয়া এবং আনার কাজটা করে। আমরা সকালে ওদেরকে কেয়ারে নামিয়ে দিয়ে যারযার কাজে যায়। আবার কাজ থেকে ফিরে ওদেরকে কেয়ার থেকে তুলে নিয়ে আসি। সময়ের হিসেবে সবমিলিয়ে দিনের চব্বিশ ঘন্টার বারো ঘন্টায় ওরা কেয়ারে থাকে। বাকি বারো ঘন্টার মধ্যে যদি আট ঘন্টা ঘুমের জন্য বাদ দেয়া হয় আর থাকে মাত্র চার ঘন্টা। তারমধ্যে আছে গোসল খাওয়া দাওয়া। সবমিলিয়ে ওদের সাথে আসলে দিনের মাত্র কয়েকটা ঘন্টা আমরা ব্যায় করার সুযোগ পাই। আমরা সেই ক্ষতিটা কিছুটা পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে ওদেরকে সময় দিয়ে। অবশ্য সেখানেও থাকে অনেক ব্যস্ততা। বিভিন্ন প্রকারের বিষয় শেখার ব্যস্ততা। এভাবেই যন্ত্রের মতো চলে বিদেশের জীবন। আমি বিভিন্ন দেশে নিশ্চিত প্রবাসী প্রথম প্রজন্মের জীবন যুদ্ধের চিত্রটা মোটামুটি একইরকম।

যাইহোক এইবার আসি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়। আমাদের বাসা থেকে আমার অফিসের দূরত্ব ট্রেন বাস মিলিয়ে দেড় ঘন্টার ভ্রমণ। আবার ফেরার সময়ও দেড় ঘন্টা লাগে। সকাল আটটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত অফিস। কখনও শেষ করতে আবার দেরি হয়ে যায় বিশেষ করে মাসের শেষে। আমাকে তাই বাসা থেকে বের হতে হয় ভোর সাড়ে ছয়টার সময় আবার পাঁচটায় কাজ শেষ করে বাসায় পৌঁছাতে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বেজে যায়। গিন্নীর কাজের জায়গা বাসার কাছে হওয়ায় সকাল বিকাল বাচ্চাদেরকে কেয়ারে সেই নামায় এবং উঠায়। কিন্তু হাসপাতালের ডাক্তারদের থাকে রোস্টার ডিউটি। মাসের একটা সময় তাঁদেরকে বাধ্যতামূলক নাইট ডিউটি করতে হয়। তখন সে রাত আটটা সাড়ে আটটার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আসে পরেরদিন সকাল নয়টার দিকে। তারপর সারাদিন চেষ্টা করে ঘুমানোর। জানিনা আদতেও ঘুমাতে পারে কি না? কারণ হঠাৎ এই অভ্যাস তৈরি করা আসলেই অনেক কঠিন। এই সময়টায় আমার দায়িত্বে পরে বাচ্চা দুটোকে ভোরবেলা তুলে তৈরি করে কেয়ারে নামানোর।

গরমকালে ভোরবেলা ওদেরকে ঘুম থেকে তুলতে তেমন একটা বেগ পেতে হয় না কিন্তু শীতকালে ওদেরকে ঘুম থেকে তোলা মোটামুটি অসম্ভব একটা কাজ। আমি মুঠোফোনের ঘড়িতে ভোর পাঁচটার এলার্ম দিয়ে রাখি। কারণ তাহলে দেড় ঘন্টা সময় হাতে পাওয়া যাবে ওদেরকে তৈরি করতে এবং কেয়ারে নামিয়ে দিতে। ওদেরকে নামিয়ে দিয়ে আমাকে ছয়টা ঊনপঞ্চাশের ট্রেনে ধরতে হবে মিন্টো স্টেশন থেকে। ইচ্ছে করেই মুঠোফোনটা অন্যঘরে চার্জে রেখে আসি। যাতে এলার্ম অফ করতে হলেও যেন আমাকে উঠতেই হয়। নাহলে দেখা যাবে হাতের কাছে মুঠোফোনটা থাকেল এলার্ম অফ করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। এরপর নিজে হালকা ফ্রেশ হয়ে বাচ্চা দুটোকে তাড়া দেয়া শুরু করি। মেয়েটা যেহেতু বড় হয়ে গেছে। দু একবার ডাকার পরই সে নিজে থেকে উঠে পরে। আমাকে সাহায্য করতে শুরু করে। ইতোমধ্যে ছেলেটাও উঠে পরে কিন্তু আবার সে শুয়ে ঘুমাতে চাই। তাই তাকে আমরা আপাতত সোফার মধ্যে শুইয়ে দিই। এদিকে আমি গিন্নীর জন্য নাস্তা তৈরি করতে থাকি যাতে সারা রাতের হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে এসে নাস্তাটা অন্ততপক্ষে শান্তভাবে করতে পারে। আর মেয়েটা শুরু করে টিফিন তৈরির কাজ। দু রকমের ফল কেটে দুজনের টিফিন বাক্সে ভরা, দুজনের পানির বোতল ভোরে ব্যাগের সাইড পকেটে রাখা। আর পাউরুটির মধ্যে ডিমভাজি আর টমেটো সস দিয়ে বার্গার তৈরি করা। ডিমটা আমিই ভেজে দিই বাকি কাজটা সে করে।

বিজ্ঞাপন

এরপর দ্বিতীয় দফায় শুরু হয় ছেলেটাকে জাগানোর প্রক্রিয়া। মেয়েটা চলে যায় তৈরি হতে। ছেলেটা আর উঠতে চায় না। তখন ওকে একরকম জোর করে কোলে নিয়ে বাথরুমে যেয়ে দাঁত ব্রাশ করিয়ে এনে শুরু হয় স্কুলের পোশাক পরানোর কাজ। স্কুলের পোশাকটা পরিয়ে দিলে সে মোটামুটি ধাতস্ত হয়। অবশ্য অনেকদিন কোনভাবেই তার কান্না থামানো যায় না। মাঝরাত্রে ঘুম থেকে উঠে সারা বাড়ি সে তার মাকে খুঁজে বেড়ায় আর মুখে এতো দরদ দিয়ে ‘মাম্মী’ উচ্চারণ করে যে আমার নিজেরই চোখে জল চলে আসে। প্রথম দুদিন এভাবেই কেটেছে। আমি ঘুম থেকে উঠে তাকে বলেছি যে মা হাসপাতালে গেছেন। সে বুঝে কিন্তু কান্না আর থামায় না। এরপর অবশ্য আর ঝামেলা করেনি। ওকে তৈরি রেখে এইবার আমি তৈরি হতে শুরু করি। এরপর তিনজন একসাথে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি। বাসার দরজা খোলার সাথে সাথে হীম শীতল বাতাসের ঝাপটা এসে গায়ে লাগে। বাইরে তখনও গাঢ় অন্ধকার। তেমন কিছুই দেখা যায় না। তাই বারান্দার আলো জ্বালিয়ে আমরা জুতা পরে নিই। এরপর যখন বাইরে এসে দাঁড়ায় তখন বাসার বাইরে লাগানো সিকিউরিটি বাল্বের আলোটা জ্বলে উঠে। সেই আলোতে আমরা প্রতিদিন একটা করে সেলফি তুলি কারণ সেলফি তোলার অজুহাতে হলেও রায়ান একটু যাতে খুশী হয়।

এরপর ওদেরকে সিটে বসিয়ে আমি গাড়ির গায়ের এবং লুকিং গ্লাসে জমা শিশির মুছতে শুরু করি। এই পানি এতোই ঠান্ডা যে হাতের আঙুলগুলো মোটামুটি অবশ হয়ে যায়। এরপর প্রথমে মেয়েটাকে তার কেয়ার নামায় তারপর ছেলেটাকে। অনেকসময় ছেলেটা আর কোনমতেই কেয়ারের ভেতরে যেতে চায় না। এমন কান্না শুরু করে তখন ক্ষণিকের জন্য হলেও মনেহয় কাজকর্ম সব বাদ দিয়ে ওদের সাথে সময় কাটায়। ওদেরকে নামিয়ে দিয়ে আমি স্টেশনের দিকে যাওয়া শুরু করি। স্টেশনের কারপার্কে যখন গাড়ি পার্ক করি তখন সবে পূব আকাশ লাল হতে শুরু করেছে কিন্তু সূয্যি মামার তখনও দেখা নেয়। পূব আকাশের এই লালিমাটা মনটাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও দ্রবীভূত করে। আমি কয়েকটা ছবি তুলে নিই। এরপর ট্রেনে যেয়ে বসে দিন শুরু করি। পরেরদিন আবার একই রুটিন শুরু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করি। বিদেশের এই যে কষ্টের জীবন এর থেকে আসলে কারোরই রেহাই নেয়। আমাদের জন্য ব্যাপারটা আরো বেশি কষ্টের কারণ আমাদেরকে সাহায্য করতে পারে এমন কোন গুরুজন আমাদের সাথে নেয়।

বিদেশের জীবন মানেই কাড়িকাড়ি টাকার জীবন। প্রবাসীদের সম্বন্ধে এমন একটা ধারণা দেশের মানুষ সবসময়ই পোষণ করতো। জানিনা সেই ধারণার আদৌ কোন পরিবর্তন হয়েছে কি না? কিন্তু আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি বিদেশের জীবন কতখানি কষ্টের, কতখানি সহ্যের আর কতখানি ত্যাগের। প্রবাসীদের এই কষ্টটা আসলে বাইরে থেকে কোনভাবেই টের পাওয়া যাবে না। প্রবাসীরা কখনওই তাদের কষ্টের বিষয়গুলো ফেসবুকে পোস্ট করেন না কারণ তাহলে দেশে ফেলে আসা আত্মীয়স্বজন তাদের জন্য দুশ্চিন্তা করবেন। তাই তারা শুধু আনন্দের বিষয়গুলোই শেয়ার করেন কিন্তু এই আনন্দের বিষয়গুলোর বাইরে জীবনের যে কঠোর বাস্তবতার তাঁরা প্রতিদিন মুখোমুখি হন সেটা চেপেই রাখেন আর হয়তোবা আড়ালে চোখের পানি ফেলেন। এরপর হয়তোবা একটা সময় জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আসে কিন্তু এই কষ্টের সময়টা ঠিকই তাদের মনের গভীরে গেথে থাকে। দেশে ফেলে আসা আত্মীয়পরিজনের ভালোবাসা আর প্রবাস জীবনের এই কষ্টের জীবনের সমন্বয়ে আসলে তাঁরা কি পেলেন দিনশেষে মনের মধ্যে চলে এমনসব হিসাব। অবশ্য সেই হিসাবের কোন কুল কিনারা হবার আগের আরো একটা দিন শুরু করতে হয় যন্ত্রের মতো। এভাবে চলতে চলতে কোন এক ক্লান্ত প্রহরে মনের কোনে একটা প্রশ্নই শুধু উঁকি দিয়ে যায়। আসলেই কি বিদেশ ভালো?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন