চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিজয়ের ৪৮ বছর: প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

১৯৭২ সাল থেকে আমরা প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উদযাপন করে থাকি; এবারও করছি। দিবসটিতে জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ দেশের সকল জেলায় নির্মিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশ ফুল দিয়ে একাত্তরের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ঢাকাসহ সারা দেশের আনাচে-কানাচে বাজানো হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকন্ঠ ভাষণ, আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানের; যা আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে রূপ নিয়েছে।

দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমরা ইতোমধ্যে ৪৮ বছর পেরিয়ে এসেছি। তাই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, বিজয়ের ৪৮ বছরে আমরা কী পেলাম? জনমনে এমন প্রশ্ন জাগার পেছনে বহুমুখী কারণও রয়েছে; যার মধ্যে বিভিন্ন সরকারের ভূমিকাও বিবেচ্য। এ বছর বিজয় দিবসে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রকাশ। দিবসটি উদযাপনের প্রাক্কালে ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় তথা সরকার প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছে।

তালিকা প্রকাশ উপলক্ষে এদিন এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন: পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ ৯ মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী এবং শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সন্ত্রমহানি করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে সেই সব স্বাধীনতাবিরোধীর মধ্যে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হলো।

এসময় মন্ত্রী আরো বলেন: একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরোনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি। বাকি তালিকা ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে।

অনেক দেরিতে হলেও সরকারের প্রশংসনীয় এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই। প্রত্যাশা করি, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধীদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশে সক্ষম হবে।

১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় অর্জন শুধু ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ফসল নয়। এজন্য ৩০ লাখ মানুষের জীবন ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয়েছে, প্রাণপণ লড়াই করতে হয়েছে অগণিত মুক্তিযোদ্ধাকে, দিতে হয়েছে সীমাহীন সম্পদ বিসর্জন। আর এই সশস্ত্র সংগ্রামের পেছনে রয়েছে পাকিস্তানিদের ২৪ বছরের শোষণ-নিপীড়ন ও তার আগে ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগণের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ।

আমার এ লেখার উদ্দেশ্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় অর্জন। তাই ব্রিটিশ শাসনামলের ইতিহাস টানলে লেখাটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। শুধু এতোটুকুই বলা প্রাসঙ্গিক যে, ইংরেজদের বর্বর শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট অখণ্ড ভারতবাসীর (ভারতবর্ষের জনগণ) মনে দেশপ্রেম ও মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও এ ভূখণ্ডের মানুষ হয়ে উঠেছিল মুক্তিপিয়াসী, তাদের হৃদয়ে জ্বলে উঠেছিল দ্রোহের আগুন।

১৯৪৭ এর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রটির সৃষ্টি হয়েছিল দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে; যার মধ্যে নিকৃষ্টতম উপাদান ছিল সাম্প্রদায়িকতা। এ ধরনের রাষ্ট্রে সমতার সমাজ যে প্রতিষ্ঠিত হয় না, হতে পারে না- তা রাজনৈতিক বোদ্ধারা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের কুটচাল এবং পাকিস্তান ও ভারতের কিছু নেতার ক্ষমতালিপ্সার কাছে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত সে সব দেশপ্রেমিক রাজনীতিকরা হার মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে তখনকার সুখবর এই যে, ক্ষমতালিপ্সুদের ওই তালিকায় ভারতের কোনো বাঙালি কিংবা বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ববাংলা, পরবর্তীতে পূর্বপাকিস্তান) দু-একজন দালাল ছাড়া গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বের কেউ ছিলেন না।

স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি পাবার পরপরই স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয় পাকিস্তান। একই রাষ্ট্রের প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্য হলেও ইংরেজদের আদলে বাংলাদেশকে তারা কার্যত উপনিবেশে পরিণত করেছিল। শাসনের নামে নিরবচ্ছিন্ন শোষণের পথ নিষ্কণ্টক করতে কৌশল হিসেবে এ ভূখণ্ডের বাঙালি-অবাঙালি ও হিন্দু-মুসলিম বিভেদকে বেছে নিয়েছিল তারা। বাংলাদেশের সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য পাকিস্তান থেকে আমদানি করা হয়েছিল ‘২২ পরিবার’; যাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল এ দেশের ব্যবসা ও শিল্পখাত। সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী এবং জনপ্রশাসনসহ সকল পর্যায়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অবাঙালি পাকিস্তানিদের প্রাধান্য ছিল।

১৯৪৮ সালে প্রথম দফায় ও ১৯৫০ সালে দ্বিতীয় দফায় ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে দেশকে হিন্দুশূন্য করার যে ফন্দি এঁটেছিল পাকিস্তান, এ ভূখণ্ডের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অটুট বন্ধনের কাছে তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছিল। যদিও সেসময় মুসলিম লীগের প্ররোচনায় এক শ্রেণির মুসলিম জনগোষ্ঠী বিহারীদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছিল; হাজার হাজার হিন্দু পরিবারকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল, তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা সে সময় হিন্দুদের পাশেই দাঁড়িয়েছিল, হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিতভাবে রুখে দিয়েছিল সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন।

এ দেশের বাঙালিরা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের ২২ পরিবারের শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদমুখর ছিল, তেমনি প্রয়োজনীয় মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সোচ্চার প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল তারা। এরপর বায়ান্ন সালে বাঙালি জাতির ওপর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হলে ফুঁসে উঠেছিল পুরো দেশ। মাতৃভাষা বাংলার এমন অসম্মান মেনে নিতে পারেনি বাঙালি ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক মহলসহ এ দেশের আপামর জনতা। বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করে মায়ের মুখের বোল বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল তারা। মূলত: বায়ান্নর সেই ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়েই রচিত হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ১৯৬২ এর হামিদুর কমিশনের বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজের আন্দোলনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নৈতিক পরাজয় ঘটেছিল।

তবুও থেমে থাকেনি পাকিস্তান। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর সীমান্তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন চালিয়ে অগণিত হিন্দু পরিবারকে বাংলাদেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। অবশিষ্টরাও যাতে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় সে জন্য দেশত্যাগী হিন্দুদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তাদের উত্তরসূরি বা স্বজনদের বঞ্চিত করার হীন উদ্দেশে জারি করা হয়েছিল ‘শত্রু সম্পত্তি অধ্যাদেশ’। জেনারেল আইয়ুব খানের সেই কালো আইনের আগুনে দগ্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে আরও অসংখ্য পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছিল; যারা আর কখনও প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেনি।

এছাড়া ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করেছিল পাকিস্তান সরকার। তার বিরুদ্ধেও লড়াই করে জয়ী হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনায় লালিত এ দেশের আপামর জনগণ; যার মধ্যে বাঙালি-অবাঙালি (আদিবাসী) তথা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান- সব ধর্মের মানুষই ছিল। এরপর ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’ আন্দোলনের ধারাবাহিকাতায় ছাত্র সমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে ৬৯ এর সফল গণআন্দোলন এবং ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানবিরোধী সুসংগঠিত ঐক্যের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছিল বাংলার জনগণ।

এভাবে ধাপে ধাপে অধিকার আদায়ের লড়াই যতো বেগবান হচ্ছিল, এ দেশের মানুষের পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তির আকাঙ্ক্ষা ততোই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল; যা ১৯৭০ সালের নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছিল। মুসলিম লীগ তথা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় তারই প্রমাণ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আলোচনার নামে প্রহসন করে অহেতুক দীর্ঘ কালক্ষেপণ, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গোপনে অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমদানি করে রণপ্রস্তুতি গ্রহণসহ নানা টালবাহানার আশ্রয় নেন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান।

বিজ্ঞাপন

একদিকে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ, অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র সমাজসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর সামরিক বাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও নির্বিচারে গণহত্যা চলতে থাকে। এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে একাত্তরের ৭ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) দেয়া এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু দেশের সর্বত্র অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণই মূলত প্রকাশ্য জনসমুদ্রে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা এবং ভাষণটি ‘বজ্রকন্ঠ ভাষণ’ হিসেবে বিশ্বস্বীকৃত। এর তিন সপ্তাহের মাথায় ২৫ মার্চ রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু।

প্রায় একই সময়ে অপারেশন সার্চলাইটের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, পিলখানা বিজিবি (তৎকালীন ইপিআর) সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুরনো ঢাকার সূত্রাপুর, শাঁখারিবাজার ও তাঁতিবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। অন্যদিকে গ্রেপ্তারের আগমুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর দেয়া সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারের পরপরই সারা দেশে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালিরা। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ; যার সফল সমাপ্তি ঘটে পাকিস্তানি বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ও ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।

তবে বঙ্গবন্ধুর ডাকে আপামর জনতা মুক্তিসংগ্রামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেও এ দেশেরই এক শ্রেণির কুলাঙ্গার পাকবাহিনীর সঙ্গেহাত মিলিয়েছিল। হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগে হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগী হয়ে উঠেছিল তারা। এমনকি বিজয়ের ঊষালগ্নে একাত্তরের ১৩-১৪ ডিসেম্বর জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান বুদ্ধিজীবীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আগে তাদের তালিকা তৈরি করে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল এই কুলাঙ্গাররা, বাসায় বাসায় গিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ধরে আনতে হানাদার বাহিনীর সঙ্গেও গিয়েছিল তারা।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য, নিপীড়ন ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে শোষণ-বৈষ্যমহীন একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কায়েম করা, সমতার বা সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। যেখানে থাকবে না কোনো ধর্মীয় বিভেদ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল আকাঙ্ক্ষা। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠ ভাষণের শেষ দুটি বাক্যেও তা উচ্চারিত হয়েছিল- “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।”

পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে ফিরে এসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ৩০ লাখ শহীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তেমন বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানের মূল চার স্তম্ভ ছিল- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। কিন্তু সদ্যস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রিয় মাতৃভূমিকে সে লক্ষ্যে এগিয়ে নেওয়ার আগেই মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট তাঁকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। ইতিহাসের চাকা ধাবিত হলো পেছন দিকে। দেশের চালিকাশক্তি চলে গেলো স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রবিরোধীদের হাতে।

এরপর দীর্ঘ ২১ বছর অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জয় পেয়ে ২৩ জুন রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসীন হলেন তাঁরই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। পাঁচ বছর পর তিনিও ক্ষমতা হারালেন। এভাবে আবারো কেটে গেলো সাত বছর। ২০০৮ এর ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ফের মসনদে বসলেন শেখ হাসিনা। নির্বাচনী প্রধান প্রতিশ্রুতি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করলেন, শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হলো, আদালতের রায়ও কার্যকর হলো।

শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা ১১ বছরে দেশে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। বেড়েছে শিক্ষার হার, চিকিৎসার মান, ফসল ও দেশীয় পণ্য উৎপাদন। কমেছে মাতৃমৃত্যু, বাল্যবিয়ে, কলেরা, বসন্ত, এইডস, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়ার মতো মরণব্যাধির হার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স ও মানুষের মাথাপিছু আয় (জিডিপির হার) বেড়েছে। আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধন করে মূল চার স্তম্ভ- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা করা হলো; যা এর আগে দুই সামরিক সরকার কাটাঁছেড়া করে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বাদ দিয়েছিল। কিন্তু এতোকিছুর পরও শহীদদের স্বপ্ন তথা মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা কি পূরণ হয়েছে? সে আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে তো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হবে না।

সম্পদ বাড়লেও ধনী-গরিবের বৈষম্যও বেড়েছে। শিক্ষা ও চিকিৎসার মান উন্নত হলেও এসব ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। সম্পদ বাড়লেও এর মালিকানা চলে যাচ্ছে নির্দিষ্ট এক শ্রেণির মানুষের হাতে; যাদের বিপরীতে দরিদ্রের সংখ্যাও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তাই আধুনিক উচ্চতর শিক্ষা ও উন্নত চিকিৎসা সেবা সিংহভাগ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বা গেছে। ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে সাম্প্রদায়িকতার সামাজিকরণ হচ্ছে। সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে ধর্মীয় বিদ্বেষ। স্বয়ং সরকার প্রধানও ঘুষ-দুর্নীতি এবং সন্ত্রাস-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তা বন্ধ করতে পারছেন না। খোদ প্রধান বিচারপতিও এখন সর্বোচ্চ বিচারালয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে বাধ্য হচ্ছেন। পাকিস্তান শাসনামলের শোষক ২২ পরিবারের স্থলে স্বাধীন বাংলাদেশে ২২ হাজার পরিবার জন্ম নিয়েছে; যারা এখন ১৬ কোটি মানুষের শোষকের ভূমিকায় নেমেছে।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধীতাকারীদের আজও আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করতে পারলাম না। যে কারণে তাদের অধিকাংশই নানা কৌশলে বিপুল পরিমাণ অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করেছে। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে একাত্তরের পরাজিত শত্রুরা এতোদিন যেমন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল, তেমনি দীর্ঘ সময়েও তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করতে না পারায় তারা খোলস বদলে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান শক্তি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে ফেলার সুযোগ পেয়েছে। তাই মনে প্রশ্ন জাগে: বিজয়ের ৪৮ বছরে আমরা কী পেলাম?

এবারের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে (১৫ ডিসেম্বর) সেই কুলাঙ্গারদের এক ক্ষুদ্রাংশের নাম প্রকাশ করেছে সরকার। স্বাধীনতাবিরোধীদের যে তালিকা প্রকাশ করার প্রয়োজন ছিল সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন ‘ঐকমত্য’ সরকারের (তৎকালীন নাম) আমলে কিংবা ২০০৯ সালে দ্বিতীয় দফায় শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে (মহাজোট সরকারের আমলে), সে তালিকা প্রকাশ হলো ২০১৯ সালের একেবারে শেষে। ততোদিনে তো ‘জল অনেক ঘোলা হয়েছে’।

তাও স্বাধীনতা বিরোধীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি সরকার। প্রথম ধাপের এ তালিকায় এক-পঞ্চমাংশ বা তারও কম নাম রয়েছে। বাকি তালিকা ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে বলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন। যদি শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন প্রথম মেয়াদের পাঁচ বছরের (১৯৯৬-২০০১ সাল) মধ্যে এমন তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হতো, তাহলে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প হয়তো এতো বিস্তৃত হতো না, নানা কৌশলে বিপুল পরিমাণ অর্থসম্পদ অর্জনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সুবিধাও পেতো না তারা। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি ও তাদের উত্তরসুরীরা কখনও অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করতে পারে না। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়ই এক শ্রেণির সুবিধাবাদী মানুষ সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করছে।

যতোদিন ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসম বৈষম্য থাকবে, ততোদিন সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। যতোদিন না পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার লাগাম টেনে ধরা যাবে, ততোদিন সমাজে ধর্মীয় বিভাজন ও অস্থিতিশীলতা থাকবে। তাই ৩০ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও দুই লাখ বীরাঙ্গণা মা-বোনসহ মুক্তিযুদ্ধের সকল বীর সেনানির আকাঙ্ক্ষা তথা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ভূমিকা যেমন কঠোর হওয়া দরকার, তেমনি সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি তথা শ্রেণিবৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও আবশ্যক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: