চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিজ্ঞানের আলোকে লায়লাতুল মেরাজ

এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি পরতে পরতে যতো অমীমাংসিত রহস্য আর অলৌকিক ঘটনাবলি সুপ্ত রয়েছে, তার অন্যতম হলো মহান রবের মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামের শেষ পয়গম্বর সাইয়্যেদুল মুরসালিন রাহমাতাল্লিল আলামিন হযরত মোহাম্মদ (দ:) এর মিরাজ তথা ঊর্ধ্বারোহণ। এই মিরাজের রাতই ছিলো স্রষ্টা ও তাঁর প্রিয় সৃষ্টির কাছে আসার গল্প, এই রাতই ছিল আসমান ও জমিনের শত আলোকবর্ষ দূরত্বকে একাকার করার অভূতপূর্ব মুহুর্ত; যে মুহুর্ত সৃষ্টিকে তার স্রষ্টার সান্নিধ্য পাওয়ার সহজ সরল রাস্তাটি এনে দিয়েছিল নামাজের মাধ্যমে। মূলত পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি সকল চমৎকার ও অলৌকিক ঘটনাবলির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ এই ঘটনাকে নিরঙ্কুশ নির্মোহচিত্তে বিশ্বাস করার নামই ইসলাম। আর যারা বিশ্বাস করেন তাঁরাই সিদ্দিক তথা সত্যান্বেষী ও বিশ্বাসী। তবুও অন্ধকারাবৃত হৃদয়ের আবু জেহেলদের মতো আজও কিছু কূপমণ্ডূক বারংবার দাঁড় করাতে চায় এই ঘটনাকে বিজ্ঞানের কাঠগড়ায়। খোঁড়া যুক্তির হাতুড়িতে ভাঙতে চায় মুমিনের বিশ্বাস। অথচ বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় এখন সহজেই প্রতীয়মান যে, আজ বিশ্বজুড়ে দিগন্ত জয়ের যে হিড়িক পড়েছে তার মাইলফলক এই লায়লাতুল মেরাজ। মূলত রাসূল (দ:) এর মিরাজ (ঊর্ধ্বারোহণ) -ই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার দ্বার উন্মোচনের প্রথম ধাপ। অবিশ্বাসীরা যতই ইসলামকে অবনমিত করার চেষ্টা করুক, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জয়ের যত গবেষণা এবং গ্যালাক্সি নিয়ে যেসব সায়েন্স ফিকশন সবকিছুর রুটথিম এই মেরাজে রাসূল (দ:)।

পবিত্র মেরাজ নিয়ে অবিশ্বাসীদের কিছু কমন প্রশ্ন: ১. মহানবী (দ:) কীভাবে ‘মধ্যাকর্ষণ শক্তি’ অতিক্রম করলেন? ২. মহাশূন্যে বায়ুহীন, প্লাজমা ইত্যাদির যে সব উত্তপ্ত স্তর রয়েছে, রক্ত মাংসে গড়া জড় পদার্থের মানুষের পক্ষে তা অতিক্রম করা কীভাবে সম্ভব? ৩. তিনি কীভাবে অতি অল্প সময়ে এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আবার ফিরে এলেন? এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়, ১৪০০ বছর আগেও আবু জাহেলের দল করেছিল বিদ্রুপের সাথে। রাসূল (দ:) স্বয়ং এর উত্তর দিয়েছিলেন তাৎক্ষণিক। আলহামদুলিল্লাহ আজ এর উত্তর দিচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞান। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি শূন্যে অবস্থানকারী সব বস্তুকেই সবসময় সমভাবে আকর্ষণ করতে পারে না তা আজ পরীক্ষিত সত্য। প্রত্যেক গ্রহেরই নিজস্ব আকর্ষণী শক্তি রয়েছে। সূর্য ও পৃথিবী পরস্পর পরস্পরকে টেনে রেখেছে। এ টানের ফলে পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে এমন একটি স্থান রয়েছে যেখানে কোনো আকর্ষণ-বিকর্ষণ নেই। একে বলা হয় ‘নিষ্ক্রীয় এলাকা’ (Neutral Zone)। কাজেই পৃথিবীর কোন বস্তু যদি এই ‘নিষ্ক্রীয় এলাকা’র সীমানায় পৌঁছতে পারে, তবে তার আর পৃথিবীতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। গতিবিজ্ঞানের (Dynamics) মতে, পৃথিবী থেকে কোনো বস্তুকে ঘন্টায় ২৫ হাজার মাইল(যাকে আমরা মুক্তিবেগ বা Escape Velocity হিসেবে জানি) ঊর্ধ্বালোকে ছুড়ে দেয়া হলে তা আর পৃথিবীতে ফিরে আসবে না।আধুনিক জ্যোতির্বিদরা বলেন, “পৃথিবী থেকে কোনো বস্তুর দূরত্ব যতই বাড়ে, ততই তার ওজন কমে, পৃথিবীর এক পাউন্ড ওজনের কোনো বস্তু ১২ হাজার মাইল ঊর্ধ্বে মাত্র এক আউন্স হয়ে যায়। এ থেকে বলা যায়, পৃথিবী থেকে যে যত ঊর্ধ্বে গমন করবে, তার ততই অগ্রগতি হবে।

বিজ্ঞাপন

“ – The Exploration of Space, P-15 এবার দৃষ্টি আলোকপাত করি মেরাজের দিকে-রাসূল (দ:) মেরাজকালীন দুটি যানে আরোহণ করেন- মসজিদুল হারাম থেকে সিদরাতুলমুনতাহা (শেষ সীমানা) পর্যন্ত ‘ বোরাক’ এবং সিদরাতুলমুনতাহা থেকে রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্য পর্যন্ত রফরফ। বোরাক শব্দটি বারকুন থেকে উদ্গত, যার অর্থ- বিজলি এবং রফরফ অর্থ চলমান সিঁড়ি বা নরম তুলতুলে বিছানা, হাদীসে যার গতি আলোর চেয়েও বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা জানি আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। শাব্দিক অর্থ বিবেচনায় বোরাকের গতি অন্তত আলোর গতির সমান ছিল। হয়তো আরও বেশিই ছিল। হযরত মুহাম্মদ (দ.) বোরাকের দ্রুতগতির বর্ণনা দিয়ে বলেছেন,’ বোরাক নিজ দৃষ্টি সীমার শেষ প্রান্তে প্রতিটি কদম ফেলে।’ ইট-কংক্রিটের শহরে মানুষের দৃষ্টি বেশিদূর যায় না ঠিকই, কিন্তু দৃষ্টির সামনে কোনো অন্তরায় না থাকলে দিগন্ত দেখা যায়। আমরা পৃথিবী থেকে আকাশও তো দেখতে পাই। সেটা প্রথম আকাশ, সপ্তম আকাশের আগে কিছু না থাকলে পৃথিবী থেকেই হয়তো সপ্তম আকাশও দেখা সম্ভব হতো।

বিজ্ঞাপন

এভাবে বিশ্লেষণ করলেই বুঝে আসে বোরাক কত দ্রুতগতির বাহন ছিল। বোরাকের গতির প্রকৃত জ্ঞান এখনো হয়তো মানুষের অর্জনই হয়নি। উপরন্তু রফরফের গতি ছিল বোরাকের চেয়ে কয়েকশত গুণ বেশি। আধুনিক পদার্থবিদ্যার মতে- কোনো বস্তু যখন আলোর গতিতে চলে, তখন তা সময় অতিক্রম করতে পারে। এবং গতি যদি আলোরবেগ ছাড়িয়ে যায় তা, সময়ের ঋণাত্মক দিকে চলে যায়। কাজেই রাসূল (দ:) সপ্ত নভোমণ্ডল, জান্নাত,জাহান্নাম সব দর্শন করে এসেও ওযুর পানি প্রবাহিত অবস্থায় কিংবা দরজার শিকল নড়া অবস্থায় পাওয়া অদ্ভুত কিছু নয়।

আলবার্ট আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি অফ টাইম তথা সময়ের আপেক্ষিকতার থিওরিটিও মিরাজের ঘটনা বুঝতে সহায়ক হয়। দ্রুতগতির একজন রকেট আরোহীর সময়জ্ঞান আর একজন স্থিতিশীল পৃথিবীবাসীর সময়জ্ঞান এক নয়। রকেট আরোহীর দুইশ বছর পৃথিবীর দুবছরের সমানও হতে পারে। পবিত্র কোরআনেও এমন একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হজরত উযাইর (আ.)কে আল্লাহতায়ালা একশ’ বছর মৃত অবস্থায় রাখলেন। তারপর তাকে জীবিত করে প্রশ্ন করলেন- ‘বলতো, কতদিন এভাবে ছিলে? লোকটি বলল একদিন বা একদিনের কিছু সময় আমি এভাবে ছিলাম। আল্লাহ বললেন, না। তুমি বরং একশ’ বছর এভাবে ছিলে। তোমার খাবার ও পানিয়ের দিকে তাকিয়ে দেখ সেগুলো পচে যায়নি। আর দেখ নিজের গাধাটির দিকে। (সূরা বাকারা : ২৫৯)।

এ আয়াতে দেখা যাচ্ছে, হজরত উযাইর (আ.) যে সময়টাকে একদিন বা তারও কম ভাবছেন বাস্তবে তা একশ’ বছর। একদিকে তার খাবার পচে যায়নি, তাতে সময়টা সামান্যই মনে হচ্ছে। অপরদিকে তার মৃত গাধার গলে-পচে যাওয়া বিচূর্ণ হাড্ডি প্রমাণ করছে, বহুকাল এরই মধ্যে চলে গেছে। এটাই রিলিটিভিটি অফ টাইম বা সময়ের আপেক্ষিকতা।

মার্কিন নভোযান ডিসকভারির মহাশূন্যচারিরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসায় প্রমাণিত হয়েছে, নভোভ্রমণ বাস্তবেই সম্ভব। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (দ.) যখন মিরাজে গিয়েছিলেন তখন বিষয়টা কল্পনাতীত ছিল বটে।